স্ট্যাটাস তোমার ‘সিঙ্গেল’ দেখে প্রেমের ছড়াছড়ি?

তারেক আজিজ বাপ্পী:

আমাদের সমাজে কোন প্রাপ্তবয়স্ক সিঙ্গেল মেয়ের প্রতি আলাদা আগ্রহ দেখানোর লোকের অভাব নেই। আর মেয়েটি যদি চেহারায় সুন্দর হয়, তবে তো কোন কথাই নেই। আপাত মনে হতে পারে এতো ভালোই। এর মধ্যে খারাপের কী আছে! কিন্তু না। এই এতো এতো এটেনশন, এই এতো এতো জলোচ্ছ্বাসের মতো ধেয়ে আসা প্রেমপ্রস্তাব যদি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে আপনি ব্যর্থ হোন, এইসব ভুলভাল টোপ যদি আপনি গিলে ফেলেন, তবেই আপনি শেষ।

কিছু উদাহরণ দেয়া যাক—

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং ইন্সটাগ্রাম এক্ষেত্রে ভালো কেস স্টাডির জায়গা হতে পারে। অনেকে সামাজিক মাধ্যমসমূহ কেবলমাত্র বিনোদনের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেন বলে দাবি করে থাকেন। যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সত্য থাকে না। দিনশেষে কম হোক আর বেশি হোক এইসব অনলাইন মাধ্যমে আপনার বাস্তব জীবনের প্রতিফলন বা আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেই যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি এগুলো ব্যবহার করছেন, বা আপনার অ্যাকাউন্ট সচল আছে। আর আজকের এই যুগে সামাজিক মাধ্যমসমূহ যেখানে জ্ঞানার্জন আর দেশবিদেশের নানাবিধ ইভেন্ট-অপরচুনিটিস খুঁজে পাবার সবচেয়ে কার্যকরি উপায় হয়ে উঠেছে, এগুলোর যৌক্তিক ও পরিমিত ব্যবহার যেখানে যেকারও জীবনই সুন্দরভাবে বদলে দিতে সক্ষম, সেখানে আপনি শুধু বিনোদনেই আটকে থাকলে যে ক্ষতিগ্রস্তদের দলে আছেন, এতে কোন সন্দেহই নেই।
তো একজন শারীরিকভাবে দেখতে সুন্দর মেয়ে যখন এখানে কোনকিছু পোস্ট করে তখন দেখা যায় পরিচিত-অপরিচিত মিলিয়ে পুরো জাতি যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেখানে। তার পোস্ট ভেসে যায় লাইক-কমেন্ট-রিঅ্যাক্টের বন্যায়। অপরদিকে একই পোস্ট বা একই ধরনের পোস্ট যখন কোন ছেলে করছে সেখানে তুলনামূলক নিতান্তই কম রেস্পন্স অথবা অধিকাংশ সময়ই টাইমলাইনে মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ শূন্যতা বিরাজমান (উল্লেখ্য যে এখানে প্রতিষ্ঠিত সেলিব্রেটি বা পাবলিক ফিগারদের কথা বলা হচ্ছে না। সাধারণদের কথা বলছি)।

তো আমাদের সমাজের নেটিজেনদের এই সেক্সিস্ট আচরণের মনস্তত্বটা আসলে কী বা এখানে লাভক্ষতির হিসাবটা আসলে কী, আর কার লাভ কার ক্ষতি তা বের করার একটু চেষ্টা করা যাক চলুন—

দেখা যাচ্ছে মেয়েটা যাই শেয়ার দিচ্ছে তাতেই অসংখ্য লাইক-কমেন্ট-রেসপন্স সে পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় সে যখন একদমই ননসেন্স বিষয়াদিও শেয়ার দিচ্ছে তখনও সে কোন ক্রিটিসিজম বা ফিডব্যাক কারও থেকে পাচ্ছে না। কারণ সবাই এখন চায় তার মনোরঞ্জন করতে। এবং সে তখন নিজেকে সঠিক ভেবে ওই কাজে আরও উৎসাহিত হচ্ছে। বিশেষভাবে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি রেসপন্স সে পাচ্ছে তার খোলামেলা ছবির পোস্টগুলোতে। সে তখন আরও উৎসাহিত হয়ে নিজেকে কিভাবে আরও সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা যায়, কিভাবে তার ফেবু-ইন্সটা ফলোয়ারদের মনোরঞ্জন করা যায় তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। হতে পারে ঠিক ঐ সময়টাতে তার পরিবার আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, অথচ সে তখন নিত্যনতুন ব্রান্ডেড নামীদামী পোশাক পরে ছবি পোস্ট করা নিয়ে ব্যস্ত। অনেকে আবার বিভিন্ন নান্দনিক প্রতিভা যেমন নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি ইত্যাদি যেসব প্রতিভা তাদের কখনও ছিল না সেগুলো নানাবিধ কারসাজির মাধ্যমে এখানে উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে নিজেকে এস্থেটিক প্রমানের কী প্রানান্ত চেষ্টাটাই না করে চলেছে শুধু কিছু বাড়তি লাভ আর কেয়ার রিয়াক্টের ‘ফেক রিওয়ার্ড’ এর আশায়। অথচ তার আগ্রহের জায়গা হয়তো ছিল অন্যকিছু। যেহেতু নান্দনিক প্রতিভাগুলো হুট করেই কেউ অর্জন করে না এবং ব্যক্তির সামাজিক শেকড় অর্থাৎ যে পরিবার থেকে সে উঠে এসেছে, যেভাবে তার সামাজিকীকরণ হয়েছে তার মাধ্যমে এবং দীর্ঘমেয়াদী চর্চার মধ্য দিয়ে যেহেতু এগুলো অর্জিত হয়, তাই এসব অপচেষ্টা না করে সত্যিকার আগ্রহের জায়গায় ঐ সময়টা দিলে হয়তো সে ভালো কিছু করে উঠতে পারতো।

ধরা যাক একটি মেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র এবং প্রথমদিকে সে এই বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহী ছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি নিয়ে তার ছিল অসাধারণ বিশ্লেষণ ও মডেল উপস্থাপন ক্ষমতা। কিন্তু কিছুকাল পর সে আমাদের সেক্সিস্ট-পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পেতে রাখা ফাঁদে পা দিল। সমাজ তাকে বারবার বলতে থাকলো বিয়ের কথা, পুতুলের মতো সাজুগুজু করে নিজের শরীরকে বিয়ের বাজারে দরকষাকষি করার কথা। সে তখন আর প্রথাবিরোধী কোনকিছু ভাবতে পারলো না। নিজেকে স্বাধীন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সব দ্বার তার রুদ্ধ হয়ে গেল ওখানেই।

এরপর আরেকটি বিষয় যেটা ঘটে তা হলো, এমনই একটি মেয়ে এবার যখন তার অন্য সব যোগ্যতা, প্রতিভা ও স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে দিল, তখন তার অবশিষ্ট থাকলো আর একটিমাত্র জিনিস, তা হলো তার শরীর। এখন সে ব্যস্ত হয়ে গেল তার শরীরকে প্রধান করে তুলে ঐ প্রেমের বাজারে নিজের দর যাচাই করতে। আর ঠিক এই পর্যায়ে এসেই হয় তার চূড়ান্ত পতন। সে হয় বিভ্রান্ত ও মোহগ্রস্ত। যেহেতু আগেই সে জ্ঞানচর্চা ও বড় স্বপ্ন দেখাকে থামিয়ে দিয়েছে তো এখন তার ভালমন্দ যাচাইয়ের কৌশলগত ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফ্লারটিং এর মত ভয়াবহ খেলায় সে মেতে উঠেছে। তার অবস্থা এখন “কাকে আমি ইয়েস বলি যে, কাকে বলি সরি। হায়রে কী যে করি” এরকম। এভাবেই সে একদিন ফেক, মুখোসধারী কাউকে প্রেমিক বা জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। প্রেমের ছড়াছড়ির এই ভিড়ে সে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটা যে হয়তো অন্ধের মোত তার সবকিছুতেই সহমত পোষণ না করে সঠিককে সঠিক আর ভুলকে ভুল বলে ধরিয়ে দিয়েছিল, যে ছিল তার প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী, যে তার পুরোটাকেই ভালবেসেছিল তাকে অবহেলা করলো, তাকেই হারিয়ে বসলো। বিপরীতে বেছে নিল এমন একজনকে যে হয়তো কেবলই অভিনয় করেছিল, হয়তো ঢালাওভাবে লাভ আর কেয়ার রিয়াক্ট দেয়াতে এগিয়ে ছিল। হয়তো মেয়েটার দেয়া নারীবাদী পোস্টে ছেলেটা সহমত পোষণ করে নিয়মিত লাভ-কেয়ার রিয়াক্ট দিত। কিন্তু সে ছিল আদতে ধর্মান্ধ, গোড়া, পুরুষতন্ত্রের রক্ষক। আর ততদিনে মেয়েটার বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে।

সুতরাং প্রেমের ছড়াছড়ির এই অনলাইন বা অফলাইন বাজারে একজন মেয়েকে হতে হবে কৌশলী। তার অর্জন করতে হবে ভালমন্দ যাচাইয়ের ক্ষমতা, লড়াই করার মনোবল আর দায়িত্ব নেয়ার সাহস। থাকতে হবে সঠিক মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়ার স্বাধীন সক্ষমতা; যেহেতু সমাজটা সন্দেহাতীতভাবে নারীর অধিকার ও প্রগতির বিরুদ্ধে। আর এই কৌশল বা সক্ষমতা অর্জন করতে হলে একটি মেয়েকে হতে হবে শিক্ষিত। এটাই নারীমুক্তির প্রথম ও প্রধানতম উপায়। এই শিক্ষা নামমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে সরকারি কর্মচারি বিয়ে করার জন্য শিক্ষা না। এই শিক্ষা হতে হবে ‘নারী’ পরিচয়কে ছাড়িয়ে গিয়ে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার শিক্ষা। পুরুষতন্ত্রের পেতে রাখা ফাঁদে পা না দিয়ে চামড়া সুন্দর করার আগে হতে হবে মস্তিষ্ক সুন্দর করায় আগ্রহী।

তারেক আজিজ বাপ্পী
-শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 95
  •  
  •  
  •  
  •  
    95
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.