The Great Indian Kitchen- আমাদের প্রতিটি ঘরের গল্প

পুষ্পিতা আনন্দিতা:

‘দি গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন’ আমাদের ঘরের কাহিনী, সোজা কথায় বললে রান্নাঘরের কাহিনী, যে মেয়েরা বছরের পর বছর রান্নাঘরে জীবন পার করে দেয়, সেই মেয়েদের কাহিনী। এই মুভির প্রতিটা দৃশ্যে আপনি আপনার আশেপাশের পরিবারের ছবি দেখতে পাবেন, পুরুষতন্ত্রের গল্প পাবেন।

একটা মেয়ে যে নাচতে ভালবাসতো, তার তথাকথিত প্রেস্টিজিয়াস একটা পরিবারে বিয়ে হয়ে গেলো। সবগুলো ডায়লগে একটা করে মেসেজ। যে হাজবেন্ড মেয়ে দেখতে এসে মেয়েকে প্রথম প্রশ্ন করেছিলো, কোথায় পড়াশোনা করেছেন, সেই একই লোক বিয়ের পর বউকে জব করতে দিতে চায় না, ইভেন সে মনে করে বউকে জব করার অনুমতি দেওয়ার দায়িত্ব তার। অথচ সেই একই লোক স্কুলে বাচ্চাদের পরিবারের ভ্যালু শিক্ষা দেয়। চেনা চেনা লাগে না এই পুরুষকে?

এমন একটা পরিবারের গল্প, যেখানে পোস্ট গ্রাজুয়েট করা শাশুড়ির আজীবন কেটে যায় রান্নাঘরে। শ্বশুর সেই কথাই গর্ব করে বলে, বউ ঘরে ছিলো বলেই ছেলেমেয়ে মানুষ হয়েছে। এমন একটা পরিবার যেখানে জেন্ডার রোল ঠিক করে দেওয়া। যেখানে পুরুষের কাজ টাকা আয় করা, আর মেয়ের কাজ বাচ্চা পালন আর পরিবারকে খাইয়ে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। চেনা চেনা লাগে না এই পরিবারকে?

খুব সিম্পল একটা মুভি দিয়ে কী করে এতো স্ট্রং একটা মেসেজ দেওয়া যায়, তার উদাহরণ এই মুভি। শুধুমাত্র রান্নাঘরের ঘটনা আর চিত্র দিয়ে কী করে পুরো সমাজটার মুখে চড় দেওয়া যায়, তার উদাহরণ এই মুভি। কী নেই এখানে! ওই শ্বশুর যে নিজে সকালে উঠে ব্রাশটা আনার জন্য বউয়ের উপরে ডিপেন্ড করে, বাইরে যাবার সময় যার জুতাটা এগিয়ে দিতে হয়। বাড়ির মেয়েরা তাদের পরিবারের জন্য রান্না করে যাচ্ছে সবটুকু চেষ্টা দিয়ে। একের পর এক রান্না হচ্ছে, চেষ্টা করছে পরের বারের খাবার রেডি করতে, আর তার বিপরীতে তাদের সেই কাজের কোনো এপ্রিসিয়েশন নেই। বরং ত্রুটি ধরতে বিজি। হয় চাটনি কেন মিক্সিতে করা হলো, অথবা ভাত কেন মাটির চুলার বদলে কুকারে করা হলো। খাওয়া শেষে পুরুষরা উঠে গেলে পাশে পরে থাকে তাদের নোংরা এঁটো, যা তারা সারা টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে রাখে। সেই নোংরা টেবিলে খেতে বসে বাড়ির নারীরা … বাড়ির পুরুষগুলো খাচ্ছে আর চারপাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে এঁটো, এ যেন পুরুষতন্ত্রের আবর্জনা। রান্না,খাওয়া, নোংরা রান্নাঘর আর সেখানে সেই মেয়েটা এটা বার বার দেখতে দেখতে আপনার বিরক্ত লাগবে। পরিচালক এই একই ঘটনার বার বার রিপিটেশন করে এটাই বুঝিয়েছেন যে তাহলে যারা আজীবন এই রুটিনের মধ্যে দিয়ে যায়, তাদের জীবন কতোটা বিরক্তিকর হয়ে যায়।

পরিবারে কী পরিমাণ চূড়ান্ত হিউমিলিয়েশনের মধ্য দিয়ে মেয়েদের যেতে হয়, বা হতো, তা আছে এই মুভিতে। আবার বলতে আইসেন না যে এখন এসব হয় না, খুব হয় শুধু আপনি দেখতে পান না। যেটুকু হয় না, কারণ মেয়েরা প্রতিবাদ করে, নইলে খুব হতো। স্বামীর সাথে একই বিছানায় শুয়ে স্বামী যখন লাইট বন্ধ করতে বললো, মেয়েটা বললো, এভাবে সেক্সে তার কষ্ট হয়। হাজবেন্ড কি পারে না সেক্সের আগে ফোরপ্লে করতে! উত্তরে হাজবেন্ড কী বলে সেইটা দেখেন মুভিতে। দেখলেই বুঝবেন নারীবাদীরা যৌন স্বাধীনতার কথা কেন বলে! আপনারা তো খালি ভাবেন যৌন স্বাধীনতা মানে খালি আজ এর সাথে, কাল ওর সাথে শুয়ে পড়া। এই মুভি আপনাদের প্রশ্নের উত্তর।

এই মুভি দেখতে দেখতে মনে হবে এই তো আমার জীবনের গল্প। মেয়েদের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া পিরিয়ডের সময় এখনও মেয়েদের কতো সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিজের পরিবারের ভেতরে থেকেও মেয়েটা হয়ে গেলো অচ্ছুৎ, একা আলাদা ঘরে আনহেলদি অবস্থায় যাকে থাকতে হয় ওই কয়টা দিন। সবরীমালা মন্দিরে মেয়েদের ঢুকতে যাওয়ার বিষয়টাও এখানে উঠে এসেছে। ওই সময় মেয়েদের যে প্রতিবাদ আর তার বিরুদ্ধে পুরুষতন্ত্রের কোপ ফুটে ওঠে মুভির এক নারীবাদীর বাইক পুড়িয়ে দেওয়া আর তাকে ‘নারীবাদী’ বলে গালি আর হুমকি দেওয়ার ভেতরে।

এই পুরো মুভিটাই একটা মেসেজ। লাস্টে যখন মেয়েটা কিচেনের নোংরা জল স্বামীর গায়ে ছুঁড়ে দিলো, তখন বুঝবেন কেন আপনারা নারীবাদীদের পছন্দ করেন না। শেষে যখন ভাইটা এসে বোনের কাছে জল চায়, বোন চিৎকার করে ওঠে ‘তুই নিজে নিতে পারিস না?’ ইয়েস, এভাবেই পরিবারে একটা ছেলে প্রিভিলেজ পেয়ে বড় হয়, সেইজন্য মনে করে এসব তার পাওনা। কিচেন সিংকে না ধোয়া চায়ের কাপগুলো তার প্রমাণ।

এই সিনেমা নিয়ে আমি কী বলবো! এই একটা মুভি আমাকে কতোকিছু মনে করিয়ে দিয়েছে। এই মুভি দেখতে বসে আমার মনে পড়েছে আমার পরিচিত সেই আত্মীয়র কথা, যে ঘুম থেকে উঠে বউকে ডাকতো পায়ের সামনে স্যান্ডেল এগিয়ে দেবার জন্য, মনে পড়লো সেই সব আমার বিগত প্রজন্মের মায়েদের কথা, যারা শত শত বছর ধরে রান্নাঘরেই জীবন পার করে দিয়েছেন, সেইসব নারী এবং পুরুষ যারা বলেন, ‘নারীবাদের কী দরকার, মানবতাবাদ হলেই চলবে’ – আপনারা কতো ভণ্ড তার উত্তর এই মুভি, অথবা সেইসব পুরুষ পিরিয়ড নিয়ে ট্রল করে যারা, সেইসব মেয়েদের জীবন যারা পিরিয়ডের সময় অশুচি হয়ে যায়, ফেবুতে দেখা এমন অনেক তথাকথিত প্রগতিশীল যারা নারীবাদীদের মনে মনে গালি দেয় অথবা যাদের নারীবাদ নিয়ে খুব সমস্যা এই মুভি আপনাদের আয়নার সামনে দাঁড় করাবে, বুঝতে পারবেন আজকের একটা প্রতিবাদী মেয়ের নারীবাদ নিয়ে কেন আপনার খুব লাগে। বাবা দাদাকে প্রজন্ম ধরে যে সুবিধা ভোগ করতে দেখেছেন সেইটা যখন পাবেন না, তখন তো লাগবেই।

এই মুভি দেখলে বোঝা যাবে আজকের এই প্রতিবাদী নারীর পিছনে আছে সেইসব নারী, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধীরে ধীরে ওই কিচেনে বসেই নীরব বিপ্লব করে গেছেন, এই যে আজকের এই প্রতিবাদী মেয়ে যারা বলতে পারে আজীবন রান্নাঘরে কাটায়ে দেওয়া আমার কাজ না, পরিবারের কাজ সবার, তাদের সেই দাবির পিছনে শক্তি দিয়েছেন সেই সব নারীরা। ওইযে মেয়ে মাথা উঁচু করে সেই অপমানের জীবনে লাথি দিয়ে বের হয়ে এলো ওই মেয়েটার আজকের এই জায়গায় আসার পিছনে আছে সেই শত বছরের রান্নাঘরের মায়েদের গল্প। আমার সেইসব মায়েদের শ্রদ্ধা যাদের জন্য আজকের এই আমরা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.