আমরা এবং আমাদের চিন্তাভাবনা

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

আমার বাবা আজ ২০ দিন হলো ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন। আমার ছোট বোন একজন নার্সের সহযোগিতায় আপ্রাণ সেবা যত্ন করছে তাকে সুস্থ করে তুলতে। আমার তিন সন্তানের সাথে এখন আরেকটা সন্তান যুক্ত হয়েছে বাবাকে নিয়ে। সে এখন আমার ছোট মেয়ে যার বয়স ৫ বছর, তার থেকেও ছোট মন-মানসিকতায়। প্রায় সকল আত্মীয়-স্বজন , বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী সবাই খোঁজ নিয়েছেন। সহমর্মিতা জানিয়েছেন, সময়ে -অসময়ে পাশে থেকেছেন। এজন্য তাদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
এই কয়েকদিনে আমি আর আমার বোন যে প্রশ্নের সম্মুখীন সবচেয়ে বেশি হয়েছি সেগুলো হলো-

১. তোমাদের মা নেই?
২. তোমাদের ভাই নেই?

উত্তর দুটোই হলো না-বোধক। উত্তর শুনে কয়েকজন দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, “তোমরা ভুল করেছো, তোমাদের মা মারা যাওয়ার পর পরই তাকে বিয়ে করিয়ে দেয়া উচিত ছিল”। অথবা আমার ভাই থাকলে ভাইয়ের বউ আমার বাবার সেবা করতো!! কী অদ্ভুত সমাজের চিন্তা ভাবনা!!
বাবা অসুস্থ হওয়ার আগে বাবাকে বিয়ে করানোর চিন্তাটা আমার প্রায়ই মনে হয়েছে। বাবাকে বিয়ে করিয়ে দিলে, সে একজন সঙ্গী পেতো! কিন্তু বাবা অসুস্থ হওয়ার পর সবাই আসলে ভিন্ন দৃষ্টিতে একথাটা বলছে। আমার বাবা বিবাহিত থাকলে বাবার অসুস্থকালীন সময়ে বাবার বর্তমান স্ত্রী, তার দেখাশুনা করতে পারতেন! অথবা যদি আমাদের একটা বা ততোধিক ভাই থাকতো, ভাইয়ের স্ত্রীরা আমার বাবার সেবা করতেন!! আমাদের বা আমার কিংবা আমার বোনকে বাবার সেবা করা লাগতো না!

আমার প্রশ্ন হচ্ছে সমাজের কাছে,
“আমার মা যখন মারা যান, তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ৪২৷ আর আমার বাবার বয়স ছিলো ষাট বছর। যদি আমার মায়ের বদলে আমার বাবা মারা যেতেন, সমাজ কি আমার মা’কে বিয়ে করাতে বলতেন? সমাজ কি বলতো, আহারে মহিলা, এখন কীভাবে সংসার সামলাবে দুইটা বাচ্চা নিয়ে? পুরো জীবন-যৌবন তার সামনে পড়ে আছে! যেহেতু আমার মা গৃহিণী ছিলেন, কীভাবে তার সংসারের খরচ চলবে! মায়ের নিঃসঙ্গতাই বা কাটবে কীভাবে? মা অসুস্থ হলে তাকেই বা কে দেখবে? “মা’য়ের অসুস্থতায় তার স্বামী তাকে সেবা করতেন” এরকমটা উপদেশ বা সহানুভূতি দেখাতেন? তাকে হয়তো তার মা-বাবার অনুগ্রহে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো তথাকথিত সমাজে। আর যদিও বা তিনি আরেকটা বিয়ে বসতেনও, তাহলে তার আর আমাদের কথা ভেবে আমি নিজেই শিউরে উঠি!!

আচ্ছা ধরলাম আমার বাবাকে আরেকটা বিয়েই করালাম, যদি আমাদের নতুন মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতো, তাহলে তার সেবা কে করতো? বাবার কি নতুন মায়ের প্রতি কোন দায়িত্ব থাকতো না? বাবার নতুন জীবনসঙ্গীর প্রতি কি আমাদের সন্তাদের কোন দায়িত্বই থাকতো না? নাকি আমরা ধরেই নিয়েছি তাকে সিনেমার “রীনা খানের” মতো! যদি দায়িত্ব থেকেই থাকে, তাহলে বাবার প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনে সমস্যা কোথায়? মেয়ে সন্তান বলে? যদি আমাদের একটা ভাই থাকতো, তাহলে কি সেই “ভাই”টি আমরা যেভাবে দায়িত্ব পালন করছি, সেভাবে করতে পারতো? করে কি? কেন, আশা করছি আমাদের চেয়ে আমাদের ভাইয়ের বউ আমার বাবার সেবা আরো ভালোভাবে করতো? কেন আমরা “বাবার দায়িত্ব পালন করতেই হবে, দ্বিতীয় কোন উপায় নাই”— এই উপদেশটা শুনলাম না! ভাই নাই বলে অন্যদের আফসোস দেখতে হলো!!

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও শুনতে হয় জমিজমা মেয়ের নামে দিও না, ছেলের নামে দাও। মেয়েকে তো বিয়ে দিয়ে দিবা! মেয়ের এতো পড়াশুনার দরকার কী? চাকরি করে তো পরের ঘরে খাওয়াবে!! কেন একটা মেয়ের মুক্তির জন্য বিয়ে দেয়াটাই একমাত্র পন্থা! কেন মেয়ের বাবারা এখনো “কন্যাদায়গ্রস্থ” পিতা? কেন শুধু ছেলেকেই সংসারের বোঝা বহন করার জন্য নিজেকে যোগ্য বানাতে হবে?

আমার ননদকে যখন আমি প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সে খুব সুন্দর একটা কথা বলেছে, আচ্ছা বৌদি, যদি দুজনে (স্বামী-স্ত্রী/ ভাই-বোন কিংবা ভাইস-ভার্সা) দু’জনে মিলে দু’জনের মা-বাবার দায়িত্ব নেয়া হয়, তাহলে কি সংসার আরও সুখের হয় না? এ উত্তরটা কি সমাজের মনে আসে না? না এলে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, শুধু মুখে বললেই হবে না,” ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা-বাবা”, তাদের ভালো রাখার দায়িত্ব সন্তানকে নিতে হবে, শুধু ছেলেকে বা মেয়েকে নয়। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান, পালটে যাবে দেশ।

শেয়ার করুন:
  • 152
  •  
  •  
  •  
  •  
    152
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.