নারী ‘গরীবের চে গরীব, ছোটলোকের চে ছোটলোক’

সুচিত্রা সরকার:

পুত্রের কল্যাণ কামনায় লোকনাথ আশ্রমে গিয়েছিলাম সেদিন। সঙ্গে ছিল মা, কাকী আর পুত্রের বাবা। করোনার জন্য ফাঁকা ফাঁকা সবাই। যখন আমরা মন্দিরের সামনে বসলাম চরণামৃত নিতে এবং ভোগ দিতে, বেশ তাড়া দিচ্ছিল আমার ঠিক পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ। মন্দিরেরই কেউ হবে।

মায়ের হাঁটুর ক্ষয় মধ্যম মানের। তিনি ইদানিং খুঁড়িয়ে হাঁটেন। বসলে দ্রুত উঠতে পারেন না। তো, এরকম অবস্থায় আমার ঠিক বা পাশে দাঁড়ানো লোকটা মাকে, তাড়া দিচ্ছিল। মা বলেছিল, একটু অপেক্ষা করেন। পায়ে সমস্যা। লোকটা হঠাৎ রেগে গেল।
আমি এবার কথা বলতে শুরু করলাম। সে যত উচ্চগ্রামে, আমার স্বর ততটা নয়। তারপর আর পারলাম না। বৃদ্ধ কথা যত বলছিলো, একইসঙ্গে আমার দিকে এগোচ্ছিলো ততোই। আমি বসে আছি। সে এগোচ্ছে (বাক্যবাণের সঙ্গে শরীরের বাণাস্ত্রও প্রয়োগ করার বাসনা, সুযোগ পেয়ে)। উত্তেজনায় আমি খেয়াল করিনি, পুত্রের বাবা বিষয়টা লক্ষ্য করলো।

লোকটার জিপার পয়েন্ট আমার মাথায় স্পর্শ করবে, এমন সময় বর দৌঁড়ে এসে লোকটাকে আটকালো। নানা বাতচিৎ হলো। কেন, কীভাবে, কোন পয়েন্টে দাঁড়ানো— প্রচুর কথা চললো। সেই সময়ে লোকটা বরকে ধাক্কা মেরে বসলো কাঁধে। মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতন আকছার, তাই বলে পুরুষের গায়ে হাত?

কারণটা আর কিছু নয়। পুরুষটি যে নিপীড়িত নারীটির পক্ষ। পদাবনত সমাজের রাজা আর সৈনিক একই মর্যাদা পায় উচ্চ সমাজের কাছে, সৈনিকও রাজার কাছে।

নিজের জন্য যতটা খারাপ লাগছিল, বরের অপমানের জন্য ততোটাই। আচ্ছা, এরপরে ও কি কখনও আমার পক্ষে দাঁড়াবে? ও উপস্থিত থাকলে কি আমি এভাবে লড়াই করতে পারবো? উচিত হবে? কুণ্ঠাবোধে নিমজ্জিত হলাম। আরণ্যক থম মেরে গেছে চেঁচামেচি, চিৎকারে। গুম হয়ে আছে। ও সঙ্গে থাকলে নিশ্চয়ই আর কখনও প্রতিবাদ করবো না, ওর মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে।

সারা মন্দিরের পূজারী, দর্শণার্থীর চোখ আমার দিকে ( ভাগ্যিস মাস্ক ছিল!)। কমিটির লোক এলো। তর্কে বিতর্কে উঠে এলো একটি যুক্তি— মন্দিরে কেউ খারাপ মন নিয়ে আসে না। কানাঘুষা শুরু হলো— ও খারাপ কাজ করেছে, ঠিক আছে, আমরা কেন চেঁচামেচি করলাম! দু’পক্ষ তো একই হয়ে গেলাম।

দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদে পুড়ছিলাম। সহজ হবার অভিনয় করছিলাম। প্রতিটা নারী, প্রতিটা পুরুষ আমাকে দেখছিল। যেন আমার গায়ে ঘা। যেন আমার শরীরে ধর্ষণ পরবর্তী চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। যেন আমিই পুরুষের স্পর্শেন্দ্রিয় জেগে ওঠার কারণ। আশপাশের মানুষগুলোকে বিষাক্ত মনে হচ্ছিল। লাল রঙের দামী ওড়িষা কটনটা ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিলো। চুলের বেণীটাকে ঘ্যাচাং ফু। অথবা নিজেই ভ্যানিশ! অযথা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করলাম। ছেলেকে বকলাম। আরো কীসব!

প্রার্থনাস্থল আলাদা কিছু নয়। সব জায়গায় যেমন উচ্চ, মধ্য, নিম্ন আছে, এ জায়গাও ব্যতিক্রম নয়। লোকটা সেই মানে একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। একটা মেয়ের সঙ্গে সে যেই ধমকের স্বরে কথা বলছে, হুমুক করছে, বাতচিতে হুজ্জত চালাচ্ছে, একটা পুরুষের ক্ষেত্রে এটা সম্ভব ছিল?

না, কখনও না। সেই পুরুষটা জানে, সমাজে সে প্রান্তিক হলেও তার চে সর্বহারা এক জাতি আছে। তার নাম নারী জাতি। হোক সে নারী শিক্ষিত, হোক টাকাওয়ালা, হোক ক্ষমতাবান। সে স্রেফ নারী। ‘মহিলা’।

আমার ঘরে যে মেয়েটি কাজ করে, তার সঙ্গে সকল ডিলিংস আমার। বেতনও আমি দেই। টানাটানিতে পড়লে মাসের মাঝখানে কাঁদো কাঁদো হয়ে টাকা নেয় আমার কাছ থেকেই। কিন্তু ঘরের পুরুষটিকে সে বিশেষ মর্যাদা দেয়। আলাদা সম্ভ্রম। কারণ ছাড়াই।

যে বাড়িটায় থাকি, ঠিক করা, এডভান্স দেয়া, সব আমি করেছি। তাকে আমার মা হাত ভর্তি করে অর্থ দেয়, যখন যা চায় বা মায়ের যা সামর্থ্য, দারোয়ানকে হাত ভর্তি করে দেয়। অথচ তাকেই দেখি নারী বলে আমাদের প্রতিনিয়ত হেয় করতে।

পরিবারে মেয়ের জামাইয়ের যে দাম, ছেলের বউকে কি একই দাম দেয়া যায়? বা আরেকটু ঘুরিয়ে বললে ঘরের মেয়েরা বোনজামাইকে যে সম্ভ্রম করে, ভাইয়ের বউকে কি একইরকম?

অফিসের পিয়ন মেয়ে বসকে যে ট্রিটমেন্ট দেয়, পুরুষ বসকে কি একই রকম?

দোকানদার? ডাক্তার? উকিল? শিক্ষক? ব্যাংকার? রাজনৈতিক নেতা?

না এদের কেউ না। কেউই নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেয় না।
নারী এদের কাছে ‘ গরীবের চে গরীব। ছোটলোকের চে ছোটলোক।’ কুবেরের মতো।

পাদটিকা:
(আমাদের চোখ সয়ে গেছে কথাটায় -‘ সমাজের সব স্তরে নারী নিগৃহিত’। আর এই ‘সব স্তর’ শব্দটার ডালপালা বেশ বিস্তৃত। সমাজে সাম্যব্যবস্থা নেই। দল, মত, পথ— সবেতেই শ্রেণি আছে। সবাই মানেন সেসব।

তো, যখন শ্রেণি আছে, চেতনাও আছে তার, আর সব ঠিকঠাক আছে, সেখানে নারী হিসেবে একরকম হতচ্ছাড়া টিট্রমেন্ট মেনে নেয়া খুব কঠিন। অপমানের বিষবাষ্পে প্রতিনিয়ত দিনযাপন, যন্ত্রণার।)

৬.২.২১
লমোদা লেন

শেয়ার করুন:
  • 225
  •  
  •  
  •  
  •  
    225
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.