পিছু ফিরে দেখা

রোকশানা আক্তার:

জীবনের শেষ লগ্নে পৌছে গেছি, সামনে রহস্যময় অচেনা জগৎ, যেতে হবে সেখানে, এটাই মানবজন্মের নিয়তি। কিন্তু কবে, কখন সেটাই অজানা, শুধু অপেক্ষার প্রহর গোনার পালা। অখণ্ড অবসর, তাই আজ ফেলে আসা জীবনের পাতাগুলি উলটে-পালটে দেখছি, কেমন ছিল সে জীবন? কীভাবে হেঁটে এলাম এতোটা পথ? পথটা কেমন ছিল? আর কেমন ছিল সেদিনের যাত্রা?

আজকাল বড় ক্লান্ত লাগে, কোন প্রাণশক্তি খুঁজে পাই না, একটা ভালো না লাগা ঘিরে থাকে সবসময়, মনে হয় সারাদিন খোলা বারান্দায় বসে আকাশ দেখি, আর হারিয়ে যাই মনের গভীরে। আশ্চর্য! এই আমি কি সেই আমি? যার জীবন কেটেছে কাজ, ব্যস্ততা, আর দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে? ছুটে বেড়ানো ছাড়া কখনও যে বসেও থাকতে হয় সেটাই তো জানতাম না। মনে পড়ে শীতকালে পানি গরম করতে গেলে দেরি হয়ে যাবে, তাই ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করেই দ্রুত তৈরি হয়ে, শুধু ‘চা’খেয়েই দৌড়াতাম অফিসে, আর তখন থেকেই শুরু হতো আমার প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞ। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই সাড়ে ৪টা, লাঞ্চ করতাম কোনদিন অফিসে, কোনদিন বাড়ি, প্রায়দিন স্বামীর অফিসের গেস্টদের নিমন্ত্রণ থাকতো রাতে, আর কাজের লোক থাকলেও গেস্টদের জন্য স্পেশাল রান্না আমিই করতাম। তাই যেদিন নিমন্ত্রণ থাকতো,সেদিন অফিস থেকে ফিরেই ব্যাগটি নির্দ্দিষ্ট জায়গায় রেখে, সরাসরি রান্নাঘরে। তারপর অতিথি বিদায়ের পরে শেষ হতো সেদিনের দায়িত্ব। রাতের ঘুমটাই ছিল আমার বিশ্রাম, আবার সকালে উঠে যথা নিয়মে শুরু হতো প্রতিদিনের যাত্রা, তবে প্রতিদিনের বিকেল কিন্তু একই রকমভাবে কাটতো না, আমাদের পরিবারে সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্ব ছিল, তাই সেরকম প্রোগ্রাম কোথাও হলে সেখানে স্বপরিবারে যেতামই। মিস করা হতো না।
মায়ের বাড়ির অথবা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া, আত্মীয়দের জন্য শপিং এ যাওয়া, সামাজিকতা রক্ষা করা, এমন বিভিন্ন কাজে বাইরে যেতে হতো, এছাড়া বই পড়ার প্রচুর নেশা ছিল, এইজন্য পাবলিক লাইব্রেরির সদস্যকার্ড করেছিলাম, কয়েকদিন পরপরই লাইব্রেরিতে যেতাম বই পাল্টাতে, যেদিন বাইরে বেরোনোর কোন কারণ থাকতো না, সেই দিনটা হতো শুধুই আমার,পেতাম অখণ্ড অবসর, দুপুরে বিছানায় শুয়ে বই পড়া- এটাই ছিল আমার একমাত্র বিনোদন। চাকরি করা ছাড়াও বিভিন্ন সোশ্যাল ওয়ার্ক এর সাথে জড়িত ছিলাম, তাই মাঝে মাঝে মিটিং,অথবা কোন প্রোগ্রামে যাওয়া,সেটাও বৈকালিক কাজের মধ্যে পড়তো।

আজ ভাবি…যখন কোথাও কোন মিটিং অথবা প্রোগ্রাম থাকে, তখন তৈরি হতে হবে, বাইরে যেতে হবে এসব ভাবলেই আমার ক্লান্তি লাগে, অলসতা এসে ভর করে… শরীরে, মনে। ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে কান্না এসে যায় যেতে হবে এটা ভেবেই। বিভিন্ন অজুহাত খুঁজি না যাওয়ার জন্য, না কাউকে অজুহাত দিতে হয় না, কেউ আমাকে বাধ্যও করে না, এই অজুহাত, বাধ্যবাধকতা আমার যৌবনের আমি’র কাছে, মধ্য বয়সী এই আমি’র।। ভাবি সেদিন তো কখনও ক্লান্ত হইনি, মনে হয়নি আর পারছি না একটু বিশ্রাম নেই, মনে হয়নি আমি তো মানুষ, যন্ত্র নই, অথচ যন্ত্রের মতোই ছুটেছি, নিজেকে নিয়ে ভাবার সুযোগই ছিল না। ভাবতে যে হয় সেটাই তো জানতাম না সেদিন।

কাজ, ব্যস্ততা,আর দায়িত্বের ভিড়ে কোন অবকাশ ছিল না এটা ভাবার, কীভাবে জীবন যাপন করছি, জানতাম না, ভালো আছি, নাকি মন্দ আছি? সেদিনও আমাকে কেউ বাধ্য করেনি, কোন দায়িত্বের বোঝা জোর করে- কেউ উপর চাপিয়ে দেয়নি, মনে হতো জীবন মানে তো এটাই, এই ভাবেই বাঁচতে হয়, জীবন মানেই কর্মযজ্ঞ। সে যজ্ঞে যত বেশি আহুতি দিতে পারবো, জীবনটা ততবেশি জ্বলবে, আজ ষাটোর্ধ্ব বয়েসে এসে অনু্ভব করছি জীবনের কর্মযজ্ঞে আর আহুতি দিতে পারছি না, সব ফুরিয়ে গেছে, ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কিছুই রাখিনি, নগদ যা পেয়েছি সব উপুড় করে দিয়েছি, সঞ্চয় শূন্য। তাই তো আজ জীবনটা জ্বলে উঠছে না, কেমন নিষ্প্রভ, নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে,শুধু নিভে যাওয়ার অপেক্ষা।আবার এমনটাও তো দেখি, আমার বয়সি অনেকে প্রচুর প্রাণ শক্তিতে ভরপুর হয়ে ছুটে বেড়াচেছ,তারা তো এখনও নিজেদের কর্মযজ্ঞের আলোয় জীবনের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে, তাহলে আমি কেন পারছি না? কেন আমার সঞ্চয় ফুরিয়ে গেল? ওরা হয়তো আমার মতো বোকা নয়, জীবনের অংক ঠিকমতো বুঝেছিল, তাই ওদের সঞ্চয়ের ভাণ্ডার শূন্য হয়নি, তাইতো আজও হয়তো শেষদিন পর্যন্ত নিজেদের জীবনের আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারবে, আর শেষ যাত্রা পথে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে চলে যাবে নিয়তি নির্ধারিত পথে।

আর আমি? আমার যাত্রাপথে থাকবে অন্ধকার শুধু অন্ধকার।

জীবন মানে শুধু কর্মযজ্ঞ নয়। জীবনের একটা অংকও থাকে, সঠিক নিয়মে সেই অংক করাটাও জীবনের একটা বড় অংশ,আমি অংকের হিসাবেই অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি, জীবনের হিসাবে সব গরমিল হয়ে গেছে। জীবন কখনও ভুল হিসাব মেনে নেয় না, সে নিজের মতো করে ঠিকই মিলিয়ে নেয়।। তাই আজ যেমন আছি, এটাই হয়তো জীবনের হিসাবে আমার প্রাপ্তি।

লেখিকা ও সমাজকর্মী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.