বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে আমাদের ‘নারীবাদ’

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আজও “নারীবাদ” বা “ফেমিনিজম”- কে সমর্থন করেন না । অনেকেই মনে করেন সম-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তাই নারীবাদ একটি পুরনো এবং অপ্রাসঙ্গিক ধারণা। অনেকে ভাবেন, সম-অধিকার আজও অর্জিত হয়নি, তাই নারীবাদী আন্দোলনগুলো চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। আবার অনেকে সম-অধিকারে বিশ্বাস রাখেন ঠিকই, কিন্তু তারা “নারীবাদ” বা “ফেমিনিজম” শব্দটির সাথে একমত নন।

তবে যারা ব্যক্তিপর্যায়ে জেন্ডারভিত্তিক অবিচারের মধ্যে জীবনযাপন করেন বা করেছেন এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া অবিচারের কারণ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে বা সামাজিক ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন, তারা জানেন যে সম-অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

দৈনন্দিন চলার পথে আমরা জেনে, না জেনে, বহু জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যমূলক আচরণ দেখি এবং এড়িয়ে যাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা বৈষম্যমূলক আচরণটি চিহ্নিত করতেই ব্যর্থ হই। কারণ নারীবাদ বা ফেমিনিজম বিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞান আমাদের অত্যন্ত সীমিত। অভিধান ঘাটলে নারীবাদের সহজ যে সংজ্ঞাগুলো আমাদের চোখে পড়ে তা তার মূল বক্তব্য হলো-

নারীবাদ নারী অধিকার নিয়ে কথা বলে;
নারীবাদ নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সম-অধিকার নিয়ে কথা বলে;
এবং নারীবাদ নারী-পুরুষের সম-অধিকার দাবি করে।

তবে একটা বিষয় মনে রাখা আবশ্যক, নারীবাদ নারী-পুরুষের সম-অধিকার দাবি করে বটে, কিন্তু কখনই নারী -পুরুষ “একই” তা দাবি করে না। অর্থাৎ নারী-পুরুষের শারীরিক পার্থক্যকে অস্বীকার করে না। তাই যারা নারী-পুরুষ সমান নয় বলে তর্কে জড়িয়ে পড়েন, এবং বলেন- নারী পুরুষ আলাদা (শারীরিকভাবে) তাই তাদের অধিকারও আলাদা, তাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে সম-অধিকারের সাথে শারীরিকভাবে (দেখতে) একই হবার কোন সম্পর্ক নাই। যদি থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে শুধুমাত্র শক্তিশালী পুরুষেরাই সকল সুযোগ-সুবিধা পাবার অধিকার রাখতো, আর দুর্বলেরা আজীবন শক্তিশালীদের সেবা করতেন। সেক্ষেত্রে বোধ করি আশি ভাগ বাঙ্গালী পুরুষ পৃথিবীর বহু পুরুষদের থেকে পিছিয়েই থাকতেন। তাই নারীবাদের মধ্য দিয়ে যদি নারী আধিকার রক্ষিত হয়, তবে পুরুষের অধিকার কোনভাবে অরক্ষিত হয় না।

যেমন ধরুন, বর্ণ-ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে অধিকাংশ সমাজ পুরুষের ঘাড়ে উপার্জনের যে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে, সেখানে একমাত্র নারীবাদ-ই বলছে উপার্জন করার সক্ষমতা নারী-পুরুষের উভয়েরই আছে, তাই উপার্জনে অধিকার দুই পক্ষেরই সমান। ঘরের যাবতীয় কাজ, সন্তান লালন-পালন যেমন শুধু নারীর দায়িত্বাধীন নয়, তেমনি সংসারের জন্য অর্থোপার্জনের দায়িত্বও শুধু পুরুষের হতে পারে না। পরিবারের ও সংসারের সুবিধার্থে নারী-পুরুষ তাদের ঘরে বাইরের সকল কাজ নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নিতে পারে।

আগেই বলেছি, নারীবাদ শুধু নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক সম-অধিকারের কথা বলে না। অর্থনৈতিক সম-অধিকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তি অধিকারের সমবন্টনের কথা বলে। এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো যখন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সমপরিমাণ দায়িত্বও কিন্তু ঘাড়ে চেপে বসে। তবুও আমরা যখন নারী অধিকার নিয়ে কথা বলি, তখন পুরুষ অধিকার বা নারীর দায়িত্ব নিয়ে সেভাবে কথা বলি না । তার কারণ, শত শত বছর ধরে সামাজিক বিধি-নিষেধের মধ্যে জীবন যাপন করে, অধিকার পাবার ক্ষেত্রে নারীরা তাদের সহযাত্রী পুরুষদের থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছেন। তাই তাদের অধিকার নিশ্চিত করা নারীবাদী আন্দোলনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। অন্যদিকে যুগ যুগ ধরে নারীরা সংসারে তাদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশিই দায়িত্ব পালন করে আসছেন বলে তার ঘাড়ে নতুন করে দায়িত্ব চাপাবার কিছু নাই, বরং দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়ার কথা বলা যেতে পারে।

এবার যদি একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখি তবে দেখা যায় নারীবাদ বা ফেমিনিস্ট আন্দোলনের যাত্রা শুরু পশ্চিমা বিশ্বে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম-অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য। যেই ধারণা পরবর্তিতে সকল স্তরে নারী-পুরুষের মধ্যে বিভেদ দূর করার লক্ষ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। পশ্চিমা-বিশ্বের এই আন্দোলন গুটি গুটি পায়ে সময় ও প্রয়োজনের খাতিরে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সকল স্তরে। যার মূল লক্ষ্য ছিল নারীকে সামাজিক ট্যাবু বা অযৌক্তিক বিধি-নিষেধ থেকে মুক্ত করা।

এখন প্রশ্ন হলো – নারীবাদী আন্দোলনগুলো যদি সফলতার মুখ দেখে, তবে তার সুফল ভোগ করবেন কারা? তার সুফল ভোগ করবেন নারী-পুরুষ উভয়ই। যেমন ধরুন, একজন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেবল নারীর জীবন সহজ করে, তা নয়। বরং তার পারিবারিক জীবনেও সচ্ছলতা নিয়ে আসে। তখন তার পুরুষ সঙ্গীটিও সমান সুফল ভোগ করেন। তবে এখানে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে নারীকে শুধু উপার্জনক্ষম করে গড়ে তোলার কথা বলছি না। নারীর উপার্জিত অর্থে তার পূর্ণ অধিকারের পাশাপাশি সংসারে সকল দায়িত্ব সমবণ্টনের কথাও বলছি। পাশাপাশি পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার থাকবে বলে আশা রাখছি।

পরিশেষে বলতে চাই, নারীবাদ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কবে সফলতার মুখ দেখবে আমাদের জানা নাই। আর আমরা নারীবাদে বিশ্বাস রাখবো কি রাখবো না সেটাও আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তবে আমাদের অবশ্যই সচেতন থাকা উচিত যে আমাদের বিশ্বাসের কারণে যেন একটি জাতি, সমাজ এবং দেশ পিছিয়ে না পড়ে।

লেখক: অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসেলে পিএইচডিরত।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.