নারীবাদ নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণাটা আছে সমাজে, সেটা ভাঙতে চাই: শারমিন শামস্

সুপ্রীতি ধর:

৪ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের অন্যতম অনলাইন নারীবাদী পোর্টাল ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর এর প্রথম বর্ষপূর্তির দিন। এই এক বছরে পোর্টালটি বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে, এবং সহজেই লেখক-পাঠকদের মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই আজ এই পত্রিকাটিকে এবং এর সাথে জড়িত সম্পাদক ও সহকর্মিদের। মূলত নারী অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যেকোনো অভীপ্সু আন্দোলন সহযাত্রায় সবাইকে স্বাগত জানাই এর মধ্য দিয়ে। দিনে দিনে এর পরিধি, ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত হবে, এটাই চাওয়া।

২০১৩ সালে উইমেন চ্যাপ্টার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মেয়েদের অবারিতভাবে লেখালেখির মাধ্যমে আন্দোলনের যে সূচনা করে দিয়েছিল, প্রায় আট বছরে আরও কয়েকটি নারীবাদী পোর্টাল এলেও কেউই ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের মতোন জায়গা করে নিতে পারেনি, এটা স্বীকার করতেই হবে। লেখালেখির নতুনত্ব এবং গ্রাফিকসের কাজ, সবমিলিয়ে পেশাদারিত্বের প্রমাণ রেখেছে নতুন এই পোর্টালটি।

একবছর পূর্তিতে উইমেন চ্যাপ্টার এর সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের সম্পাদক শারমিন শামস্ এর সাথে কথা বলেছিলাম।

নিচে হুবহু তা তুলে ধরা হলো –

ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর এর এক বছর পূর্তিতে সম্পাদক হিসেবে অভিনন্দন তোমাকে। কেমন লাগছে তোমার? কেমন কাটলো এই এক বছর? কেমন ছিল নতুন এই জার্নিটা?

শারমিন শামস্: অনেক ধন্যবাদ দিদি। সময় এতো দ্রুত চলে যায়, এই ব্যাপারটাই জানি কেমন- ভালোও লাগে, আবার বিস্ময়ও জাগে। নিজের সন্তানের প্রথম জন্মদিনে সব মায়েরই ভালো লাগে। বিস্ময় মেশানো ভালবাসা। আরে, এত্ত বড় হলি কবে তুই! এই ব্যাপারটাও তাই। প্রথম বছরটা ভালো কেটেছে। বলতে পারো নেশার ঘোরে কেটেছে। স্বাধীনতার আনন্দে কেটেছে। তুমি তো জানোই, আমার স্বাধীনতার বোধটা একটু বেশি বেশি ধরনের বেশি। কেউ আমাকে বাঁধতে চাইলেই আমার অস্থির লাগে। আমি সব বন্ধন ছিঁড়েখুঁড়ে কেবলই বেরিয়ে আসতে চাই। কেউ আমাকে ডিকটেট করলে, কেউ আমার কাজে অতি নির্দেশনা দিলে আমার রাগ হয়। আমি কিছু কাজ নিজের মতো করে করতে চেয়েছি। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর আমাকে স্বাধীনতার আনন্দ দিয়েছে। আমি আমার সৃষ্টিশীলতাকে উপুড় করে দিতে পেরেছি। অনেক সীমাবদ্ধতা তো আছেই। যা যা ভাবি, মাথায় আসে, বলতে গেলে তার অনেকটাই করে উঠতে পারি নাই এই এক বছরে। কিন্তু যতটা পেরেছি, করেছি। আবার তার প্রতিদানে পেয়েছি ভালবাসা। সত্যি, আমি ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর নিয়ে যত পাঠক লেখকের ভালবাসা এই এক বছরে পেলাম, তা কেমন ছিল তা আমার প্রকাশ করবার ভাষা নেই। আমি শুধু নতচিত্তে কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি। শুধু বলবো প্রত্যাশার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ প্রাপ্তি ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে।

পোর্টালটি করার পিছনে কী কী কারণ বা স্বপ্ন ছিল তোমার?

শারমিন শামস্: সত্যি যদি বলি, তাহলে বলবো, কোনো আগুপিছু না ভেবে, খুব অল্প দিনের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে হুট করেই আমি ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর শুরু করি। তুমি হয়তো জানো, আমার নিজের একটা ওয়েবসাইট ছিল। শারমিন শামস্ ডট কম নামে। তো সেখানে আমি নিজের সব কাজ টাজ, লেখা ইত্যাদি রাখতাম। নতুন লেখাও আপ করতাম। তো সাইটটা চালাতে গিয়ে দেখলাম আমার অনেক কিছু মাথায় আসছে। নারীবাদ নিয়ে। মনে হচ্ছিলো ফেমিনিজম নিয়ে কাজের জায়গাটা অনেক বিস্তৃত করা সম্ভব এবং তা লেখালেখি দিয়েই। ফেমিনিজমকে মানুষের সামনে তুলে ধরার নানান উপকরণ আমি তৈরি করতে পারি। কিন্তু সেজন্য আমার আলাদা একটা স্বাধীন প্লাটফর্ম দরকার, যেখানে আমি আমার চিন্তা, পরিকল্পনা ও সৃষ্টিশীলতার সবটুকু কাজে লাগাতে পারবো। তো এটা থেকেই ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের ভ্রুণ জন্ম নিলো। খুব কাছের কয়েকজন মানুষের সাথে আলাপ করলাম, যারা আমার খুব প্রিয় ছোট ভাইবোন। ওরা সবাই আমার পাশে ছিল, এখনো আছে। ওদের সাথে নিয়েই আমি স্বপ্ন দেখছি, স্বপ্ন পূরণ করছি।

স্বপ্ন পূরণ কতখানি হলো? আর কত বাকি?

শারমিন শামস্: সব স্বপ্ন কি কখনও পূরণ হয় আসলে? একটা স্বপ্নের লেজ ধরে আরেকটা স্বপ্ন আসে। আমার চেয়ে তুমিই তো ভালো জানো। তুমি তো মহা স্বপ্নবাজ। আসলে নারীবাদ নিয়ে যে চরম বিদ্বেষ আর নেতিবাচক চিন্তার একটি জায়গা তৈরি হয়েছে আমাদের সমাজে, আমি সেটার বিরুদ্ধে একটা ইতিবাচক সুন্দর শুভ অবস্থান তৈরি করতে চাই। আমি জ্ঞান দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, ধারালো সৃজনশীল লেখা দিয়ে সেই বিদ্বেষের জায়গাটা মুছে দিতে চাই। আমি বিশ্বাস করি ভালো লেখালেখি, প্রচার, প্রচারণা নারীবাদের বিরুদ্ধে সমাজের এই বিদ্বেষমূলক হিংস্র মনোভাবকে দূর করতে পারবে। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর নিয়ে আমি সেই কাজটিই করতে চাই।

কী মনে হয় নারীবাদ চর্চার এই যে ভ্রমণ, এটা কি এতো সহজ? মানে অন্য যারা সাধারণ অনলাইন পত্রিকা বা পোর্টাল চালাচ্ছে, তাদের তুলনায় চ্যালেঞ্জগুলো কোথায় কোথায়?

শারমিন শামস্: সহজ তো নয়ই, বরং ভীষণ কঠিন। বিশেষ করে যখন তোমার মাথায় গিজগিজ করছে অনেক অনেক আইডিয়া, চিন্তা, কাজ, কিন্তু তুমি লোকবল, অর্থবলের অভাবে তার কিছুই প্রায় করতে পারছো না। আবার তুমি নারীবাদী পোর্টাল চালাচ্ছো বলে তুমি কোনো সহযোগিতাও পাচ্ছো না। বরং তোমাকে সারাক্ষণই একটা চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কখন কার গায়ে লাগে, আর নানান রকম ঝামেলা পাকায়। তো, এসব তো আছেই। নারীবাদী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবেও তো কম ঝঞ্ঝাটে থাকি না। এর উপরে পত্রিকা। হাহাহাহা। তবে আমি খুব আশাবাদী মানুষ। ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে পারি। তাই ঝড়ঝঞ্ঝাগুলো সামলে সামনে এগিয়ে যাওয়াটাই আমার কাজ।

লেখালেখি তো অনেক আগে থেকেই করে আসছো, লেখক হিসেবে নামও হয়েছে। এখন সম্পাদক হিসেবে নতুন পরিচিতি পেলে। কোনটা তোমার কাছে বেশি ভালো লাগার? কেন?

শারমিন শামস্: লেখালেখিটা আমার জীবনের মুক্তি, আমার মেডিটেশন। এটা এতো বেশি আনন্দের যে কেউ আমার লেখা না পড়লেও হয়তো আমি লিখতেই থাকবো। আর সম্পাদকের ভূমিকা? আসলে যারা সাংবাদিক, তুমি খুব ভালো বুঝবে এটা, তারা আসলে সারা জীবনই সাংবাদিক। চাকরি-বাকরি ছাড়লেও সাংবাদিকতা ছাড়তে পারে না। এটা একটা নেশার মত ব্যাপার। সম্পাদকের কাজটা আমাকে সাংবাদিকতার আনন্দ দেয়। আমার নেশা ও পেশার যে ব্যাপারটা, সেই ব্যাপারটা আমি ধরে রাখতে পারি। আবার এক ধরনের চাপও আছে। অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হয়েছে, যা লেখকের চেয়েও যেন বেশি কখনও কখনও। লেখক মনের আনন্দে বহুকিছুই লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু সম্পাদককে দশ দিক বিবেচনা করে পত্রিকা সাজাতে হয়।

এই প্রশ্নটা করা ঠিক হবে কিনা জানি না, তারপরও জানতে চাইছি, তোমার চোখে ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের পজিটিভ ও নেগেটিভ দিকগুলো কী কী? উইমেন চ্যাপ্টারের সাথে যেহেতু অনেকদিন ছিলে, সেটারও পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিকগুলো যদি জানতে চাওয়া হয় তোমার কাছে, কী বলবে? লেখক এবং পাঠক নিশ্চয়ই আগ্রহী হবে এগুলো জানতে?

শারমিন শামস্: অবশ্যই প্রশ্নটা দারুণ। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের পজিটিভ দিক যদি বলো, আমি বলবো ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর বিষয় বৈচিত্রে ভালো করেছে। নারীবাদকে নানা অ্যাঙ্গেলে উপস্থাপন করেছে ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর। ফলে নানারকম পাঠকের মনোযোগ কাড়তে পেরেছে। অন্যদিকে নেভেটিভ দিক কিনা জানি না, যদি সীমাবদ্ধতা বলি, তা হলো, ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর প্রান্তিক জনমানুষের খুব কাছে যেতে চায়। সেটি নানা কারণে এখনো করে উঠতে পারেনি।

উইমেন চ্যাপ্টার আমার কাছে একটা ভালোবাসার নাম। আমি কখনও উইমেন চ্যাপ্টারের প্রতি ইতিবাচক না হয়ে পারি না। আমি মনে করি, নারীবাদী আন্দোলনে উইমেন চ্যাপ্টার যে ভূমিকা রেখেছে, তা বিশেষভাবে বারবার উল্লেখ করা প্রয়োজন। উইমেন চ্যাপ্টারই মেয়েদের কথা বলার পথ খুলে দিয়েছে। তাদের ফুঁসে ওঠা, ক্ষোভে জ্বলে ওঠাকে ধারণ করেছে উইমেন চ্যাপ্টার। আর উইমেন চ্যাপ্টারের নেতিবাচক দিক? ঠিক নেতিবাচক এখানেও নেই। আমি শুধু বন্ধু হিসেবে বলতে পারি, উইমেন চ্যাপ্টার আরও নতুন নতুন লেখক ও পাঠককে কাছে টানতে পারলে আরও ভালো হবে। নারীবাদ আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেবার জন্য আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া প্রয়োজন।

২০১৩ থেকে বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলন নতুন একটা মোড় নিয়েছে। একে তুমি কীভাবে দেখছো?

শারমিন শামস্: এটা তো হওয়ারই ছিল। একদিন নারীবাদ কথাটা, শব্দটা স্পষ্ট করে উচ্চারিত হবে। আমি নারীবাদী- এ কথা আমরা বুক চিতিয়ে বলতে শিখবো। এটা আরো এগিয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারে। ২০১৩ সালে যেটি শুরু হয়েছে, সেটি কিন্তু কখনো কোথাও থেমে যায়নি, আটকে থাকেনি। অথচ এর বিরুদ্ধে কি না হয়েছে! নোংরা কথা, অপপ্রচার, হুমকি, ধমকি, মৃত্যুভয়, গালিগালাজ, কুৎসিত কথা, বুলিয়িং- কি না। পারিবারিক, পেশাগত জীবনেও নারীবাদীরা নানাভাবে হেনস্থা হয়েছেন। কিন্তু তাদের কি থামানো গেছে? আটকে রাখা গেছে? উল্টো তারা তো আরও তেজি হয়েছে, আরও জোর কদমে হেঁটেছেন। সেটাই হলো আসল কথা। আনন্দের কথা।

এই যে আমরা যারা নারীবাদী পোর্টালের সাথে জড়িত, যারা আমরা নিজেদের শ্রম, অর্থ সবই খরচ করছি একটা আন্দোলনকে শুধুমাত্র একটা রূপরেখা দিতে, আমাদের নিয়ে প্রচুর সমালোচনা সব মহলে। একে তুমি কীভাবে মূল্যায়ন করো?

শারমিন শামস্: সমালোচনায় আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার বিরক্তি হয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মনোভাব দেখলে। না জেনে কথা বললে। কেউ মিথ্যে বললে আমার ভীষণ রাগ হয়। তো চারিদিকেই খালি মিথ্যে। কেউ যুক্তি দিয়ে জ্ঞান দিয়ে কথা বলে না। আজাইরা সমালোচনা করে। এর পেছনে কারণও আছে। আমাদের কাজ যে তাদের জীবনযাপনে ঝামেলা সৃষ্টি করছে, গদি টদি টলিয়ে দিচ্ছে, পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘণ্টা বাজাচ্ছে, সেটি তো তারা টের পান। রাগ টাগ তো হবেই। এসব তো বোঝাই যায়। এসব নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর কিছু নেই। তবে এটাও সত্য, নারীবাদীদের উচিত অনেক বেশি গভীর চিন্তার মানুষ হয়ে ওঠা। অনেক বেশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া। কথায় ও কাজে সৎ হওয়া। যাতে এসব ঠুনকো সমালোচনা তাদের স্পর্শও না করতে পারে।

আমাদেরকে এককথায় খারিজ করে দেওয়ার মানুষের অভাব নেই। এমনকি নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তরাও আমাদেরকে ঠিক ‘ঘরের মানুষ’ মনে করে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ আছে আমার। তোমারও কি তাই মনে হয়? যদি হয়, তাহলে কেন মনে হয়?

শারমিন শামস্: ওই যে বললাম, গদি নড়ে যাচ্ছে। বলো তো, আগে কি মেয়েরা এতো তেজ দেখাতো, এতো কথা বলতো, এতো প্রতিবাদ করতো? অনলাইনে নারীবাদ আন্দোলন অবশ্য অবশ্যই এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। উইমেন চ্যাপ্টার, ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর ভূমিকা রেখেছে। মেয়েরা আর পড়ে পড়ে মার খায় না সহজে। উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে মার দেয়। এসব তো ঘটছে। তো, এর দায় তো আমাদের আছে। যারা আমাদের ঘরের লোক ভাবেন না, তারা হয়তো নিজেদের সাফল্য, ব্যর্থতা মিলিয়ে দেখেন। কিংবা হয়তো তারা এতোটাই আত্মগড়িমার কারাগারে আটকে আছেন যে কাজের চেয়ে ঘরানা ইম্পর্টেন্ট হয়ে গেছে। তা হোক, আস্তে আস্তে সবারই ভুল ভাঙ্গবে। রিয়েলাইজেশন আসবে। এসব নিয়ে কষ্ট পাবার কিছু নাই তাই আপাতত।

এবার আসি আমাদের ঐক্যের জায়গাটায়। আমরা সবাই জানি এবং মানিও যে, নারী অধিকার রক্ষায় বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। তারপরও আমরা কেন সবাই একে-অন্যের পিছনে লেগে আছি? কেন সময়টা নষ্ট করছি? এভাবেই যদি সময়টা নষ্ট হয়, তবে আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাবো কখন? কীভাবে?

শারমিন শামস্: পিছে লেগে থাকাটা সবক্ষেত্রেই খারাপ। আমাদের জাতিগত স্বভাবই হলো এই। অ্যাক্টিভিজমের জন্য এটা খুব ক্ষতিকর। এখন হলো কি, আমরা খুব খুঁত ধরতে ওস্তাদ। আবার ধরো গঠনমূলক সমালোচনাও আমরা অনেকে নিতে পারি না। কিংবা ধরো, আসলেই কেউ কোনো অন্যায় করেছে। সেটা নিয়ে যদি তুমি রুচিশীল সমালোচনাও করো, কিংবা প্রতিবাদ জানাও, দেখবে সেটাও পছন্দ হচ্ছে না। ফলে অ্যাক্টিভিজমের জায়গাটা ব্যক্তিগত রেষারেষি, বিদ্বেষ দিয়ে ভরে উঠেছে। এটা কখন হয় জানো? যখন কেউ পড়ায়, লেখায়, কাজে, কর্মে সময় ব্যয় করতে শেখে না, উল্টো জাগতিক খ্যাতি, বস্তুগত আরাম নিয়ে পড়ে থাকে, তখনই সে এইসব পরনিন্দা, পিছে লেগে থাকা ইত্যাদিতে সময় কাটানোর প্রবণতা বাড়ে। নারীবাদী আন্দোলনে যারা থাকবেন, তাদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রচুর পড়ালেখা করা দরকার। নানা ধরনের মানুষের সাথে মেশা দরকার। দিন দুনিয়ার খবর রাখা দরকার। মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাও প্রয়োজন, সেটির প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। তাহলেই দেখবে এসব কেটে গেছে। ঐক্য আসবে শুভ সুন্দর বোধ আর ভালোবাসার ভেতর দিয়ে।

ধরতে গেলে আমরা আসলে এখনও পথের শুরুটাই খুঁজে পাইনি, কত পথ হাঁটলে পরে আমরা কোনো একটা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো বলে মনে হয়?

শারমিন শামস্: ‘‘বহুদূর যেতে হবে, এখনও পথের অনেক রয়েছে বাকি…’’ আইয়ুব বাচ্চুর গান। এটাই সত্য। আমরা নারীবাদের আঁতুর ঘরে আছি। কেবল একটু একটু করে চোখ মেলে তাকাচ্ছি। সামনে বিরাট পথ রয়েছে পাড়ি দেবার। সেই পথটা হাতে হাত রেখে হাঁটতে হবে। নাহলেই বিপদ।

কিছুদিন আগেই আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম আপাকে। উনার তিরোধানের পর একটা প্রশ্ন সামনে এসেছে, আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার জন্য নতুন নেতৃত্ব কেন তৈরি হচ্ছে না! আমি যদিও একমত নই। কারণ আমি দেখছি, অনেক অনেক নেতৃত্ব, আন্দোলনকর্মী তৈরি হয়েছে গত দুই দশকে। এবং সবাই যার যার জায়গা থেকে আন্দোলনটাকে তাদের রূপরেখা অনুযায়ীই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং যাবেও আশা করি। তোমার কী মত এ বিষয়ে?

শারমিন শামস্: আমি তোমার সাথে একমত। আয়েশা আপারা আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন। যারা পথ দেখান তারা চিরকাল থাকবেন না। আবার তাদের সক্ষমতাও কমে আসবে সময়ের সাথে সাথে। তখন এই কাজের জায়গার দায়িত্ব নতুনদের নিতে হবে। এটাই তো নিয়ম। ওনারা যেভাবে কাজটি করেছেন, নতুনরা হয়তো নতুন কোনো স্টাইলে কাজটা করবে। কিন্তু করতে হবে। এটাই আসল কথা। কাজ যেন থেমে না যায়। আমি তো বলবো এখন বরং আন্দোলনটা আরও বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। যারা নিজেকে প্রকাশ্যে অ্যাক্টিভিস্ট বলেন না, তারাও আসলে কোনো না কোনোভাবে অ্যাকটিভিজমে আছেন। প্রতিবাদ পরিবর্তনে আছেন। এটাই তো বিরাট ব্যাপার।

সবে তো একটা বছর পার করলে। সামনে আর কী কী স্বপ্ন আছে?

শারমিন শামস্: আমি চাই, সবার চিন্তার জায়গাটা বাড়ুক। আমি মানুষের ভাবনার জগতটাকে উসকে দিতে চাই। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর সেই কাজটি আরও ভালভাবে করতে চায়। নারীবাদ নিয়ে লেখালেখি যে কোনো যা-তা ব্যাপার নয়, এটা যে সিরিয়াসলি করার জিনিস, এর জন্য যে পড়াশোনাও করতে হয়, গভীরভাবে ভাবতে হয়, সেটিও যেন লেখক পাঠকরা ধরতে পারেন। আমি এ জায়গাটা নিয়েও কাজ করতে চাই।

কী মনে হয়, আমরা কি একসাথে পথ চলতে পারবো?

শারমিন শামস্: আমি চাই আমরা ফেমিনিস্টরা সবাই সবাইকে ভালোবাসি, কাঁধে কাঁধ রাখি। আমার মন খারাপের দিনে যেন তুমি এসে আমার হাত ধরো। আবার তোমার কোন সমস্যা হলে আমি যেন হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। তবে সবাই যেন সৎ থাকি। ঐক্য, ভালবাসা আর সততার সাথে আন্দোলনে থাকতে হবে। ভারচুয়াল জগতে এসে পরস্পরকে নিয়ে মন্দ কথা বলাটা আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর। এতে অনেকেই সুযোগ পায়। আমাদের উচিত রাগ, অভিমান, ক্ষোভগুলো ব্যক্তিগত যোগাযোগে মিটিয়ে নেয়া। তাহলেই হবে।

• তোমার কি মনে হয়, পুঁজিবাদ, ধর্ম এবং রাষ্ট্রীয়, সমাজব্যবস্থা, যা কিনা নারীর এগিয়ে যাবার পথে অন্যতম অন্তরায়, সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ না করে, সেগুলোর সাথে আপোস করে এইদেশে নারীবাদী আন্দোলন সম্ভব?

শারমিন শামস্: না। চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তবে কৌশলে, যাতে ফোকাস সরে না যায়। সবার আগে ভাবতে হবে যে মেয়েরা বেশিরভাগই গরীব আর অশিক্ষিত। এটা আসলে অল্প কথায় বা কাজে বুঝানো বা করা সম্ভব না।

আমার একটা অনুভূতির কথা না বললে শান্তি পাবো না। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর খুবই ভালো করছে দেখে সত্যিই আমার খুব ভালো লাগে। রিলে রেসের ব্যাটনটা যে আজ তুমি নিয়েছো এবং দৌড়টা ঠিকমতোই জারি রেখেছো, এটা ভেবেই একধরনের প্রশান্তি আসে মনে। কিছুটা রিলাক্সও অনুভব করি। আশা করবো, এই রেস জারি থাকবে, পরবর্তিতে আরও কোন যোগ্য নতুন প্রজন্ম এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

শারমিন শামস্: আমিও বলতে চাই, তুমি এবং তোমরা যারা সিনিয়র, তারাই আমার প্রেরণা। তোমাদের দেখেই তো আমি সাহস পেয়েছি। তোমার ধৈর্য আমাকে মুগ্ধ করে। আমি শুধু কাজটা করে যেতে চাই। একইভাবে চাইবো আরও মানুষ আন্দোলনে শামিল হোক। নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসুক। আমরা সবাই সবাইকে সাহায্য করবো। আমাদের এটা সম্মিলিত আন্দোলন, বিজয়ও আসবে সবার হাত ধরেই। একা কিছুই করা যায় না।

ধন্যবাদ তোমাকে সময় দেয়ার জন্য। প্রথম বর্ষপূর্তিতে আবারও অভিনন্দন। এমনি করে আরও অনেক অনেক বর্ষপূর্তি হোক, শুভকামনা।

শারমিন শামস্: তোমার জন্যও অনেক অনেক ভালোবাসা দিদি।

শেয়ার করুন:
  • 508
  •  
  •  
  •  
  •  
    508
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.