হয়রানির ডায়েরি

রোজলিন তিথি:

আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি শারীরিক হয়রানির শিকার হয় শিশু-কিশোর এবং অল্পবয়স্ক ছেলে-মেয়েরা। অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের যৌন উদ্দীপনার প্রধান শিকার হয়ে থাকে শিশুরা। ব্যক্তিগত জীবনে আমি, আমার বোন, বান্ধবী সব মেয়েরাই অল্প বয়সে এমন হয়রানির শিকার হয়েছি। যৌন নির্যাতন করার জন্য শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করা এবং শিশুদের টার্গেটে পরিণত করাই পেডোফাইলদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। ঐ বয়সটাতে যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো লজ্জায় কাউকে বলা যায় না। আঘাতটা শারীরিক আঘাতের চাইতে মানসিক আঘাত হয়ে ওঠে বেশি।

নিম্নোক্ত ঘটনাগুলো সবই সত্যি এবং আমার পরিচিত কয়েকজন মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। তারা সবাই এখন ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু শৈশবের সেই স্মৃতি এখনও তাদের তাড়া করে ফেরে। তাদের অনুমতি নিয়ে ঘটনাগুলো লেখা হয়েছে; তবে সঙ্গত কারণে তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

ঘটনা : (১)
অহনার (ছদ্মনাম) বয়স তখন বছর ছয়েক, তার দুসম্পর্কের এক ফুফুর বাসায় তখন কুকুর, বিড়াল, পাখি আর অ্যাকুরিয়াম ভর্তি মাছ ছিল, প্রাণিপ্রেমী হওয়াতে ওগুলো দেখার জন্য অহনা মাঝে মধ্যে ওনাদের বাসায় বেড়াতে যেত। ফুফুর হাজবেন্ড ছিল মুখভর্তি আলপিনের মতো সূঁচালো কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা মধ্যবয়সী এক লোক, ঐ লোক সুযোগ পেলেই অহনার নরম কচি হাতে এবং গালে তার দাড়িগুলো ঘষতো; অসহনীয় ব্যথা পেত অহনা, নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতো তাতে হিতে বিপরীত হতো; লোকটা হয়ে উঠতো আরো আক্রমণাত্মক। গাল-হাত লাল হয়ে যেতো অহনার, কখনও কখনও আঁচড়ে ফুলেও যেত। এতো ছোট ছিল অহনা যে কাউকে তখন বুঝিয়ে বলতে পারেনি সেই নির্মমতার কথা।

ঘটনা : (২)
ফার্মগেট এলাকায় অনেকগুলো মেয়েদের স্কুল, এ সকল স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রী লাঞ্ছিত হয় ফার্মগেট ওভারব্রিজ, তেজগাঁও কলেজ আর আনন্দ সিনেমা হলের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে। স্কুল থেকে ফেরার সময় এই পথগুলো মেয়েদের পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হয়। সেই সুযোগে ভীড়ের মধ্যে ছাত্রীদের বক্ষদেশে, নিতম্বে অনৈতিক হস্তক্ষেপ আর কুৎসিত মন্তব্য করা এই এলাকায় বিচরণরত কিছু জানোয়ারের প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ। একদিন আনন্দ সিনেমা হলের কাছে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল নবম শ্রেণীর ছাত্রী তামান্না (ছদ্মনাম), হঠাৎ কোথা থেকে এক লোক পাশ কাটিয়ে যাবার সময় হাতের কনুই দিয়ে বুকে এতো জোরে আঘাত করলো যে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল তামান্না। ঘটনায় যতটা ব্যথা পেয়েছিল, তার চাইতে বেশি লজ্জা পেয়েছিল তামান্না এই ভেবে যে ব্যাপারটা অন্য কেউ খেয়াল করেছেন কিনা!

ঘটনা : (৩)
সদ্য উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া রাইসা (ছদ্মনাম) তখন জীবনে প্রথম একা একা কলেজে যাতায়াত শুরু করেছিল। একদিন প্রচণ্ড ভীড়ে তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নামার সময় সিটে বসে থাকা কেউ একজন পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসানোর চেষ্টা করে রাইসাকে। ঘটনার আকস্মিকতা, বিড়ম্বনা এবং একা থাকার কারণে ভয়ে দৌড়ে বাস থেকে নেমে যায় রাইসা। পেছনে তাকিয়ে কুৎসিত লোকটার চেহারা দেখার রুচি হয়নি তার, কিন্তু ঐদিন প্রতিবাদ করতে না পারার আফসোস আজও তাড়িত করে রাইসাকে।

ঘটনা : ৪
অদ্রিতা (ছদ্মনাম) তখন সদ্য কৈশোরে পা দেয়া এক বালিকা, ফার্মগেটে অবস্থিত স্বনামধন্য এক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী, স্কুল ছুটির পর মায়ের সাথে বাসায় ফিরছিলো কাঁধে একগাদা বই-খাতার বোঝা নিয়ে। ফুটওভার ব্রিজের ওপর পাশাপাশি হেঁটে যাবার সময় বয়স্ক এক হুজুর ওর বুকে চিমটি কেটে চলে যায় ভীড়ের মধ্যে। লজ্জা আর সংকোচে পাশে থাকা মাকেও বিষয়টা জানাতে পারেনি অদ্রিতা। ঘটনার পর কয়েক যুগ কেটে গেছে; কিন্তু আজও সেই নির্মমতার কথা পরিবারের কারো সাথে শেয়ার করেনি কখনো অদ্রিতা। আবার নিজের মন থেকেও মুছতে পারেনি সেই বিভীষিকা। ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এখনো ওর চোখ দুটো ঘৃণা আর অপমানে ছলছল করে ওঠে।

ঘটনা : ৫
বাসের সংরক্ষিত নারী আসনগুলো গেট দিয়ে ঢুকে ড্রাইভারের হাতের বাম পাশে একটু উঁচু জায়গায় থাকে। মেয়েদের বেশ খানিকটা ডিঙিয়ে ওই আসনে গিয়ে বসতে হয়। অনেক সময় ওই আসনের পাদানিতে পুরুষরা এমনভাবে ছড়িয়ে বসে থাকে যে নারীদের জন্য আসনে উঠে বসাটা আরো দুঃসহ কাজ হয়ে পড়ে। এমনই এক আসনে উঠে বসার সময় পাদানিতে বসা এক লোক প্রিয়াঙ্কার (ছদ্মনাম) নারী অঙ্গ স্পর্শ করে কামিজের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে। প্রিয়াঙ্কার বয়স তখন ছিল বারো কী তেরো, বাবার সাথে যাচ্ছিলো অমর একুশে বইমেলায় রঙিন রঙিন বই কিনতে। প্রিয়াঙ্কার রঙিন ভুবনটা নিমিষে বিবর্ণ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর কুৎসিত মুখটা বাল্যেই দেখতে বাধ্য হয়েছিল সে।

ঘটনা : ৬
বাবা বিদেশে থাকেন, সেই সুবাদে বাসায় প্রায়ই দূরদুরান্ত থেকে পরিচিত অল্প-পরিচিত মেহমানদের আনাগোনা ছিল। সন্ধ্যা সন্ধ্যা সময়, বাসায় তেমন কেউ নেই, হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। পাঁচতলা থেকে নেমে দেখা গেল অপরিচিত এক লোক, বাসায় কেউ নেই জানানোর পর তিনি নিজেকে দুসম্পর্কের খালু হিসেবে পরিচয় দেন মেয়েটির কাছে। আর বিশেষভাবে অনুরোধ করেন যেন তাকে কিছুক্ষণ বসতে দেয়া হয়। কারণ তিনি ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। গৃহকর্ত্রীর  সাথে দেখা না করে ফিরবেন না। অগত্যা মেয়েটা গেট খুলে দেয়, লোকটা মেয়েটার পিছনে পিছনে দোতলা পর্যন্ত উঠে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে শুরু করে আর বলে, “আমাকে চিনতে পারলে না, বাসায় গিয়ে ভালো করে চিনিয়ে দেবো!” তাৎক্ষণিকভাবে মেয়েটা বিপদ বুঝে দৌড়ে তিন তলায় ভাবীর বাসায় কলিংবেল চাপ দেয়। ভাবী দরজা খুললে মেয়েটা লোকটাকে সেখানে বসার ব্যবস্থা করে দেয়। লোকটা সেখানে বেশিক্ষণ বসেনি, গৃহকর্ত্রীর  সাথে দেখা না করেই চলে যায়।

পুরুষরাই প্রধানত যৌন হয়রানিকারী, তবে অনেক নারীও আছেন যারা শিশু কিশোরদের মানসিক আঘাত করে আনন্দ পায়। আমার শৈশবে বাসায় দূর সম্পর্কের দুই চাচাতো বোন থাকতো, আমার মা দরকারি কোন কাজে আমাকে বাসায় তাদের কাছে রেখে বাইরে গেলে তারা আমাকে নানাভাবে শারীরিক মানসিক আক্রমণ করে নিজেদের মধ্যে মজা করতো। আমাকে একা পেলেই হুমকি দিতো, মারধর করতো আর বলতো, “তোর মা তোকে ফেলে চলে গেছে আর কোনদিন ফিরবে না, আমরা এখন তোকে না খাইয়ে রাখবো।”

আমি এতো ছোট ছিলাম যে কিছুই করতে পারতাম না, মায়ের শাড়ি নিয়ে সারা ঘরে ঘুরতাম আর কান্না করতাম, বড় অসহায় ছিলাম সেই দিনগুলোতে। তাছাড়া অনেক পরিবারে এমন অনেক নারী থাকে যারা বয়ঃসন্ধির সময় শিশু-কিশোরদের নানা রকম ব্যাঙ্গাত্মক যৌন হয়রানির কথা বলে টিজিং করে, বডি শেমিং করে এবং নিজেদের কুৎসিত বিনোদনের জন্য এই সব নারী বিভিন্নভাবে নিকট আত্মীয়ের শিশুদের হয়রানি করে থাকে।

যৌন হয়রানির শিকার হবার জন্য আহামরি সুন্দরী হবার অথবা গ্ল্যামারাস হওয়ার প্রয়োজন নেই। শৈশব কৈশোরের কোন না কোন মুহূর্তে অধিকাংশ নারী এমন কুৎসিত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। কারো বুকে চিমটি কাটা হয়েছে, কাউকে খামচে ধরা, গুঁতো মারা হয়েছে, কারো নিতম্বে থাপ্পড় মারা হয়েছে, অশ্লীল কথা শোনানো হয়েছে অথবা দেখানো হয়েছে বিকৃত অঙ্গভঙ্গি। আর পাবলিক ট্রান্সপোর্টে নারীদের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো বা বসা তো নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে গেলে আরো বড় ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় নারীদের।

ব্যক্তিজীবনে অনেক বিরুপ আচরণের শিকার হয়ে আজ মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়িয়েছি আমি। আমার পরিবারের কোনো শিশু-কিশোরকে কোনো আত্মীয়, পারিবারিক বন্ধু অথবা স্কুলে যাওয়া আসার পথে কোনো কুলাঙ্গারের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হতে দেব না। আমি জানি একটু সচেতন থাকলেই আমরা অনেক ঘটনা এড়াতে পারবো। সাথে সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। যৌন হয়রানকারীর শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা অভিভাবকদের নিজেদের সচেতন হওয়ার সাথে সাথে সন্তানকেও সচেতন করে তুলতে হবে।

আমি আমার কন্যার জন্য পারিবারিক এবং পারিপার্শ্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবো। আপনি?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.