সংসার কি কেবলই নারীর?

ছন্দা দাশ:

সংসার যাদের জন্য ফাঁদ, তাঁরা কী ভেবে দেখেছেন কে এই ফাঁদ তৈরি করলো?’ স্বামী? সে নিজে? নাকি অন্য কেউ? সংসারের অলিখিত নিয়মে ঠিক হয়েছে স্ত্রীর স্বাধীনতা কতটুকু? তার কাজ, তার দায়িত্ব। আর নারীজাতিও নীরবে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছে যথানিয়মে। সংসারের এই ফাঁদে আটকা পড়ে নারী হাঁপিয়ে উঠেছে যুগের পর যুগ ধরেই, কিন্তু প্রতিবাদ করেনি। এদিক থেকে বিচার করলে এ ফাঁদ তৈরি করার পেছনে নারীদেরও দায়ী করা যায়। দিনের পর দিন যাচ্ছে। সমস্যা বাড়ছে, নারী শিক্ষিতা এবং সচেতন হচ্ছে, এবং সংসারও এখন তাদের কাছে ফাঁদ মনে হচ্ছে। কেননা বিয়ের আগে যে নারী বাবা, মা,ভাই-বোন,বন্ধু -বান্ধব নিয়ে আনন্দে কাটিয়েছে, বিয়ের কয়েক বছর পরেই সে হয়ে পড়ে একেবারে বিচ্ছিন্ন।

বিয়ের প্রথম জোয়ারের পর যখন স্বামী আস্তে আস্তে জড়িয়ে পড়েন বাইরের কাজে। স্ত্রী তখন থাকেন তাঁর সন্তান নিয়ে আলাদা জগতে। সে জগতে থাকে না আত্মীয় পরিজন, ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধব। প্রায় সংসারে স্ত্রীদের ক্ষমতা থাকে না তার নিজের বা সন্তানের ন্যুনতম চাহিদা মেটাবার। এভাবে নারী বন্ধু-বান্ধবহীন বা আত্মীয়ের সঙ্গ ছাড়াই দিনের পর দিন তার সোনালী দিনগুলো কাটিয়ে দিচ্ছে। এমনকি নিজের গাড়ি থাকলেও স্বামীর অতিরিক্ত কাজের ঝামেলায় স্ত্রী এক মিনিটের জন্যও পায় না গাড়িটা কোন অসুস্থ আত্মীয়কে দেখে আসার জন্য। সংসার সেসব নারীদের জন্য তখন হয়ে ওঠে ফাঁদ।

এই ফাঁদের রকমভেদ আছে। কোন নারীর কাছে ফাঁদ এজন্যে—

যখন সে তার স্বামীর সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়, সেসব স্ত্রীদের স্বামীরা থাকেন ঘরের বা দেশের বাইরে। আবার কিছু কিছু স্বামী আছেন যাঁরা যদিও সংসারেই থাকেন, কিন্তু শুধুমাত্র রাতের জন্য। আর মধ্যরাতেই তাঁরা হয়ে ওঠেন স্বামী। বাদবাকি ভোর রাত থেকে শুরু হয় তাঁদের কাজ। কাজের তোড়ে অফিসের ফাইলগুলোও চলে আসে তাঁদের বিছানায়।

নারী ক’দিন আর এ ফাঁদে আটকা থাকবে? সেতো আজ শিক্ষিতা হচ্ছে, তার বিবেক নাড়া দিচ্ছে। সে প্রতিবাদ করতে শিখেছে। একজন শিক্ষিতা এবং স্বাধীনচেতা নারী কখন চাইবে সে তার মায়ের মতো শুধুমাত্র ঘর গোছানো, মেঝে পরিস্কার করা, রান্না-বান্না বা সন্তান পালনে জীবন ব্যয় করার? এসব করার জন্য শিক্ষার শেষ ধাপ অতিক্রমের দরকার হয় না। কাজেই একজন উচ্চশিক্ষিতা নারীকে যখন শুধুমাত্র ঘরের কাজের জন্য আটকে রাখা হয়, তখন সংসার তার কাছে ফাঁদ হবেই।
যখন কোন শিক্ষিতা এবং সচেতন স্ত্রীর চলাফেরার ক্ষমতাটুকুও নির্ভর করে স্বামীর উপর, যখন স্ত্রীর সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে না–অর্থাৎ স্ত্রীর সর্বময় কর্তৃত্ব করবেন স্বামী –তখনই স্ত্রী হয় অপমানিত, এবং সংসার তাদের জন্য সত্যিই একটি ফাঁদ।

আমাদের দেশের অনেক গৃহবধূর আনন্দের দিন সেই দিনটি যেদিন বিকেলে সেজেগুজে স্বামীর সাথে বেড়াতে বের হয়। এককভাবে তার আলাদা কোন আনন্দ নেই। দিনের পর দিন এই ফাঁদের বাসিন্দাদের অশান্তি বাড়ছে। সত্যিকারভাবে বলতে গেলে বর্তমান যুগ বড়ই সমস্যাসংকুল।মানুষের আনন্দের দিন বলতে কোন দিনই নেই। মাসের সবকটি দিন কেটে যায় প্রচণ্ড খাটুনি, দুশ্চিন্তা আর হতাশায়। মানুষ শারীরিক এবং মানসিকভাবে হয়ে পড়ছে অবসাদগ্রস্ত। তাদের আর মানসিকতা থাকে না দাম্পত্য মিলনের সুন্দর সময়কে উপভোগ করার। স্বামী আশা করে ঘরে বা স্ত্রীর কাছে শান্তি। অথচ স্ত্রী চায় স্বামীর কাছে। তখনই লাগে সংঘাত। স্বামীর বক্তব্য থাকে সংসারের অর্থকরি দিকটা তো আমিই সামলাই, আর তাই একতরফাভাবে তিনি ভাবেন স্ত্রীদেরই এককভাবে দায়িত্ব স্বামীকে সুখ দেওয়া। এর ফলে দুজনের কাছেই সংসার হয়ে ওঠে ফাঁদ।

সবচাইতে বেশি অসুখী নারী তারাই, যারা শিক্ষিতা, সচেতন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং কর্মঠ। সংসারের এই ফাঁদে আটকে থাকা তাঁদের জন্য খুবই কষ্টকর। আজ অনেক নারীই মনে মনে এই ফাঁদ থেকে পরিত্রাণ চান। এ প্রজন্মের কোন নারীর কাছেই বিয়ে মানে মনে করা উচিৎ নয় যে সে এককভাবে সংসার দেখাশোনা করবে, রান্না-বান্না করবে, সন্তান পালন করবে, ঘর সাজাবে বা সংসারের প্রতিটি কাজে এককভাবে সেই অংশ নেবে। এখনও বেশির ভাগ নারী তাদের জীবনের উন্নতির আশা করে স্বামীর জীবিকাকে কেন্দ্র করে। আমাদের সমাজেও একজন নারীর সামাজিক মর্যাদা নির্ভর করে স্বামীর পদমর্যাদার উপর। সেজন্য স্বামীও তার শারীরিক ও মানসিক শক্তির বেশির ভাগ ব্যয় করে তার কাজে। স্বাভাবিক কারণেই সে স্বামী তার স্ত্রীকে যথেষ্ট সময় দিতে পারে না। ঠিক তখনই সংসারের ফাঁদে আটকে পড়া নারী বলেন, “চাকুরিই তোমার সব, সেটাই তোমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তুমি আমাকে ভালোবাসো না। স্ত্রী শুধু ঝগড়া করে করে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে। সমস্যার আর সমাধান হয় না।

আবার অনেক নারী সংসারকে ফাঁদ তৈরি করার জন্য নিজেরাই দায়ী। কারণ তাঁরা মনে করেন তাঁরা সংসারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁর অবর্তমানে সংসার চলবে না।কাজেই সংসারের যেকোনো ছোটখাটো বিষয়েও তাঁরা এতোবেশি মাথা ঘামান –যাতে পরিবারের তথা নিজেরও অশান্তি বাড়তে বাড়তে সংসার হয়ে ওঠে তাঁদের কাছে ফাঁদ। আর কিছু নারী এতোবেশি আধিপত্য খাটাতে চান যে তাঁদের প্রবল প্রতাপে সংসার হয়ে ওঠে প্রত্যেকের কাছে অসহনীয়। অথচ এটা তাঁর নিজেরও কাম্য না।তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না সংসারের এই অশান্তি কার জন্য?

সংসারের এই অশান্তি সইতে সইতে অনেকসময় অনেক নারী মানসিকভাবে হয়ে পড়েন বিপর্যস্ত এবং এঁরা ” সাইকোসোমাটিক ইলনেস” নামে এক ধরনের অসুখে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখনই এঁরা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েন।

নারীদের একটি বিরাট অংশের চাহিদা থাকে -স্বামী সময়মতো ঘরে ফেরার, সন্তানকে, স্ত্রীকে একটু সময় দেওয়ার। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটা প্রায় স্বামীই স্ত্রীর এই ইচ্ছার দাম দেন না। স্বামীদের বক্তব্য “সে মুহূর্তে আমরা থাকি ক্লান্ত। স্ত্রী বা সন্তানকে সময় বা আনন্দ দেবার মতো মানসিকতা থাকে না। কিন্তু দিনের পর দিন অবহেলিত নারী তখন হয়ে ওঠে ক্ষিপ্ত। প্রত্যুত্তরে তখন নারীও বলেন, সারাদিন আমিও কী সংসারের জন্য, সন্তানের জন্য সময় ও পরিশ্রম ব্যয় করিনি? অথচ এজন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়। এর সমাধানের জন্য নারী-পুরুষ উভয়েরই সদিচ্ছা ও উদ্যোগী হতে হবে। স্ত্রী স্বামীকে বোঝাবে, আর স্বামী স্ত্রীর কথার মূল্য দেবে। তাহলেই সংসার তাঁদের জন্য ফাঁদ না হয়ে স্বর্গ মনে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 385
  •  
  •  
  •  
  •  
    385
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.