দুটি ঘটনা আমাদের আসলে কী শিক্ষা দেয়?

সুপ্রীতি ধর:

দুটি ঘটনা আজকের এই ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখটাকে ব্যস্ত রাখলো আমাকে। এজন্য দিনশেষে নিজেকে কিছুটা ভর্ৎসনাও করছি। কারণ এই মুহূর্তে আমার একেকটি দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকগুলো কাজে হাত দিয়েছি। আবার এও ঠিক যে, দুটি ঘটনা ভিন্নমাত্রিক হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ, আলোচনার দাবি রাখে একইসাথে।

এক, একজন পরিচিত নারীবাদীর ১৮ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় একজন পুরুষের বিরুদ্ধে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ এর অভিযোগ;

দুই, প্রথা ভেঙে ঋতুমতী অবস্থায় নিজে পুরোহিত হয়ে পূজা করলেন পশ্চিমবঙ্গের এক ছাত্রী।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের অনলাইন জগত সরব প্রথম ঘটনাটিতে। গত কয়েক বছরে যারাই অনলাইন জগতে নারীবাদ ও নারীবাদী আন্দোলন নিয়ে ন্যুনতম আগ্রহও দেখিয়েছেন, তারা চেনেন সাদিয়া নাসরিনকে, যে নিজেকে নারীবাদী বলেই পরিচয় দেয়, এ নিয়ে তার কয়েকটা বইও আছে, লেখালেখির পাশাপাশি টিভি, টকশোতেও নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি আলোচনাগুলো করে থাকেন। ফেসবুক সেলিব্রিটিও বলা চলে তাকে। সেই তিনি যখন কোন পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ এর, তখন সবাই নড়েচড়ে বসে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, কনফিডেন্ট নারীকে কেউ ‘প্রলোভন’ দেখাতে পারে? তাও আবার বিয়ের?  এরকম অভিযোগ তো আমরা গ্রামের সেই প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত মেয়েটিকে করতে শুনি, যেগুলো পত্রিকার পাতায় আসে অহরহ। দুটি শিরোনাম না বললেই না, তাহলো, ‘বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন’ অথবা ‘সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন’। আগে খুব হতো এই ঘটনাগুলো। এখনও হয়তো হয়, পত্রিকা পড়া হয় না বলে জানা হয় না। তখন খুব হাসতাম আমরা নিউজরুমে। দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করতাম যে একটি মেয়ে তাকে বিয়ে করার জন্য বা সন্তানের পিতৃত্বের দাবি নিয়ে প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে হাজিরই হয়নি শুধু, অনশনেও বসেছে। তখন আমার নিজেরও বয়সটা কম ছিল বলে এর ভিতরের গূঢ়ার্থটা তেমন করে ধরতে না পারলেও মেয়েটার জন্য একধরনের মায়া হতো, করুণা হতো। কিন্তু সেই ঘটনাগুলো ঘটতো গ্রামের অসহায় মেয়েদের সাথে। কারণ তাদের সামনে আর কোন পথই খোলা থাকতো না। থাকতো না বলেই এক নির্যাতনের শিকার হয়ে আরও বড় নির্যাতনের ফাঁদে পা দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতো।

কিন্তু সাদিয়া নাসরিন কি অসহায় সেইসব নারীদের একজন? এরই মধ্যে জিডি হয়েছে থানায় এ নিয়ে। সম্ভবত অভিযুক্ত পুরুষটিকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। জানতে পারলাম যে, সেই লোক সাদিয়ার বাড়িতে তার এবং তার বাচ্চাদের সাথেই থাকতো, বাচ্চাদের সাথে সুসম্পর্কও তৈরি করেছে গত আড়াই-তিন মাসেই। এই যদি সত্যি হয়, তবে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি এলো কোথা থেকে? যা হয়েছে তা তো পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়েছে। এখন সেটিকে ‘ধর্ষণ’ বলে অভিহিত করে দেশে প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের শিকার নারীদেরই কি অপমান করা হচ্ছে না? দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যে আইনটি আছে, সেটিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দিচ্ছে এই ঘটনা। এমনিতেও আমরা সাংবাদিকরা জানি যে এই আইনটির যথেচ্ছ ব্যবহার হরহামেশাই হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এই আইনটির যে বরখেলাপ হয়, তাই তো মঞ্চস্থ হতে দেখছি এইক্ষেত্রেও। আর ১৮ লাখ টাকার কাবিনে বিয়ে করার দাবি, এবং তাতে রাজী না হওয়ায় এই যে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ বলে মামলা হলো, এতে করে কী প্রমাণ হলো? কাবিনের টাকার অংক এবং বিয়ে করতে রাজী হলে শব্দটা আর ‘ধর্ষণ’ থাকতো না? প্রলোভন শব্দটা তখন গায়েব হয়ে সব স্বাভাবিক হয়ে যেতো? সাদিয়া তখন সেই ব্যক্তির সাথে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকতো?

এতোদিন ধরে নারীবাদ নিয়ে এতো জ্ঞানগর্ভ লেখালেখি করে, সাধারণ মেয়েদের ভরসার জায়গা হয়ে উঠে, এ কেমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো সাদিয়া? কেনই বা করলো? প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে এতোটা নিচে নামতে হলো? আর ওই যে পুরুষটা, যে কিনা নিজের স্ত্রী, সন্তান, সংসার ফেলে এসে অন্যের বাড়িতে উঠে দিব্যি সংসার সংসার খেলা খেলছিল, তারই বা কী শিক্ষা? কী রুচি? তার বিরুদ্ধে তো তার স্ত্রীরও অভিযোগ আনা উচিত।

মনটা যখন বিষিয়ে ছিল এ নিয়ে, তখনই পশ্চিমবঙ্গের খবরটা চোখে পড়ে। এক বন্ধুর সাথে শেয়ার করাতে বললো, মেয়েটাকে পূজাই বা করতে হবে কেন? বললাম, সব তো আর একদিনে, এক তুড়িতেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে না। আমি, আমরা চাইলেই কি পৃথিবী থেকে ধর্মীয় বিশ্বাস উধাও হয়ে যাবে? যাবে না। বরঞ্চ এই যে মেয়েদের পূজা করার বিধান নেই, তার ওপর পিরিয়ডের সময় পূজার ঘর, বা ক্ষেত্রভেদে রান্নাঘরে যাওয়ারও বিধান নেই, সেই জায়গাগুলোতে এই যে ধীরে ধীরে পরিবর্তনগুলো আসছে, এটা কি প্রশংসার দাবি রাখে না? অবশ্যই রাখে। কিছুদিন আগে ডেনমার্কের মুসলিম নারী ইমামের কথা লিখেছিলাম। অনেকে গালিগালাজ করেছিল সেই লেখাটির নিচে। দেশেই তো কিছুদিন আগে নারীর নিকাহ করানো নিয়ে তোলপাড় হয়ে গেল। এই যে মেয়েরা প্রথা ভাঙছে, বেরিয়ে আসার মতোন শক্তি অর্জন করছে, এটাও অনেক বড় পাওয়া। স্যালুট উষসী নামের সেই মেয়েটিকে, যে পিরিয়ডকালীনই সরস্বতী পূজা করে দেখিয়ে দিয়েছে, মেয়েরাও পারে। ওকে দেখে আরও অনেকসংখ্যক মেয়ে বেরিয়ে আসবে সমাজে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ওপার বাংলায় মেয়েরা বেশ আগে থেকেই বিয়ের পৌরহিত্যও করছে। কিছুদিন আগে এমনই একটা সিনেমাও দেখলাম, যাতে স্পষ্টই বলা হয়েছে, একটু একটু করেই দীর্ঘদিন ধরে সমাজে চলে আসা নিয়মগুলো ভাঙতে হবে, ভাঙবেই একদিন। আমরা তো সেই দিনটার আশাতেই আছি।

আবারও ফিরি সাদিয়া নাসরিনের কথায়। যে সাদিয়া নিজে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ঘুরে বেড়ায়, যে নিজের জীবনের স্টিয়ারিংয়ের দায়িত্বও নিয়ে নিয়েছিল অনেক আগেই, সেই সাদিয়া কেন বিয়ের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হবে? শুধু প্রলুব্ধই না, যে দেনমোহরের বিরুদ্ধে সে লিখেছে অনেক আগেই, সে নিজেই টাকা দাবি করলো? রাজী না হওয়ায় পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্কটাকে ‘ধর্ষণ’ বলে রায় দিয়ে দিল? জেনেশুনেই একজন বিবাহিত পুরুষকে প্রশ্রয় দিল? আজকের এই ঘটনায় সাদিয়া কি হেরে গেল না ওই ২২ বছর বয়সী উষসী মেয়েটার কাছে? উষসী পথ দেখালো হাজারও মেয়েকে, আর সাদিয়া? সে তো বিমুখ করলো মেয়েদের। কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল অন্যদের। বিশেষ করে আমাদের।

অনেকেই এই ঘটনায় আবারও কোমর বেঁধে নেমেছে নারীবাদীদের গোষ্ঠী উদ্ধারে। এটাই স্বাভাবিক। নারীবাদী বলে পরিচিত একেকজনের দুদিন পর পর একেক ঘটনায় সবাই বিমর্ষ। আমি নিজেও দ্বিধান্বিত হয়ে আছি সারাদিন ধরে। তাহলে আমরা যারা ‘আন্দোলনে আছি’ বলি, আমাদের মূল আন্দোলনটা কোথায়, কার বিরুদ্ধে? আদর্শটা কী আসলে? আমাদের নৈতিক শিক্ষার পাঠ আসলে কী? ব্যক্তি আমাকে যখন অন্য মেয়েরা অনুসরণ করে, তারা তখন কী বার্তাটা পাবে আজ যদি আমি নিজেই নিজের সাথে দ্বিচারিতা করি?

আমার মনে হয়, আমাদের সবারই নিজের দিকে তাকাবার প্রয়োজন আছে। আমরা কী বলি, কী চাই, আমাদের চলন-বলনের সাথে আমাদের শিক্ষার কোন তারতম্য আছে কিনা, এগুলো জরুরি পাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এমন ‘আচরণ’ গ্রহণযোগ্য নয়।

সবাইকে মহান একুশের শুভেচ্ছা।

শেয়ার করুন:
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.