‘না, আমি আর আস্তে কথা কমু না’

আহমেদ ফরিদ:

“না আমি আস্তে কথা কমু নাআআ! আমি আর আস্তে কথা কমু নাআআআ”- কিছুদিন আগে সন্ধ্যার পর মাগরিবের নামাজ আদায় করে একটু পড়তে বসেছিলাম। আর তখনই পাশের বিল্ডিং থেকে কোনো এক অপরিচিতা নারীর কন্ঠে ভেসে আসছিল কথা গুলো। কথাগুলো এখনো আমার কানে স্পষ্ট বাজছে।

আমি কিছুক্ষণের জন্য খানিকটা স্তব্ধ হয়ে গেলাম কথাগুলো শুনে। মেয়েটি বলেই যাচ্ছিল কথাগুলো, আর খুবই ক্ষীণ কন্ঠে একটি পুরুষ কণ্ঠও শোনা যাচ্ছিল, “আস্তে কথা কও কইতাছি, আস্তে কথা কও, নইলে কিন্তু …”। খেয়াল করলাম পুরুষটি যতই মেয়েটিকে আস্তে কথা বলতে বলছে, মেয়েটি ততই জোরে চিৎকার করে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলছে, “না, আমি আর আস্তে কথা কমু না”। আর মেয়েটি যতটাই চিৎকার করছে পুরুষটির কণ্ঠটি আনুপাতিক হারে ঠিক ততোটাই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছিল।

আমি প্রায়শই পাশের বাসা থেকে পুরুষ মানুষটির চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেতাম। কাউকে খুব বকাঝকা করছে। সেই সাথে অশ্লীল গালাগাল তো আছেই। মাঝে মাঝে মেয়েটির কান্নার আওয়াজও শুনতাম, হয়তো গায়েও হাত তুলতো! খারাপ লাগতো, কিন্তু আমার তেমন কিছুই করার ছিল না। আজকে যখন মেয়েটি চিৎকার করে কথাগুলো বলছিলো, আমার মধ্যে কেমন যেন একটা স্বস্তি অনুভব হলো। আজকে মেয়েটি তার অধিকার আদায়ের জন্য ভয়েস রেইজ করেছে। মেয়েটি তার উপর করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। সে চিৎকার করে জানান দিচ্ছে সে আর চুপ করে থাকবে না।

অন্যায় প্রতিরোধে ‘ভয়েস রেইজিং’ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে, হোক সেটা নারী কিংবা পুরুষ। ভায়োলেন্স সবার ক্ষেত্রেই হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষেত্রবিশেষে সাংসারিক জায়গায় পুরুষরাও নারী কতৃক বুলিং এর শিকার হয়। আর কিছু সময় বুলিং শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তবে আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের হার আনুপাতিক হারে বেশি। আর নির্যাতন শারীরিক, মানসিক উভয়ভাবেই হতে পারে। লোকে কী ভাববে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে, নিজের ইনসিকিউরিটি, সামাজিক মর্যাদা সবকিছু চিন্তা করে বেশিরভাগ সময়ই ভিক্টিম চুপ করে নীরবে সয়ে যায়। আর ফলশ্রুতিতে অন্যায়কারীর দাম্ভিকতা বৃদ্ধি পায়। ভয়েস রেইজ করার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অন্যায় অত্যাচার রোধ করা সম্ভব, খানিকটা হলেও অপরাধী স্তব্ধ হতে বাধ্য এক্ষেত্রে।

অপরাধীরা ভালোভাবেই জানে যে ভিক্টিম যদি ভয়েস রেইজ করে, তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে। তাই তারা ভিক্টিমের কণ্ঠরোধ করে রাখতে চায়। তারা ভিক্টিমকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিক্টিমরাও ভয়ে মুখ খুলতে চায় না। আর এভাবেই অধিকাংশ অপরাধিরা পার পেয়ে যায় এবং তারা তাদের অপরাধকর্মও চালিয়ে যায় নিশ্চিন্তে।

যারা সাহসী, যারা প্রতিবাদ করতে জানে, যারা যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভয়েস রেইজ করে, অপরাধীরা তাদের থেকে একশো হাত দূরে থাকে। নিজের বিপদ কেইবা ডেকে আনতে চায়। অপরাধীরা অপরাধকর্ম করার জন্য নিরাপদ জায়গা খোঁজে। আর সেজন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের টার্গেট থাকে আমাদের সমাজের তথাকথিত চুপচাপ, ভদ্র, সহজ সরল লক্ষ্মী মেয়েদের প্রতি। যারা সবকিছু নীরবে সহ্য করে যায়, মুখ খুলতে সাহস পায় না।

আমাদের উপমহাদেশের সমাজগুলোর একটা উদ্ভট চিত্র হলো- যেখানে অপরাধীদের লজ্জা পাওয়ার কথা, ভয় পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো ভিক্টিমরা লজ্জা পায়! ভিক্টিমরা লজ্জায়, ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে রাখে আর অপরাধীরা সমাজে দম্ভের সাথে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করে! এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের মানসিকতার জন্যই। আমরা কোনো অপরাধের কথা শুনলে ভিক্টিমকেই সবার আগে দোষারোপ করে থাকি। যার কারণে ভিক্টিমরা মুখ খুলতে সাহস পায় না। মুখ খুললেই তাদেরকে সমাজের দ্বারা আরেকবার মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তখন তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না।

আজকে প্রায় এক সপ্তাহের উপর হয়ে গেল সেই অপরিচিতা নারীকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ বা সেই পুরুষ কণ্ঠের চিৎকার, চেঁচামেচি তেমন শোনা যাচ্ছে না। লোকটি হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, নচেৎ কিছুটা ভয় পেয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। তা যেভাবেই হোক ধরে নিই যে মেয়েটি যে কিছুটা হলেও ক্রমাগত অত্যাচার হতে মুক্তি পেয়েছে। মেয়েটি কথা বলেছে বলেই সে মুক্তি পেয়েছে। মেয়েটি যদি কখনোই ভয়েস রেইজ না করতো, যদি সে দিনের পর দিন এসব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে থাকতো, তাহলে কখনোই সে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতো না।

এই মেয়েটির মতোই আমাদের দেশের বহু পরিবারেই নারীরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ৩ জনে ১ জন নারী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন! আর প্রতি ৫ জনে ১জন নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে ৩৮% নারীই নির্যাতিতা হয়েছে তাদের কাছের মানুষদের দ্বারা!

আমাদের বাংলাদেশের চিত্র এর থেকে ব্যতিক্রম কিছু হবে না। প্রায় প্রতিটি ঘরেই নারীরা বিভিন্নভাবে তারা অধিকার বঞ্চিত, অবহেলিত এবং নির্যাতিত হচ্ছে। বাসে-ট্রেনে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাস্তায়-বাজারে, কর্মস্থলে,পরিবারে; জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা বিভিন্ন ভাবে হেনস্থার শিকার হচ্ছে। আমাদেরও মুখ খুলতে হবে। যতদিন ভিক্টিম লজ্জা পাবে ততদিন অপরাধীরা দম্ভ করে চলবে। ভিক্টিমরা যদি সব লজ্জা ভুলে সাহস করে মুখ খুলতে শুরু করে, তখন অপরাধীরা লজ্জায়, ভয়ে সমাজ হতে পালাতে শুরু করবে। অর্থাৎ অপরাধীরা আর অপরাধকর্ম করতে সাহস পাবে না।

ভিক্টিমের লজ্জা অপরাধীর নিরাপত্তার চাদর স্বরূপ। সমাজ নিজে নিজে কখনো বদলাবে না, বদলাতে হবে আমাকে, আপনাকে। আমি আপনি আমরা মিলেই সমাজ। লজ্জা, ভয় এসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কথা বলতে শিখুন, প্রতিবাদ করুন, নিজেকে নিরাপদ রাখুন।

আহমেদ ফরিদ
শিক্ষার্থী,
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!

শেয়ার করুন:
  • 53
  •  
  •  
  •  
  •  
    53
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.