বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ কি আদৌ ধর্ষণ?

প্রমা ইসরাত:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ৯ (১) এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে, যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভয় ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বছরের কম বয়সের কোন নারীর সাথে সম্মতিসহ বা সম্মতি আদায় করিয়া যৌন সঙ্গম করেন, তবে তিনি ওই নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।

কেস স্টাডি:
পল্লবী থানায় একজন ৪১ বছর বয়সী নারী যিনি একটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক, যার তিনজন সন্তান আছে, এবং সন্তানের পিতাদের সাথে যার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তিনি আরেকজন ৪৬ বছর বয়সী পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন। ধর্ষণের পয়েন্ট হচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১), প্রতারণা তথা “বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক”।

মামলার কপিতে উল্লেখ করা আছে যে, লোকটির স্ত্রী নেই বলে লোকটি দাবী করেছিলো এবং নারীটিকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি এরপর সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি। সেই ব্যক্তি নারীটির বাড়িতে থেকেছেন এবং সেখানে বসবাস করেও নারীটির সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছেন।
ধর্ষণের যে সংজ্ঞা বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ এ উল্লেখ করা আছে, সেখানে সম্মতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উপরের কেস স্টাডিতে নারীটির সম্মতিতেই যৌন সম্পর্ক ঘটেছিলো, অর্থাৎ যৌন সম্পর্কের সময় কোন বলপ্রয়োগ, ভয় ভীতি প্রদর্শন, সে রকম কিছুই ছিল না। অথচ পুরুষটি যখন বিয়ে করবে না বলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে, তখনই নারীটি ধর্ষণ হিসেবে মামলা দায়ের করেছে। অর্থাৎ পুরুষটি যদি বিয়ে করতে রাজী হয়ে যায় তবে, মামলা তুলে নিবে নারী। আবার নারীটি যদি এখন দাবি করেন যে (ধরে নিচ্ছি) ১৮ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিয়ে করতে হবে, তবে এক্ষেত্রেও পুরুষটি বিপদে পড়েন।

তার মানে, নরনারীর সম্পর্কে এই পয়েন্ট অনুযায়ী রিস্ক থাকে যে, একজন নারী তার কাঙ্ক্ষিত দেনমোহর না পেলে প্রেমিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করতে পারে। অথচ একজন মানুষের সম্পূর্ণ অধিকার আছে বিয়ের ক্ষেত্রে নিজের মতামত প্রদানের। তিনি বিয়ে করতে রাজীও হতে পারেন, বিয়ে না করতেও মত দিতে পারেন।

অপরদিকে একজন নারী যদি এরকম সম্পর্কে থেকেও বিয়ে করতে রাজী না হোন, তবে পুরুষের কোন জায়গা থাকে না আইনী প্রতিক্রিয়া পাওয়ার। আমরা জানি, আমাদের সোসাইটিতে এক প্রকার মানুষ আছে যারা “গোল্ড ডিগার”, মানে সুবিধালোভী/অর্থলোভী। সেরকম কোন মানুষ যদি নারী হোন, তাহলে তিনি প্রেমিকের পকেট ধসিয়ে, পরে তাকে বিয়ে না করলেও পুরুষটির কোন বক্তব্য থাকে না।

আবার এই বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এর পয়েন্ট, বিয়ে পরবর্তী ম্যারিটাল রেইপ, অর্থাৎ বৈবাহিক ধর্ষণের পয়েন্টকে অস্বীকার করে।
বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করে যে
১। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে প্রলোভন দেখিয়ে সঙ্গমে রাজী করানো যায়, কিন্তু পুরুষকে যায় না।
২। বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য একটি অপরাধ জায়েজ হয়ে যায়।
৩। নারীর যৌন সম্পর্ক হয়েছে মানে, তার অন্য কোন সমাধান নেই বিয়ে ছাড়া।
৪। নারীই এই অভিযোগ করতে পারবে কারণ নারীর জন্য যৌন সম্পর্ক হয়ে যাওয়া অনেক বড় একটি ব্যপার, কিন্তু পুরুষের জন্য নয়।

উপরের যে ঘটনাটি কেস স্টাডিতে উল্লেখ আছে, সেখানে নারীটির সাথে যা ঘটেছে তা সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন। সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন আর ধর্ষন এক বিষয় নয়।
যে কোন সম্পর্কে ম্যানুপুলেশন, গ্যাস লাইটিং, লাভ বোম্বিং এগুলোর মাধ্যমে এক্সপ্লয়ট করে একটা সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কেউ। সেই সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টার নারীও হতে পারে, পুরুষও হতে পারে।

আমাদের দেশে, সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন নিয়ে সুস্পষ্ট কোন আইন নেই। এই আইন নেই বলেই সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশনকে ধর্ষণ বলে চালিয়েই মামলা দিয়ে দেয়ার প্রবণতা আছে।
এতে যেটা হচ্ছে, যারা আসলেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, এবং বিয়ের মাধ্যমে সেই ধর্ষণ জায়েজ করা হচ্ছে। এভাবে একটা অন্যায় থেকে উদ্ধার করার জন্য আরেকটা অন্যায় করা হচ্ছে, যেটাতে কোনভাবেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন, সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, এবং বিশেষ করে মানসিকভাবে একজন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। কিন্তু বিষয় হচ্ছে এটা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে না। আইনী কোন প্রতিকার নেই। কেউ অভিযোগ করলেও, জাস্ট মুভ অন, এগিয়ে যাও, বাদ দাও, এইটুকু সান্ত্বনা বাণী ছাড়া আর অন্য কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর ডিপ্রেশনের ওষুধ, সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে যাওয়া, সেখানের ব্যয়ভার বহন, এটাও সেই ব্যক্তিকেই করতে হয় যার এটা অসুখ। এই ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কথা বলে না সাধারণত।

অপরাধের ধরন বদলে গেছে। আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্র যেহেতু নারী অবান্ধব, তাই এখানে নারী জড়িত এরকম সব জায়গায় একটা ভেজাল থাকবে।
খুন, নরহত্যা, দুর্ঘটনায় মৃত্যু এগুলো যেমন আলাদা আলাদা সংজ্ঞায় আছে, তেমনি ধর্ষণ, যৌন সহিংসতামূলক অপরাধ, সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন, এগুলোরও আলাদা আলাদা সংজ্ঞা থাকতে হবে।

আর সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন যৌনতাভিত্তিক সহিংসতার সংজ্ঞায় উল্লেখ থাকতে হবে যে এটা নারী, পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 316
  •  
  •  
  •  
  •  
    316
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.