এটা কীসের প্রমাণ, পৌরুষের না ছাগলামির?

শান্তা মারিয়া:

ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় অনেক নারী ও পুরুষ আছেন। আবার কয়েকজন ছাগলও আছে। কীভাবে বোঝা গেল তারা ছাগল? তাদের টাইমলাইনে প্রায়ই এক ধরনের ছবি খুব আহ্লাদের সঙ্গে প্রকাশ হয়। সেখানে দেখা যায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন (বলাবাহুল্য তিনি একজন পুংলিঙের) আর তার চারপাশে সব চেনা বা অচেনা অনাত্মীয় নারী। নারী পরিবৃত হয়ে তিনি হাসিমুখে একটি ছবি তুলেছেন। সেটি পোস্ট দিতে পেরে তার মুখের হাসি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এ ধরনের ছবি আমি অনেকের টাইমলাইনে দেখেছি বিদেশের প্রেক্ষাপটেও। ধরুন তিনি আইফেল টাওয়ার বা কোন বিখ্যাত সমুদ্র সৈকতে বা কোন পাহাড় বা প্রাচীরের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো কয়েকজন বিদেশিনীকে অনুরোধ জানিয়েছেন তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়াতে। তারপর ছবি তুলেছেন। ফেসবুকে দিয়েছেন। সেসব ছবির নিচে কমেন্টও থাকে খুব মজাদার। অনেকে বলেন, ‘হিংসা হচ্ছে ভাই’, ‘কপাল করে এসেছেন ভাই’।

আমি অবাক হয়ে ভাবি এসব ছবি দিয়ে তারা কীসের পরিচয় দেন? তারা কি বোঝাতে চান যে তারা খুব সুদর্শন, কিংবা অনেক নারী ‘তাদের পিছনে ঘোরে’? কিংবা বোঝাতে চান নারীদের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয়? নাকি তিনি বোঝাতে চান তার পৌরুষ খুব উচ্চমানের, তাই নারীরা তার চারপাশে ভিড় জমিয়েছে! অনেকে আবার গ্রুপ ছবি তোলার সময় পাশে দাঁড়ানো কোন নারীর কাঁধে (বেশিরভাগ বিদেশি নারীর কাঁধে) হাত তুলে দিতে ভালোবাসেন। এতে হয়তো তিনি প্রমাণ করতে চান ওই নারীর সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। মজার ব্যাপার অফিসিয়াল বা আনঅফিসিয়াল এ ধরনের ছবিতে কোন পুরুষ অন্য কোন পুরুষের কাঁধে হাত তুলে নিয়েছেন এমনটি সচরাচর চোখে পড়ে না।

বিদেশে বেড়াতে গিয়ে চারপাশে অচেনা পুরুষদের নিয়ে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন এমন কোন পুরুষের ছবি আমি এখনও দেখিনি। তবে অচেনা নারী নিয়ে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন এমন অনেক ছবি ফেসবুকের টাইমলাইনে দেখেছি। নারীর কাঁধে হাততোলা অবস্থাতেও দেখেছি। ওইটুকু হাত তুলে দিয়ে তিনি কি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ওই স্বল্প সময়ে ধরুন দু’মিনিটের ভিতর নারীটির বা নারীদের সঙ্গে তার কোনরূপ সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল? বা এরা তার প্রেমে পাগল?
আমার কাছে কিন্তু এধরনের ছবিকে ছাগলামির বহিঃপ্রকাশ বা বিশেষ একটি ‘বডি স্প্রে’র বিজ্ঞাপন বলে মনে হয়।

এই ছাগলামিটা শুধু যে তরুণরা করেন তা নয়। অনেক প্রায় বৃদ্ধ, মধ্যবয়সী, উপরে জোয়ান ভিতরে বৃদ্ধ এবং ঝুনাবৃদ্ধও এই ধরনের কাজকারবার করেন। তারা চেনা বা অচেনা কোন তরুণীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে গিয়ে কেন জানি তাদের কাঁধে চট করে হাত তুলে দেন। অথবা পিঠের উপর হাত রাখেন। এদের মধ্যে অনেকে বেশ প্রথিতযশা। অনেকে বেশ বিখ্যাত বা হবু বিখ্যাত। এরাও কখনও কোন পুরুষ ভক্তর কাঁধে হাত রাখেন না। তারা নারী ভক্তের কাঁধে হাত রাখতে পছন্দ করেন। প্রতিবাদ করলে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘হায় হায় আমি তো ওকে বোনের মতো বা মেয়ের মতো দেখি’। কেন যে তারা নারীদের ‘মেয়ের মতো, বা বোনের মতো দেখে স্নেহের প্রকাশ ঘটান’ কিন্তু কোন পুরুষকে ‘ভাইয়ের মতো বা পুত্রের মতো দেখে স্নেহের প্রকাশ’ ঘটান না তা কে জানে। অনেক নারী এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে চুপ থাকতে বাধ্য হন। হয়তো লোকটি এমনি বিখ্যাত বা শ্রদ্ধার আসনে রয়েছেন, হয়তো শিক্ষক বা পিতৃস্থানীয় কেউ, যে তখন চুপচাপ সরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

এখানে আমি কয়েকজন নারীর কথাও বলতে চাই। তারা মাঝে মাঝে অমুক তমুক বিখ্যাত পুরুষ তার কাঁধে হাত রেখে বা তাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে এমন ছবি পোস্ট করে খুব তৃপ্তি লাভ করে। তারা দেখাতে চায় যে ওই বিখ্যাত পুরুষ আমার খুব ঘনিষ্ঠ। এদেরকেও আমার ফিমেল ছাগল বলে মনে হয়। আরে তোর কাঁধে হাত রেখেছে মানে যে ওই ব্যাটা তোর খুব ঘনিষ্ঠ তা নয়, ওতে বোঝা যায় তোর কাঁধে হাত রেখে ব্যাটা একধরনের আত্মতৃপ্তি পেয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য একটাই, যেসব পুরুষরা ও নারীরা এই ধরনের ছবি দেন তাদের বুঝিয়ে দেয়া যে তারা ছাগল। ‘কাঁধে হাত তোলা’ পুরুষদের বলতে চাই, এভাবে অযথা নারীদের কাঁধে হাত তুলে দিবেন না। এটা ভদ্রতার পরিপন্থী এবং আপনার ছাগলত্বের প্রমাণ মাত্র, পৌরুষের প্রমাণ নয়।
আরেকটি কথা, নারীদের উদ্দেশ্যে। যদি আপনার কাঁধে অনাকাঙ্খিতভাবে কেউ এমন হাত তুলে দেয় তাহলে কনুই চালিয়ে মৃদু গুঁতো মেরে তাকে হাত নামাতে বাধ্য করুন। অথবা তাদের পাশ থেকে সরে দাঁড়ান। আর যদি ছাগলদের স্পর্শ আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্য কিছু বলার নেই। এটা আপনার ব্যক্তিগত অভিরুচির বিষয়।

শেয়ার করুন:
  • 28
  •  
  •  
  •  
  •  
    28
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.