কী কথা তাহার সাথে!

হুমায়রা নাজিব নদী:

আজকে লেখাটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক বিশেষ স্বভাবের নারী এবং পুরুষদের নিয়ে। আমাদের সমাজে অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই বিশেষ স্বভাবের নারী-পুরুষের অস্তিত্ব এক এক ধরন বা রূপে দেখা যায়। সাদাসিধে আটপৌরে ভাষায় আমরা এদেরকে বলি দুশ্চরিত্র নারীপুরুষ।

একটা সময় ছিলো যখন সোশ্যাল মিডিয়ার অস্তিত্বই ছিলো না, কোনো উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া তখনও হয়তো অনেক স্থানেই পৌঁছেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামে গঞ্জে তখনও মানুষ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কিংবা ডিশের নাচাগানার স্বাদ সেইভাবে পায়নি। তখন গ্রামাঞ্চলে এই স্বভাবের পুরুষ সময় সুযোগ বুঝে নিজ গ্রামের বা আশেপাশের অঞ্চলের তার মতো স্বভাবের নারীকে পাটক্ষেতে যাওয়ার আহবান জানাতো। সেই নারীও ইঙ্গিত বুঝে নিয়ে কোনো দেনাপাওনার বদৌলতে কিংবা জাস্ট মনের খোরাক মেটাতে ওই পুরুষের ডাকে সাড়া দিতো। এই পাটক্ষেতেরই আবার একটা শহুরে নাম আছে, যেটা শহর বা একটু সিটি সাইডের লোকেরা ব্যবহার করে। সেটা হচ্ছে ‘লিটনের ফ্ল্যাট‘। যাই হোক, সেই পাটক্ষেতের বা লিটনের ফ্ল্যাটের ভেতরকার কীর্তিকাহিনী যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোককে খোলাসা করে বলার প্রয়োজন নেই।

এরপর বদলালো সময়। মানুষের হাতে এলো মুঠোফোন বা মোবাইল ফোন। প্রথমে শহরে, তারপর গ্রামেও মুঠোফোনের ব্যবহারের ব্যাপ্তি ঘটলো। ডিশের লাইনও শহর পেরিয়ে গ্রাম বা মফস্বল শহরগুলোতে প্রসার পেলো। এখন সেইসব পুরুষের কেবল পাটক্ষেতে বা লিটনের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া নিজ অঞ্চলের বা পরিচিত মহলের নারীদের সাথে মন ভরে না। তারা এখন ডিশ দেখে, চিকনি চামেলির নাচ দেখে। তাদের নজর এখন উঁচাটন। দূর থেকে দূরান্তে তাদের শিকারী মন খুঁজে ফিরে চিকনি চামেলি কিংবা শিলা কী জওয়ানি। আর এই শিকারের বর্ম হিসেবে তারা ব্যবহার করে পকেটে থাকা বা দোকান থেকে ভাড়ায় কথা বলা মোবাইল ফোনটিকে। কখনও পরিচিত অথবা কখনও অপরিচিত নারীদের নাম্বারে র‌্যান্ডমলি ডায়াল করে তারা চূড়ান্ত অরাজক একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই র‌্যান্ডম ডায়ালে যদি তাদের স্বভাবের বিশেষ ক্যাটাগরির মেয়ে পেয়ে যায়, তবে তো কেল্লা ফতে। কিছুদিন চলে রসের আলাপ, পরে যেই লাউ সেই কদু। ঘুরেফিরে সেই পাটক্ষেত বা লিটনের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া। আর সেই বিশেষ কৌশল যদি ভুলবশত তার অপজিট চরিত্রের নারীর প্রতি এ্যাপ্লাই হয়, তাহলেই ধরা। এই ধরা খাওয়া কখনও কখনও চৌদ্দ শিক পর্যন্ত গড়ানোর রেকর্ডও রয়েছে।

যাই হোক, এভাবেই এই বিশেষ স্বভাবের নারীলিপ্সু পুরুষেরা শিকারি চোখ বিছিয়ে তাদের সাদৃশ্য চরিত্রের নারী খুঁজে নেয়। এর আরও বেশ কয়েক বছর পরেই সূচনা হলো ফেইসবুকের যুগ। শিকারের আওতা এখন আরও বিস্তৃত পরিসরে। দেশের ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে বিদেশেও। তাই শিকারের টার্গেট এখন একেবারে রিয়েল অর্থেই চিকনি চামেলির মতো হট পিস্। এবার কিন্তু তাদের শিকারের বর্মটা বেশ সহজলভ্য। টাকা খরচ করে মোবাইলের বিল উঠিয়ে শিকার ধরার দিন শেষ। একদম ফ্রি ম্যাসেঞ্জারে এখন শিকারের মোক্ষম সুযোগ। কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনে রান্ডমলি ডায়াল করে যারা মেয়েদের নাম্বার খুঁজতো, এখন এরাই ঠিক একইভাবে একই উদ্দেশ্যে রান্ডমলি মেয়েদের ফেইসবুক আইডিতে রিকোয়েস্ট পাঠাতে থাকে। বাই এনি চান্স রিকোয়েস্ট এক্সেপ্টেড হলে শুরু হয়ে যায় সমানতালে ম্যাসেঞ্জারে গুঁতোগুতি। হাই, হ্যালো বলার জন্য এদের কাছে রাতদিনের কোনো হিসেব নেই। এভাবে কাওকে তাঁর মতো পেয়ে গেলে তো কথাই নাই। রসের আলাপচারিতা কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে সেটা এরাই ভালো জানে।

এসব ন্যাস্টি খেলায় বিবাহিত নারীপুরুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এই শ্রেণির মানুষগুলোর কাছে আদৌ বিবাহিত জীবনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ আছে কিনা জানি না। অথবা হতে পারে এদের বহুগামী মনোভাব এদেরকে এই পথে ধাবিত করে। কিন্তু পৃথিবীতে এই বিশেষ শ্রেণির মানুষের বাইরেও অনেক মানুষ আছে, যাদের কাছে বিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং চারিত্রিক শুদ্ধতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অথবা এমনও বলা যায়, এসব ফালতু কাজে নিজেকে জড়ানোর মতো রুচিবোধই হয়তো তাদের নেই। ফেইসবুকে প্রেম নিয়ে ব্যস্ত থাকা বা ম্যাসেঞ্জারে অযথা গল্পের আসর জমিয়ে টাইম পাস বা মনের খোরাক মেটানো সবার কাজ না। কিছু কিছু মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নিজেদের পরিচিত সার্কেলের সবার সাথে কানেক্টেড থাকতে, অথবা নিউজফিডগুলো স্টাডি করতে, কিংবা অনেকে নিজেদের পেশাগত উদ্দেশ্যেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে থাকেন। এরা ম্যাসেঞ্জারে অপ্রয়োজনীয় একটা কথাও বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। অথচ একটু সাজুগুজু করা পরিপাটি অথবা মডার্ন একজন নারী ফেসবুক ব্যবহার করলেই এইসব দুশ্চরিত্র পুরুষ ধরে নেয় যে মেয়েটা তার মতোই ইজি এ্যাভেইলেবেল একজন।শিকার হিসেবে তাকে টার্গেট করে বসে থাকে। কাউকে অনলাইনে বেশি দেখলে তারা ধারণা করে সে হয়তো অনেকজনের সাথে চ্যাট করে, নয়তো প্রেম টেম করে।

আসল কথা হলো, যে বাঁকা, তাঁর দৃষ্টিটাও বাঁকা। কোনো কোনো মেয়ে আছে দশটা মেসেজ দিয়েও একটা রিপ্লাই পাওয়া যায় না, তখন ঐ মেয়েটাকে খুব সুন্দরভাবে অহংকারী কিংবা হিংসুটে বলে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায় এই দুশ্চরিত্র পুরুষ সমাজের মাঝে। কিন্তু আসলেই কি কখনো ভেবে দেখছেন, এই সমস্ত পুরুষরা যে তাকে জিজ্ঞাসা করছে কেমন আছো, কী করো, হাই, হ্যালো….এটা জানা কি তাদের সত্যিই প্রয়োজন! নাকি তাদের অসৎ উদ্দেশ্য পূরণ করতে আলাপ জমানোটা মেইন লক্ষ্য?

আহারে পুরুষ ! নিজের দুশ্চরিত্রপনা বা মনের খোরাক মেটানো সব মেয়েদের সাথে খাটে না!! সেসবের জন্য তোমাদের ক্যাটাগরির কিছু মেয়েই আছে। ওহে,  পুরুষকুল, এবারে ভালো করে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নাও, ফেসবুক ব্যবহার করা মানে প্রেম করা নয়, অনলাইনে থাকা মানে রং তামাশাপূর্ণ চ্যাটিং নয়, সাজুগুজু করা প্রোফাইল ছবি দিলেই তাকে ইজি এ্যাক্সেসেবল ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। জীবনানন্দের সুরঞ্জনার ওইখানে যাওয়ার কোনোই প্রয়োজন নেই। তাহার সাথে কথা বলারও প্রয়োজন নেই।

শেয়ার করুন:
  • 152
  •  
  •  
  •  
  •  
    152
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.