কোভিডে হারিয়ে গেছে বিনয় ও ভালোবাসার স্পর্শ

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

আমাদের নিজস্বতার অনেকটুকুই নির্ভর করছে স্পর্শানুভূতির ওপর। মানবশিশু যখন মাতৃগর্ভে এম্নিওটিক ফ্লুইড দ্বারা আবৃত থাকে, তখন সে তার স্পর্শানুভূতি দ্বারা নিজের এবং মাতৃদেহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। মানবদেহ এমনভাবে সৃষ্ট যে সে স্পর্শ দ্বারা ভালোবাসা প্রকাশ করে, এবং গ্রহণ করে।

২০২০ সালের মারণব্যাধী কোভিড-১৯, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ধরনটাই বদলে দিয়েছে। এই মারণব্যাধী থেকে বাঁচার জন্য আমরা বেছে নিয়েছি একটি স্পর্শহীন সামাজিক ব্যবস্থা। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেছি পুরো এক বছর, এখনও চলছি। কখনও ভেবে দেখেছেন কি এই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে গিয়ে আমরা কী কী হারিয়েছি? কীভাবেই বা দিন যাপন করছেন তারা, যারা পড়াশোনা বা কাজের খোঁজে পরিবার থেকে দূরে এবং একা আছেন এই মহামারির দিনগুলোতে?

ভার্চুয়াল জগত এক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। অনলাইনে আমরা আমাদের কাছের মানুষের ছবি দেখেছি, কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছি। এখনও যে আমরা একে অপর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাইনি, তার একমাত্র কারণ এই ভার্চুয়াল জগত বা টেকনলজি। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে আমরা যেটা খুঁজে পাইনি তা হলো- প্রিয় মানুষগুলোর গায়ের গন্ধ, তাদের জড়িয়ে ধরার অনুভূতি এবং তাদের ভালোবাসার স্পর্শ।

লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের প্রফেসর ক্যাটরিনা ফোটোপলো বলছিলেন, “মানবদেহ সৃষ্টি হয়েছে স্পর্শানুভূতির ওপর ভিত্তি করে। স্পর্শ ছাড়া মানবদেহের মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব। সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য স্পর্শের কোন বিকল্প নেই”। তাছাড়া আমাদের আশেপাশে এরকম অনেক অসুস্থ ব্যক্তি আছেন, যাদের প্রতিনিয়ত অন্যের সাহায্য নিয়ে চলতে হয়। অন্যের স্পর্শ এবং সাহায্য ছাড়া তারা দিন অতিবাহিত করতে পারেন না। কোভিডের এই দিনগুলো তারা কীভাবে যাপন করেছেন, তা আমাদের অজানা। বিশেষ করে যখন ঘর থেকে বের হওয়া এবং বাইরের কেউ ঘরে আসা একদম বন্ধ হয়ে গেলো, তখন শুধু ভার্চুয়াল জগতে বেঁচে থাকা কতটুকু সুখপ্রদ ছিল তাদের জন্য?

লন্ডনে বসবাসরত নিনা স্মিথ, ২০১৮ সালে স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের কারণে লম্বা সময় ধরে বেড রেস্টে আছেন। প্রতিদিন হাঁটতে যাওয়া তার চিকিৎসার একটি অংশ। কোভিড লকডাউনে অন্যের স্পর্শ এবং সাহায্য ছাড়া এই কাজটি করা তার জন্য এক পর্যায়ে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল। কাছের মানুষের একটু ভালোবাসা এবং তাদের জড়িয়ে ধরার মধ্যে যে আনন্দ, তা থেকে তিনি বঞ্চিত হচ্ছিলেন, যার প্রভাব পড়েছিল তার মানসিক স্বাস্থ্যে।

এই মহামারিতে বিশ্বব্যাপী আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গণনা করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির পরিমাপ করার কোন মাপকাঠি আমাদের কাছে নেই। তাই শুরু থেকেই লকডাউনে আমরা যতো না আর্থিক সংকটের কথা ভেবেছি, সামাজিক/মানসিক সংকটের কথা তেমনভাবে ভাবিনি। তবে এক পর্যায়ে বুঝতে পেরেছি জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। যেমন, প্রতিদিন চলার পথে আমাদের নানা সময়ে নানাজনের সাথে দেখা হয়। অপরিচিতদের সাথে হাত মিলিয়ে পরিচিত হই, আর পরিচিতদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করি। খুব কাছের মানুষের সাথে দেখা হলে জড়িয়ে ধরি। এই হাত মেলানো এবং জড়িয়ে ধরার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের বিনয় এবং ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাই।

ভার্চুয়াল জগতে এই কুশলাদির স্থান নেই। তাই সারাদিন অনলাইনে বসে থেকেও আমি এবং আপনি ঘরে একা। এই একাকি জীবনে পাশে আমাদের সেই বন্ধু/বান্ধবীটি নেই, যার কাঁধে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলতে পারি।

সাইকোলজির বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে বলছে- স্পর্শ দ্বারা আমরা যে ভালোবাসা বা বিনয় অনুভব করি, তার কোন বিকল্প নেই। স্পর্শহীন সম্পর্ক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ফলপ্রসূ নয় বরং অনেকাংশে ক্ষতিকারক। স্পর্শহীন সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষ উদ্বেগ ও বিষন্নতায় ভোগে। বিশেষ করে মহামারির মতো একটি ভয়ংকর দুঃসময়ে যখন বিশ্বজুড়ে আতংক, যখন কাছের মানুষের সাহস আর ভালোবাসার খুব দরকার, যখন কারো ঘাড়ে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলার খুব প্রয়োজন, তখন বেঁচে থাকার জন্য আমরা বাধ্য হয়ে যে স্পর্শহীন সামাজিক ব্যবস্থা বেছে নিয়েছি, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যাবে আমাদের সামাজিক আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে ।

সূত্রঃ The Guardian.

লেখক অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসেলে পিএইচডি করছেন।

শেয়ার করুন:
  • 135
  •  
  •  
  •  
  •  
    135
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.