বর্তমান প্রজন্মের চোখে এ সময়ের নারীবাদী আন্দোলন

সুমাইয়া অনন্যা:

আমি যখন নিজেকে নারীবাদী দাবি করছি, নিজের ইচ্ছায় পোশাক পরে যেখানে-সেখানে যত্রতত্র ছুটছি, কাজ করছি সবার সাথে তাল মিলিয়ে, তখন আমারই সহপাঠী হিজাব পরেই ছোটাছুটি করছে, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছে, নিজেকে একটা স্থানে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাচ্ছে সবকিছুর আগে, এবং নিজেকে নারীবাদী দাবি না করেই – তবে কি তারা নারীবাদী না? বা তাদের কাছে এই দর্শনটা ঠিক কী? তারা কেনই বা নিজেদের নারীবাদী বলতে এতো জড়তা বোধ করে?

প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাই বেশ কয়েকজনের সাথেই আমি এই বিষয়টা নিয়ে আলাপ করি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে।

তাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সারাংশ হতে পারে এমন-
১. তাদের কাছে নারীবাদ কী?
– নারীবাদ হচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক উন্নতি, তার নিজস্ব সত্ত্বা টিকিয়ে রাখা, শিক্ষিত হওয়া, নিজেকে গুটিয়ে না রাখা, সেলফডিপেন্ড হওয়া, নিজের মতামত প্রকাশ করাসহ পারিবারিক, সমাজকেন্দ্রিক বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সকল অধিকার যথাযথ পাওয়া মানুষ হিসেবে পুরুষের সমান করেই।

২. তবে তারা কেনো নিজেকে নারীবাদী বলতে চায় না?
– কারণ নারীবাদ ব্যাপারটাকে একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়েছে। ছোট চুল, বড় টিপ কিংবা সিগারেট খাওয়া, এ যেন একজন নারীবাদীর বাইরের রূপ। তাই নিজেকে নারীবাদী দাবি করে পাবলিকের গালি খাওয়া ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না, কিংবা নারীবাদ যদি সমতাবাদ হয়, মানবতাবাদ হয়, তবে নারী ছাড়াও যারা অসমতায় রয়েছে, তাদের নিয়ে তো কথা বলা হয় না, কিংবা আমি মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারছি না, তবে শুধুমাত্র এক ‘বাদ’ কপচে কী হবে?

প্রথম পয়েন্টটা যুক্তিযোগ্য হলেও দ্বিতীয় পয়েন্টটা হাস্যকর নয় কি?

তৃতীয় ঢেউয়ে থেকে চতুর্থ ঢেউ ছুঁইছুঁই সময়ে বসেও নারীবাদ বোঝানোর কিংবা বুঝতে পারার অনেক কিছুই বাকি।

তাই হতাশ না হয়ে লিখতে হবে, লিখতে হবে নারীবাদ দর্শন নিয়ে, যা সভ্যতায় মানুষ হিসেবে পুরুষের তুলনায় সর্বার্থে নারীর সমতা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।
এর প্রথম ওয়েভের প্রধান দাবি ছিল, নারীদের ভোটাধিকার, যা উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হয়, আছড়ে পড়ে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, কানাডায়।

১৯৬০ সালে সূচনা হয় নারীবাদের দ্বিতীয় ওয়েভ। সব রকম লিঙ্গবৈষম্য দূর করা, সব রকম কাজের অধিকার, প্রজনন ও গর্ভপাতের অধিকার, যৌনতার অধিকারের মতো দাবি সেই ঢেউয়ের আঘাতে সামনে উঠে আসে।
আর সেই ওয়েভ শেষ হতে না হতেই শুরু হয় তৃতীয় ওয়েভ, যার ব্যাপ্তি এখন অবধি বিদ্যমান। একে একটি ইন্ডিভিজুয়াল মুভমেন্ট, বা “একক আন্দোলন” বলা হয়, কারণ নারীবাদীকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করাও এর আওতায় পড়ে।

তো এই তৃতীয় ওয়েভে থেকে আমরা মোটামুটি নারীবাদ বিশ্বাস করেও কেন নিজেদের প্রকাশ করতে চাইছি না?
– এর পেছনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা হতে পারে আমরা জানছি না নিজে থেকে, কিংবা ভুল জেনে যাচ্ছি। যেমন, ব্রা পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা জানি আমরা!কিন্তু কজন আমরা “ফ্রিডম ট্র্যাশ ক্যান” সম্পর্কে জানি?
তৃতীয় ওয়েভে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, পারিবারিক সহিংসতারোধ, বৈবাহিক ধর্ষণের মতো বিষয় নিয়ে একদল নারী সেদিন প্রতিবাদের অংশ হিসেবে অনেক কিছুই ছুঁড়ে ফেলেছিলেন- ঘর মোছার মপ, লিপস্টিক, হাই হিল জুতা। তাদের কাছে এসব ছিল নারীর পরাধীনতার প্রতীক। একটি ‘ফ্রিডম ট্র্যাশ ক্যান’ বা ‘স্বাধীন ময়লার ঝুড়ি’তে তারা এসব ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছিলেন, যেখানে একজন নিজের পরাধীনতা প্রতীক হিসেবে ব্রা খুলে ট্র্যাশে ফেলে (যতটুকু জানা যায় পোড়ানো হয়নি)। তো পত্রিকার বদৌলতে আমরা জানলাম কেবল ব্রা পোড়ানোর ঘটনা। হাহা।

তৃতীয় ওয়েভ বা ঢেউয়ে নারীবাদীরা নিজেদেরকে নারীবাদী বলতে না চাওয়ার কারণ এও হতে পারে যে নারীবাদী শব্দটি জেন্ডারের তরল ধারণায় এবং সকল লৈঙ্গিক ভূমিকায় সম্ভাব্য নির্যাতনের ব্যাপারে অসংবেদনশীল – এই ভুল ব্যাখ্যা জন্মাতে পারে, অথবা সমালোচকগণ শব্দটিকে একচেটিয়া এবং অভিজাত বলে দাবি করতে পারেন।

এবার আসি বিশ্বজনীন প্রশ্নে যে, এই দেশের নারীবাদীরা ছোট চুল, বড় টিপ, স্লিভ্লেস ব্লা ব্লায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায় কেন?

উত্তর অবশ্যই, “সবাই না”।

যারা করে/করেন তারা নারীসুলভ দৃষ্টিতে নারীবাদকে দেখেন যেখানে নারীসুলভ ও নারীবাদী একজন ব্যক্তি এই দুটোকেই “অবজেক্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের” প্রতীক হিসেবে দেখতে পারেন। কেননা টিপ পরা, সাজগোজ করা মানেই বাইজী, শয্যাসঙ্গী হিসেবে দেখা হতো, সেখানে নারীবাদ পর্নোগ্রাফি, পতিতাবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, কে এটা করবে, কে করবে না, কিংবা কে কোন পোশাক, সাজে থাকবে তা দিয়ে তার পেশা নির্ধারণ পুরুষতন্ত্র করবে না।

একইভাবে হিজাবকে ইসলামিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য বিরোধের প্রতি একটি প্রতিরোধের প্রতীক হিসাবে দেখা যায়, যেখানে বেলি শার্টকে দেখা হয় নারী যৌনতার উপর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে। দুটোকেই আত্ম-প্রকাশের বৈধ ধরন হিসেবে দেখা হয় কিনা।

এসব আন্দোলন পুরোপুরি সার্থক না হলেও কিছুটা হলেও তো আমাদের বোঝাতে পেরেছে, প্রজন্মকে বোঝাতে পেরেছে নারী অধিকার সম্পর্কে। এইটুকুই কম কী?

তবে এই আমাদের একপক্ষের নিজেদের নারীবাদী হিসেবে প্রকাশ করা আরেক পক্ষের বিশ্বাস করেও চুপসে থাকার মূল কারণ হচ্ছে এই সমাজের উপরতলার অ্যাক্টিভিস্টগণ যখন পোশাক পরার স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছে, তখন অন্য অংশে প্রবল ভিড়ে তাঁর পুরোনো শাড়িটিকে বাঁচাতেই ব্যস্ত।
সমাজের উপরতলা যখন পরিবারের ভিতরে শ্রমের সাম্য খুঁজছে, নিচের তলা তখনও মদ্যপ স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে চাইছে।

মধ্যবর্তী একটা শূন্যতা থেকেই যাচ্ছে, কণ্ঠস্বর মিলছে না, যার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধূ ধূ মাঠ। তাই নারীবাদী লড়াইয়ের আগেই আসছে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই। যেখানে এই ফারাক নেই, সেখানে সমাজে অনুরণন উঠছে, হচ্ছে প্রতিবাদ। যেমন ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই।
আর এই অনুরণনটুকুই দরকার আমাদের, কিংবা প্লাবন।
নদীর প্লাবনে নদীও উদভ্রান্তের মতো ভেসে যায় কিনা!

শেয়ার করুন:
  • 572
  •  
  •  
  •  
  •  
    572
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.