তাঁরা ভরসা করেছিলেন আমাকে …

ফাহমিদা খানম:

“তোমার হাতে কি কথা বলার জন্যে একটু সময় হবে?”

ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম হুট করে এসে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করায় অবাকই হলাম কিন্তু উনি বোরকা পরা আর মুখ ঢাকা বলে অস্বস্তি লাগছিল।

“আমি রিজভীর মা”

আমি উঠে গিয়ে উনার সাথে হাঁটা দিলাম –একই পাড়ায় থাকার সুবাদে আর উনাদের ছাদে দেখি প্রায়ই সবচে বড় কথা রিজভী ভাইয়াও একই ইউনিভার্সিটিতে পড়েন, তবে অন্য ডিপাটর্মেন্টে মাঝে-মধ্যে একইসাথে বাসে দেখা হয় মাত্র!

“তুমি কি জানো আমার ছেলেটা তোমাকে অনেক পছন্দ করে?”

আমি অবাক হয়ে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম—

“আমার ছেলেটা খুব চাপা স্বভাবের বলে মুখ ফুটে কিছুই বলে না”
“আপনি নিশ্চয় শুনেছেন আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে”
“হ্যাঁ, সেটা শুনেই তোমার কাছে আসা”
“দেখুন, এটা পারিবারিকভাবেই ঠিক হইছে, তাই এটা ভাঙ্গা অসম্ভব আর উনি কখনও বলেননি আমাকে এই কথা”
“রিজভীর জগতের সবকিছু ছিলো বাবার কাছে, বাবা মারা যাবার পর ভয়ংকর চুপ হয়ে গেছে, কিন্তু আমিতো মা তাই সব বুঝি তোমার চাচা-চাচির কাছে আমি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু ও ছাত্র বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন”।

দুজন মানুষের মধ্যে অখণ্ড নিস্তব্ধতা চলে আসে – কী বলবো বুঝতে না পেরে ঘাস ছিঁড়তে থাকি, এক সময় উনি উঠে যান—
“আমার ছেলেটা অন্যরকম তবে এটুকু বলতে পারি তুমি ঠকবে না — আসি মা দোয়া রইলো”

আমি হতভম্বের মতো দেখি উনি হাঁটা দিয়েছেন।
মফঃস্বল থেকে পরীক্ষা দেবার সময় বাবার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে এসেছিল বাবা — উনাদের আচরণ দেখে মনেই হয়নি প্রথম এসেছি, সবচেয়ে বড় কথা ভর্তি হবার পর উনারা হোস্টেলে না রেখে বাসায় রাখার প্রস্তাব বাবাকে দিয়েছিলেন–

“মেয়ে হোস্টেলে না থেকে আমাদের বাসায়ই থাকুক, আমাদের ছেলেটা বাইরে থাকে, দুই মেয়েও বিয়ের পর সংসার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত, আমরা একাই থাকি – মেয়ে এখানেই থাকুক”
বাবাও খুশি মনে রাজি হলেন। থাকতে গিয়ে অনুভব করেছি আসলে একটা বয়সের পর মানুষের একাকিত্ব কতোটা ভয়াবহ! প্রতিদিন ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার সময় দেখতাম চাচী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, ঘরে ঢুকলেই রাজ্যের গল্প নিয়ে বসতেন-

“তোর চাচার পাড়ায় বন্ধু-বান্ধব আছে তাদের সাথে গল্প করে, আমি খুব একা হয়ে গেছিরে বুঝলি”
“আপনি টিভিতে সিরিয়াল দেখলেই পারেন চাচী”
“ওসবে আমার আগ্রহ হয় নারে। আচ্ছা বল ঢাকায় এসে তোর মন বসেছে?”
“আপনারা আছেন বলেই বসেছে চাচী”

আমি নিজ থেকেই সংসারের টুকিটাকি কাজ করলেও আস্তে আস্তে ছুটির দিনগুলোতেও রান্না শুরু করে দেবার পর দেখলাম দুজন মানুষ মহানন্দে সেসব খেতেন, আর মুগ্ধ হতেন, মা মাঝেমধ্যে ফোন করে অভিযোগ জানাতেন –

“কীরে তুইতো পড়তে গিয়া আমাদের কথাই ভুলে যাচ্ছিসরে!”
“একদিন দূরে যেতে হবে সেই প্র্যাক্টিস করছি মা”

আমিও হাসতে হাসতে উত্তর দিতাম
চাচীর ছোট মেয়েটি বাসায় বেড়াতে এলে কেনো জানি আমাকে দেখলেই খুব বিরক্ত হতো – হয়তো তার রুমটি এখন আমার দখলে বলে, অথবা মা-বাবার আমার প্রতি অপত্য স্নেহ দেখে।
আমি আসলে বুঝতেই পারতাম না, তবে বিরক্তিটুকু বেশ বুঝতাম চাচী আমাকে পরে সান্ত্বনা দিতেন –
“ও একটু বদমেজাজী আগের থেকেই তুই মনে কষ্ট নিস না”

চাচীর হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা, মাঝেমধ্যে ব্যথায় খুব কষ্ট পান – আমি মালিশ করে দিতাম উনাকে। শখের বশে চাচী ছাদে বাগান করলেও ব্যথায় আর উঠতে পারেন না, আর চাচার এসবে আগ্রহ নাই। তাই গাছের অবস্থা বেহাল। দারোয়ান মাঝেমধ্যে পানি দিয়ে দায়িত্ব সারে মাত্র! আমিই ছাদে উঠে গাছের যত্ন নেওয়া শুরু করলাম। প্রায়ই দেখতাম এক বাসা পরে আরেকজনকেও ছাদে উঠতে। একদিন চাচীকে ধরে নিয়ে ছাদে যাবার পর উনি আবেগে ভেসে গেলেন।

“কতো শখ করে শুরু করেছিলাম নীরু, আগে ছাদ ভর্তি ছিলো গাছে এখন আর উঠতেও পারি না যত্ন নেওয়া দূরের কথা!”
গাছের প্রতি নেশা, না অন্যকিছু, জানি না, আমিও অল্প অল্প করে ছাদে গাছ লাগানো শুরু করে দিলাম, আর চাচীকে ধরে নিয়ে সারপ্রাইজ দিতাম।

“আল্লাহপাক তোকে সবসময় ভালো রাখুক, তুই অনেক ভালো একটা মেয়ে নীরু”
আমি চাচীর চোখে পানি দেখে বিব্রতই হতাম–
“কীরে তুই ছাদে উঠলে রিজভীও দেখি উঠে”
“বাহ উনাদের ছাদে উনারা উঠে, আমার জন্যে কেনো হবে, ঢাকা শহরে এই এক ছাদ ছাড়া আছেই কী?”
“কীরে তোর প্রেমে পড়লো না তো আবার? ছেলে কিন্তু ভালোই, বাবার মৃত্যুর পর চুপ হয়ে গেছে, আগে সারা পাড়া মাতিয়ে রাখতো এই ছেলে”

আমি চুপ করে চাচীর কথা শুনি, আর উনার প্রতি কৌতূহল বোধ করলেও সেটা বুঝতে দেই না। থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় চাচীর এক আত্মীয়া ঢাকায় বেড়াতে এসে আমাকে দেখে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। উনারা যাবার পর চাচা বাবাকে জানালেন, কিন্তু চাচী এসে বললেন –
“নীরু, তুই নিজেই ডিসিশন নে, ছেলের সাথে সাথে কথা বল, তারপর যদি মনে করিস তাহলেই আগানো যাবে”

ছেলের সাথে নেটেই কথা হলো, তার কাছেই শুনলাম, তার মায়ের পছন্দই তার কাছে মুখ্য।
“গ্রাজুয়েশন করে চলে গিয়েছিল, এতোদিন কাগজপত্র হয়নি বলে দেশে ফিরতে পারেনি”

চাচী জানালেন,
“আমি চাই তুই নিজেই ডিসিশন নে, সারাজীবনের ব্যাপার কিন্তু!”

চাচীর কথায় চুপ করে রইলাম। ছেলেপক্ষ বাবার বাড়িতে সবার সাথে কথাও সেরেছে, বাবা-মা খুবই খুশি, তাই চুপ করেই থাকি আমি।
দুইদিন কথা বলার পরেই ছেলের মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণ ভাব দেখে মনে মনে দমে যাই আমি।

“কী ব্যাপার, আজকে ফিরতে এতো দেরি করলে কেনো?”
“ক্লাসের পর বন্ধুর জন্মদিন পার্টি ছিলো সেজন্যে দেরী হয়েছে”
“বিয়ের পর এসব একদমই চলবে না নীরু, মনে রেখো আমার পরিবার খুবই রক্ষণশীল”

আরও অনেক কথাই শুনিয়েছিলেন, আমি চুপ করে শুনে গেছি মাত্র!

“কীরে কী হলো তোর নীরু? বন্ধুর জন্মদিন থেকে ফিরে বেশ ফুরফুরা লাগছিল, এখন দেখি রুম অন্ধকার করে শুয়ে আছিস?”
কী মনে করে যেনো সব কথা বলেই ফেললাম চাচীকে—

“আরে হবু বউয়ের প্রতি ভালবাসা এটা”
চাচী সহজ করতে চাইলেন আমাকে।

বিয়েটা ফোনেই হবার কথা, আর দুই মাস পর পাত্র ফিরলে ঢাকায় অনুষ্ঠান করার কথা থাকলেও হুট করেই উনারা জানালেন, নাহ পাত্র ফিরছে, আর ২০০ জন বরযাত্রীসহ উনারা বাড়িতেই যাবেন বিয়ে করাতে, যত্নের যেন অভাব না হয়! বাবার মাথায় বাজ পড়লো, এতো মানুষের জায়গা দিবে কই? বিয়ের ১৫ দিন আগে এভাবে বললে কি ম্যানেজ করা যায়? চাচী দেখলাম খুব শান্ত হয়ে আছেন, আর চাচা পাত্রপক্ষকে সমানে গালিগালাজ করছেন – চাচী ওদের সাথে কথা বলার পর নিজেও চুপ করে গেলেন, তারপর আমার হাত ধরে রিজভীদের বাসায় এসে বললেন—
“এই মেয়েকে আমি আপনাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলাম”

খুব ঘরোয়া পরিসরে বিয়েটা হয়ে গেলো চাচীর সামনেই, কিন্তু মায়ের ফোন পেয়ে জানলাম, আমি নাকি পছন্দের ছেলের সাথে ভেগে সবার মান-সম্মান ডুবিয়েছি, তাই বাবা আমার মুখ দেখতেও আগ্রহী না।

পাঁচ বছর পরের কথা –

রিজভী পাশ করে বাবার ব্যবসা দেখছে, প্রথম সন্তান জন্মানোর আগেই চাচী মারা গেলেন – কী যে কষ্ট পেয়েছিলাম! বড় মেয়ের নাম উনার নামেই রেখেছিলেন শাশুড়ি মা। দুজন মা আমার জীবনটা একদমই বদলে দিয়েছিলেন। চাচী আর শাশুড়িমা। প্রথম সন্তান জন্মের পরে মা-বাবার রাগ কমলো, এখন রিজভী বলতে উনাদের কাছে দায়িত্ববান একজন মানুষ। আমি প্রায়ই ভাবি, চাচী যেচে এই কাজ না করলে জীবনেও সেই সাহস আমি করতে পারতাম না, আর ছোট মেয়ের জন্মের পর শাশুড়িমাও মারা গেলেন। এই বাচ্চার নাম রিজভী মায়ের নামেই রেখেছে। চাচাকে জোর করে এনে আমাদের বাসায়ই রেখেছে রিজভী। বয়স্ক মানুষ একা থাকবে কেনো? প্রথমে উনি একদমই রাজি ছিলেন না, পুরনো দিনের মানুষ মেয়ের বাসায় থাকতে। কিন্তু এখন আমাদের দুই বাচ্চা নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। আমরা এখন তিন বাচ্চার দেখাশোনা করি। চাচী আর শাশুড়ি মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমা নাই আমার। তাঁরা ভরসা করেছিলেন আমাকে।

শেয়ার করুন:
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.