যৌনতা, যৌনাকাঙ্খা এবং যৌনদাসত্বের বিরোধ

মুশফিকা লাইজু:

গিয়েছিলাম এক শবযাত্রায় অংশ নিতে। নত মুখে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছি। যিনি মারা গেছেন তিনি পিতৃস্থানীয়। বাড়িতে অনেক ভিড়। মনটা খুবই অস্থির। ভিড়ের মধ্য থেকে দুজন পুরুষ এগিয়ে এলো, তারা অবশ্য আমার পূর্ব পরিচিত। কুশল বিনিময়ের পর বললেন, আপনি তো ফাটাফাটি লিখেন, সব লেখাই পড়ি। আমি বিনীতভাবে জানালাম, এখনও ফাটাইতে পারিনি, তবে লিখি আর কী! বলা যায়, ফেসবুক রাইটার। রেসপন্স করাতে দুজনেই দ্বিগুণ উৎসাহে আলোচনা শুরু করলেন। আমি যদিও মাস্ক পরা, তো কী হয়েছে, আমার কপালের টিপটা তো দৃশ্যমান, আর চোখের কাজল সেতো আছেই। শরীরের খাঁজভাঁজ বাড়তি পাওনা। আমি মধ্যবয়স্ক না তরুণী, তাতে কী এলোগেলো- নারী তো!! উৎসাহ-উদ্দীপনা উপচে পড়ছে তাদের। আর একটা কারণ আমি নারীবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। কথার প্যাঁচে কিছু মানহানি করতে পারলে দিগ্বিজয়ের আনন্দ সম্মুখে দাঁড়িয়ে তাদের।

প্রসঙ্গ তুললেন- আচ্ছা, ইদানিং এতো ধর্ষণ কেন বেড়েছে বলুন তো! আপনার কী মত? তারা আমার জানার বহরটা একটু মাপতে চাইছেন আর কী! আমি বললাম, কেন আবার? বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের দুর্বলতা, পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধহীন সমাজব্যবস্থা আর রাষ্ট্রের পুরুষান্ধ অবকাঠামো, এই আর কী। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু উপায় নেই। আমি মৃতের অপেক্ষায় আছি। সব নিয়ম মেনে হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের করে আনতে দেরি হচ্ছে। অগত্যা অপেক্ষা ছাড়া আর উপায় কী। তিনি বললেন, আপনার (মানে আমি) কথা আংশিক ঠিক পুরোপুরি নয়। আমি মনে করি, খুব দ্রুত পতিতালয়গুলি বড় বড় শহর থেকে উঠে যাচ্ছে সেটা একটা বড় এবং প্রধান কারণ! আমার চোখে আগুন আর পানি দুটোই খেলা করছিল। পানি, কারণ প্রিয় একজনকে হারিয়েছি, তারই অপেক্ষাতে আছি। আর আগুন, একারণে যে আমি একজন প্রকৌশল ডিগ্রিধারীর বন্য শূকরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চোখ তাকে প্রশ্ন করলো, কেন? তিনি আমাকে বললেন- জানেন তো, জৈবিক চাহিদা তো আর অস্বীকার করা যাবে না, পুরুষেরা যাবে কোথায়। জৈবিক প্রয়োজনে এদেশে পতিতালয়ই তাদের ভরসা। প্রসঙ্গত বলে রাখি আমি যৌনপল্লীকে পতিতালয় মানি না, বলিও না। যাই হোক, উনারা আমাকে আরও বোঝাতে চাইলেন যে, পুরুষের এই জৈবিক চাহিদা বিজ্ঞান সম্মত! কী বলেন?

আমার মতামত চাইলেন। তবে উত্তরের অপেক্ষা করলো না। নিজের মতামতই চাপাতে শুরু করলেন। আবারও বলা শুরু করলেন, দেখেন দেশের চাকুরীর যে অবস্থা, তাতে তো একজন ছেলের সমাজে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় লেগে যায়, তো সে কী করবে, তার যৌনক্ষুধা তো মেটাতে হবে, নাকি? উনি আবারও আমার মতামত চাইছেন, কিন্তু জবাবের অপেক্ষা করছেন না। বিদেশে, ধরেন ইউরোপ-আমেরিকাতে তো এই সমস্যা নেই, তাই না? ফ্রি সেক্সের দেশ! বলেই, মুখ থেকে মাক্সটা খুলে খ্যা খ্যা করে হাসছিলেন। এই ভেবে যে, একজন নারীবাদীকে তো দেয়া গেল একহাত। আর পুরুষের যৌনচাহিদা মেটাতে পতিতালয় যে কতটা অপরিহার্য তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইলেন যে, ধর্ষণ কমাতে হলে দেশে, পাড়া-মহল্লার আনাচে-কানাচে সরকার যেন পতিতালয় স্থাপন করে। এবং পুরুষের এই অনাকাঙ্খিত যৌন চাহিদা বিজ্ঞানেরই অবদান বা বিজ্ঞান দ্বারা বিশেষায়িত। যৌনতার প্রয়োজন হলে পুরুষ নিরুপায়। এমন ভাব ধর্ষণ যেন জ্বর-কাশি বা ঠাণ্ডাজনিত রোগ উপশমের উপায়!

আমি চটজলদি ভেবে নিলাম, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী। বললাম, আপনার কথা মানলে যদি ধর্ষণ কমে তো ভালো। কিন্তু এতো পতিতা (যৌনকর্মী) কোথায় পাবেন? ধরেন যে, আপনার ঘর থেকে তো আর কোন নারী এ পেশা নিতে চাইবে না। আমার পরিবার থেকেও না, জাতি কি তখন ভীষণ সংকটে পড়বে না? আর পুরুষের যৌনতা বিজ্ঞান আর নারীর যৌনতা কি অজ্ঞান থেকে আসে? পুরুষের জন্য পতিতালয় দরকার, তবে নারীর জন্য কী উপায়? আপনার ছেলে বড় হয়ে গেছে, প্রয়োজনে সে পতিতালয়ে যাবে, আর মেয়েও তো ছোট নেই, সে কোথায় যাবে? অবস্থা বেগতিক দেখে দুজনার মধ্যে একজন আইনজীবী ছিলেন, তিনি চলে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন এবং কেটে পড়লেন। আমি বললাম, আপনার যৌনচাহিদা পূরণের জন্য রাষ্ট্রের পতিতালয় বাড়াতে হবে। আপনার হিসু লাগবে বলে খোলা জায়গায় হিসু করতে করতে পুরো দেশটাকে প্রশ্রাবখানা বানিয়ে ফেলবেন, তবে নারীদের হিসু লাগলে তারা কী করবে? নাকি তাদের হিসু লাগে না? নাকি তাদের যৌনাকাঙ্খা পায় না! আপনার যৌনতা মেটাতে দেশে যৌন দাসত্বের প্রতিষ্ঠা চাইছেন? যৌনাকাঙ্খা পেলেই কি আপনাকে সভ্যতার বাইরে গিয়ে বর্বর হয়ে উঠতে হবে? সমাজ আপনার জন্য পতিতালয় খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করবে? আর সে সকল পতিতালয়ে প্রয়োজনীয় যোগান দিতে নিত্যনতুন নারীকে করবেন ঘরছাড়া, স্বজনহীন, বিভৎস জীবনযাপনে বাধ্য!

তিনি আবারও খ্যা খ্যা করে হাসলেন। আমতা আমতা করে বলতে চাইলেন; নারী হলো গিয়ে মায়ের জাতি, তারা সংযত, মানে তারা তাদের প্রয়োজনের ব্যাপারে এতো বেপরোয়া নয়।
পাঠক লক্ষ্য করুন, পুরুষ তাদের প্রয়োজনে কোনো নারীকে মা, জননী, দেবী, বেশ্যা, খানকী, মাগী, সুযোগ মতো সুবিধে মতো উপাধি-উপমা দিয়ে থাকেন। মানে নারী হলো পুরুষতন্ত্রের প্রয়োজনীয় ভোগের উপায়, বস্তু।

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, ধর্ষণ কমাতে হলে পতিতালয় বাড়াতে হবে একথা আমি নতুন শুনিনি। নব্বইয়ের দশকে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মুখেও শুনেছি। পুরান ঢাকার ইংলিশ রোড ধরে যেতে যেতে। অনেক পুরুষ বন্ধুকে ভাবগম্ভীরভাবে বলতে শুনেছি, যৌন পল্লীগুলি সমাজে অপরিহার্য, এরা সমাজকে কলুষমুক্ত রাখে। তখন এর গূঢ় অর্থ অনুধাবন করতে পারিনি। এতো জ্ঞানও ছিল না। সময় ভাবতে শিখিয়ে দিলো, ১৯৯৯ সালে কর্মসূত্রে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে যখন উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করি। হাজারও প্রশ্ন এসে বিবেকের দরোজায় কড়া নাড়তে থাকে।

যৌনপল্লী মূলত কাদের প্রয়োজনে আসে? কারা সমাজকে কলুষিত করে? কারা সমাজের জঞ্জাল? যৌনপল্লী যদি সমাজ কাঠামোতে না থাকতো, তবে এ সকল যৌনকর্মী নারীরা কি মরে যেতো? সমাজে তাদের বেঁচে থাকার জন্য কি অন্য কর্মসংস্থানের উপায় হতো না? আজ আমার কাছে এবং আপনাদের কাছেও এর উত্তর আছে। নেই এই যৌনদাসত্ব থেকে পরিত্রাণের উপায়। রাষ্ট্র এতো এতো উন্নয়ন ভাবনা ভাবে, বর্তমান বাংলাদেশের এতো এতো প্রবৃদ্ধি, কই কোন ক্ষমতাশীন দল তো এই বিষয়ে কোন দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিকল্পনা হাতে নেয় না! আমাদের উন্নয়নের কতো লক্ষ্য নির্ধারণ হচ্ছে, কই এমন একটি প্রাচীন নিগৃহীত পেশা থেকে নারীকে পরিত্রাণ করার কোনো পরিকল্পনা তো কোনো সরকার কিংবা রাজনীতিবিদ গ্রহণ করেন না! এতো এতো বৈদেশিক অর্থ সাহায্য আসছে, কই যৌনকর্মী পুনর্বাসন প্রকল্প তো কেউ হাতে নিচ্ছে না! আর পুনর্বাসন মানেই হাতে একটা সেলাই মেশিন ধরিয়ে দেয়া যে নয়, এটা বুঝতেও তো গোটা জীবন লেগে যাচ্ছে!

নারী, কিছু পুরুষ এবং কিছু ট্রান্সজেন্ডার মিলে কত লক্ষ পেশাদার যৌনকর্মী আছে! তাদের পুনর্বাসনে সরকারের কত অর্থ প্রয়োজন? কত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন? কেউ তা নিয়ে ভাবছে না কারণ ভিতরে-বাইরে কী নারী, কী পুরুষ, কী রাষ্ট্রযন্ত্র, কী আমরা সকলেই পুরুষতান্ত্রিকতা লালন করি, পালন করি, এবং বাঁচিয়ে রাখি। কারণ পুরুষতান্ত্রিকতার সাথে ক্ষমতার সরাসরি যোগসূত্র আছে। আর ক্ষমতার হোলি খেলা আমরা সকলেই গুড়ের মতো আস্বাদন করি। কোন কোন সমাজবিদকে বলতে শুনেছি, যৌনপল্লী সভ্যতার অংশ! আমি ভেবে পাই না, সভ্যতার অংশ না অসভ্যতার চিহ্ন!

যেহেতু রাষ্ট্রই এই ব্যবস্থাকে কোন না কোনভাবে টিকিয়ে রাখতে চায় তাই বৈদেশিক পয়সায় পালিত আমাদের মতো উন্নয়নকর্মীরা ঐ সকল পতিত (সমাজের চোখে) নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা, বাচ্চাদের শিক্ষা সেবা দিয়ে থাকি; আরও কত কী জিলাপির প্যাঁচ দিয়ে নতুন নতুন সৃজনশীল পরিকল্পনা করি, যাতে দাতাদের ও সমাজকে তাক লাগিয়ে দিতে পারি। কারণ ঐ সকল যৌনকর্মীরা উন্নয়নের মোড়কে ঢাকা আমাদেরও রুটি রুজির একটি লোভনীয় উপাত্ত। আমরা স্বীকার করি না, অথবা করতে ভয় পাই।
কারও রুটি-রুজি, কারও ভোট, কারও ক্ষমতা হারানোর ভয়ে এই অসহনীয় বর্বর পেশাটিকে আমরা কেউ চ্যালেঞ্জ করি না। প্রতিদিন কত শত কন্যাশিশু, কিশোরী কিংবা তরুণীরা এই পেশায় ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে, তার হিসাব কি সমাজ বা রাষ্ট্র রাখে? এই যে প্রায় প্রতিদিন ধর্মগুরুরা হাজার হাজার অজ্ঞ মানুষকে রাতের পর রাত জাগিয়ে নারীর কী করা উচিৎ, কীভাবে পোষাক পরা উচিৎ, কীভাবে স্বামীর সেবা করা উচিৎ ইত্যাদি ইত্যাদি ওয়াজ-নসিহত করতেই থাকেন; কখনও তো সেই সকল জ্ঞানী আলেম-ওলামাদের এই মানবেতর যৌন দাসত্বের পেশা সম্পর্কে কিছু বলতে শুনি না!

পৃথিবী ঐ প্রান্তে কে নবীকে নিয়ে কটাক্ষ করলো, আর আমার দেশের হাজার হাজার মুসলিম ভাইয়েরা জিহাদ করে রাস্তায় নেমে গেল, কই কখনও তো তাদের যৌনপল্লী থাকা না থাকা, পুনর্বাসন নিয়ে কথা বলতে শুনি না! ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলামবিরোধী! ধর্ম রক্ষার জোয়ারে দেশ যখন ভেসে যাচ্ছে, কই কেউ তো এই চ্যালেঞ্জ কখনও উত্থাপন করে না যে নারীদের যৌন শ্রমিক হওয়া ইসলামে সিদ্ধ না, নিষিদ্ধ।

ব্যক্তিগতভাবে এবং একজন নারীবাদী হিসেবে কোন শ্রমকে আমি ছোট বা ব্রাত্য করে দেখি না, কিন্তু চ্যালেঞ্জ তখনই মনে করি যখন জানি যে ৯৫% ভাগ নারী কখনও স্বেচ্ছায় এই পেশা গ্রহণ করে না। শুধুমাত্র ঐ সব পুরুষদের যৌনলালসা মিটানোর জন্য তারা প্রায় সকলেই কোন না কোন প্রহসনের শিকার, কিংবা প্রতারণার শিকার হয়ে পণ্য হিসেবে বিক্রি হয়ে ঠাঁই নেয় মানব সভ্যতার কালো গহ্বর এই যৌনপল্লীতে। তাদের আলাদা উপায় থাকলে তারা এই পেশা ছেড়ে বেরিয়ে আসতো। সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি তাদের সেই বেঁচে থাকার মানবিক স্থানটা তৈরি করে দিতে পারতো!
উপসংহারে বলতে চাই, যে সকল পুরুষেরা ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন রোধ করতে পতিতালয়ের সংখ্যা বাড়াতে চায়, তারা মূলতঃ বংশপরম্পারায় ধর্ষক। সমাজ ধর্ষক তৈরি করে, লালন করে, পালন করে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাদের তোষণ করে। তাদেরকে আমি জানোয়ার বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

শেয়ার করুন:
  • 138
  •  
  •  
  •  
  •  
    138
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.