প্রতিবিম্ব – ঠাকুরমা

তাহমিনা সালেহ:

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুতে গিয়ে আয়নায় ছবি দেখে চমকে গেলাম। একি দেখছি! কাকে দেখছি? যাকে দেখছি তাকে তো আমি চিনি না। দেখছি এক বুড়ো শ্যামবর্ণ ভদ্রমহিলা, যার চামড়া শুষ্ক, কুঁচকে যাওয়া গাল ঝুলে পড়েছে। গাত্রবর্ণ একেবারে বিবর্ণ, মাথায় পক্ক কেশ। এতো দেখছি রূপকথার সংকলন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-র একেবারে নিখুঁত ‘ঠাকুরমা’।

আমি এক বর্তমান ‘ঠাকুরমাকে’ চিনতাম, যাকে আমি বড় হতে দেখেছি। যার গাত্রবর্ণ বলতে গেলে দুধে আলতাই ছিল, গালে লালিমা ছিল। সবাই গাল টিপে দিত। একবার বোনের স্কুলে বেড়াতে গেলে ওর বন্ধুরা বলেছিল, “তোমার বোনকে কি ধোপার বাড়ি থেকে ধুয়ে নিয়ে এসেছো?” বর্তমানে যাকে ‘জিরো ফিগার’ বলে সেই লিকলিকে ‘আদর্শ ফিগার’ ছিল তার। ৯০ পাউন্ড ওজন। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত চুল ছিল। ঘনকালো রেশমের মতো একেবারে সোজা চুল, কোনো কুঞ্চন নেই। যেটা আজকাল মেয়েরা চায়। চুল ধুতে পারতো না। মা-ভাবীরা ধুয়ে দিত। কাপড় শুকানোর তারে চুল মেলে শুকোতে হতো। যাকে বিয়ের পরে দল বেঁধে মেয়েরা দেখতে আসতো। তার সন্তানের বাপকে বলতো, কোথায় খুঁজে পেয়েছেন এই মেয়েকে?

সেই ঠাকুরমা এখন কীরকম আছেন? প্রথমে চোখের কথা বলি। চোখ ঘোলা হয়ে গেছে, গায়ের চামড়া আর মসৃণ নেই, কুঞ্চিত। লম্বায় দু’ইঞ্চি ছোট হয়ে গেছে। চুল কোথায় গেছে? যে চুল দেখলে কবি বলতে পারতো, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’। সেই চুল এখন ধুলে এক মিনিটে শুকোয়! বলতে গেলে টাকের পর্যায়ে চলে গেছে। ঘনকালো কেশ এখন সাদা রেশম।

ঠাকুরমাকে প্রশ্ন করি, ‘এই পরিণতি দেখে কি মনে ব্যথা পাও?’ হেসে উত্তর দেয়, ‘না’। যদিও এখনও সে ফোকলা দাঁত হয়নি। আরও উত্তর দেয়, ‘ডাইনোসরসহ কত প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আমিও হবো। তাতে আর আশ্চর্য কী! এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। নিয়ম তো মানতেই হবে।’
ডাইনোসর যখন বেঁচে ছিল, সারা পৃথিবী দাঁপিয়ে বেড়াতো, ভয় দেখাতো। যখন সে নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল, তখন সে নিশ্চয় পাহাড়ের অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকতো।

আমার সেই যোদ্ধা ঠাকুরমাও এখন আত্মসমর্পণ করেছে। কোনো কথা কাটাকাটি, অন্যকে শাসন করার মধ্যে সে আর নেই। এমনকি বাসার সহায়তাকারীরাও এখন মুখের ওপর বলতে সাহস পায়। বুঝতে পেরেছে বুড়িকে ব্ল্যাকমেইল করার এই তো মোক্ষম ক্ষণ।
সন্তানদেরও কিছু বলা যায় না। বললেই বলবে, ‘তুমি কিছু জানো না, তুমি অনেক আগের প্রজন্ম।’ ওদের বলা যায় না, ‘তুমি আমার হাত ধরেই বড় হয়েছো। নিদ্রাহীন চোখে আমি তোমাদের পাহারা দিয়েছি।’

বর্তমান ঠাকুরমা সম্পূর্ণ সত্যি বলেনি। বর্তমান পরিণতিতে সে নিশ্চয় ব্যথিত। ব্যথিত এজন্য যে, যখন তার সব ছিল, সে বোঝেনি তার মূল্য। কেমন করে সব চলে গেল! সে মূল্যায়ন জানতো না, যেমন নাকি আজকের প্রজন্ম জানে। গর্ব করার মতো কিছু নেই। তবুও তারা উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করে। ওরা বোঝে জীবন ছোট, একে উপভোগ করতেই হবে।

আমি ঠাকুরমা। মনটা অবশ্যই কাতর হয়। চলে যাচ্ছি। খাদের কিনারায় আছি। আজ পড়ব না হয় কাল। যেতে চাই না। সন্তানদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। তবুও আমার গাড়ি দুয়ারে প্রস্তুত। কিন্তু আমি প্রস্তুত নই। জানি একা থাকবো। শুধু মরণ আমাকে ডাকবে। আমি শুধু সুদূর থেকে হাসি আর বাঁশি শুনবো। সময় শেষ বলে চলে তো যেতেই হবে।
‘যেতে নাহি দিব’ একথা বলার জন্য আমার আর কেউ নেই।

২৭শে জানুয়ারি, ২০২১

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.