ধর্মান্তকরণে মৌলবাদী স্বার্থ ও ভার্চুয়াল মৌলবাদ

আলী আদনান:

এক.
ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ঈদের জামাত। নামাজ শেষে (খুতবার আগে বা পরে ঠিক মনে নেই) ইমাম সাহেব মাইকে ঘোষণা দিলেন এক হিন্দু ভাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবেন। সবাই বলে উঠলেন, মারহাবা! যথারীতি কালেমা পড়ে এক হিন্দু ভাই মুসলমান হয়ে গেলেন। নওমুসলিম এ যুবকের নামও তাৎক্ষণিক পাল্টে ফেলা হলো। মাইকে ঘোষণা করা হলো, আজ থেকে তিনি এ নামে পরিচিতি পাবেন।

নামাজ শেষ। গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে দলবদ্ধ মানুষ বাড়ি ফিরছে। কেউ কেউ কোলাকুলি করছে। অধিকাংশ লোকের মুখে আলোচনার বিষয় ধর্মান্তরিত এ যুবককে নিয়ে। সবার মুখে প্রশংসা। যাক বাবা, এ মানুষটি যেহেতু হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে তাই দোযখের আগুন থেকে বেঁচে গেল। কেউ বলছে, তুই ভাগ্যবান, আল্লাহ তোকে হেদায়েত করেছে। কেউ কেউ আফসোস করে বলছে, এমন কাজ যদি দেশের সকল হিন্দু করতো! ইস, সকল হিন্দু যদি মুসলমান হয়ে যেত!

প্রশংসা কার না ভালো লাগে। ধর্মান্তরিত যুবকও প্রশংসা পেয়ে গদগদ করছে। একদিনের ব্যবধানে সে গ্রামের সকলের আলোচনার বিষয় হয়ে যাবে এটা বোধহয় তার ধারণায় ছিল না। কিন্তু যুবকটি খেয়াল করলো, গ্রামের একজন প্রবীণ চিকিৎসক চুপচাপ। তিনি কিছুই বলছেন না। কারও আলোচনায় তেমন কোন উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।এই প্রবীণ চিকিৎসক একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে ভারতে শরণার্থী শিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। আশির দশকে অনেকে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তেমন টাকা পয়সা না থাকায় তিনি সাহস করেননি। এখন নিজের চেম্বারে বসেন। প্রচুর বইপত্র পড়েন।

যুবক উৎসাহ নিয়ে চিকিৎসক ভদ্রলোককে প্রশ্ন করেই ফেললো। বললো, কাকাবাবু ( চিকিৎসক স্থানীয় লোকদের কাছে কাকা, কাকাবাবু, ডাক্তার কাকা নামেই পরিচিত) সবাই কিছু না কিছু বলছে। আপনি কিছু বলছেন না কেন? চিকিৎসক মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, কী বলবো? আমি কী বলার আছে এতে! যুবকটি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললো, এতো বিরাট খুশির সংবাদ! এমন একটা ভালো কাজ করলাম। চিকিৎসক তখন পাল্টা উত্তরে বললেন, “দেখো, কী করেছো না করেছো সেটা তোমার ব্যাপার। তুমি হিন্দু হও, মুসলিম হও, ইহুদি হও, শিখ হও বা নাস্তিক হও- এসব একান্তই তোমার নিজের সিদ্ধান্ত। তাতে আশেপাশের যেমন কোন ক্ষতি হয় না, আমারও কিছু যায় আসে না। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।”

ধর্মান্তরিত যুবক হয়তো এমন উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিল না৷ এ মানুষটিকে মনে মনে সে শ্রদ্ধা করে৷ পড়াশোনা জানা মানুষ। একটা বৈরাগ্য ভাব আছে। কারও সাতে পাঁচে নেই৷ সে ঢোক গিলে চিকিৎসকের কথার শেষ লাইনটি টেনে ধরে বললো, “সমস্যা মানে? আপনি কোন সমস্যার কথা বলছেন?” উত্তরে চিকিৎসক বললেন, “তুমি নিজের ইচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওনি। প্রেক্ষাপট তোমাকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেছে।” যুবক প্রতিবাদ করে বললো, ” না, আমি নিজের ইচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছি।” চিকিৎসক তখন বললেন, ” তোমার মনে হচ্ছে তুমি নিজের ইচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছো। কিন্তু মনের উপর দীর্ঘদিন ধরে কৌশলে একটা প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে সেটা তুমি বুঝতে পারোনি। দীর্ঘদিন ধরে তোমার আশেপাশে এমন একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে তোমার মনে হয়েছে, তোমার নিজের ধর্ম হিন্দু ধর্ম খুব খারাপ৷ পক্ষান্তরে মুসলমান ধর্ম খুব ভালো। আবার এটাও হতে পারে খুব কৌশলে তোমার মনে নানা লোভ ঢুকানো হয়েছে। তোমাকে বুঝানো হয়েছে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তুমি খুব ভালো থাকবে।
হতে পারে সেটা এ মুহূর্তে আশেপাশে নানা সুবিধার দিক দিয়ে ভালো, সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার দিক দিয়ে ভালো। জায়গা জমি, নানা সম্পত্তির নিরাপত্তা পাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তোমাকে কেউ মুসলমান হওয়ার জন্য জোর করেনি। কিন্তু তোমার চিন্তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। যা হয়তো তুমি বুঝেছো বা বোঝনি”।

যুবকটি চিকিৎসকের কথা মন থেকে গ্রহণ করছে কী করছে না সেটা বুঝা গেল না। চিকিৎসক আবারও বলা শুরু করলেন, মুসলমান হলেই ভালো আর হিন্দু হলেই খারাপ, এটা কেমন যুক্তি? আমাদের ধর্মে ভালো মানুষ যেমন আছে, তেমনি চোর, ডাকাত, গুণ্ডা, বদমাশ সব আছে। তেমনি তোমার ধর্মেও ভালো মানুষের পাশাপাশি টাউট, বাটপার, নানা ধরনের দুর্বৃত্ত সব আছে। শুধুমাত্র একটা সাইনবোর্ডের জন্য একজন মানুষ ভালো না খারাপ তা নির্ধারণ করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে ধর্ম একটা সাইনবোর্ড।” চিকিৎসক একটু বিরতি দিয়ে বললেন, “তোমার পূর্বপুরুষ কেউ মুসলমান ছিল না। সবাই হিন্দুধর্মের নিয়ম নিষ্ঠা মেনে জীবন কাটিয়ে গেছে। তোমার আজ হঠাৎ কেন মনে হলো তারা সবাই ভুল ছিল? স্বামী বিবেকানন্দ কি ভুল ছিলেন? রামকৃষ্ণ পরমহংস কি ভুল ছিলেন? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন মুসলমান হলেন না?
যে খারাপ, সে যে ধর্মই পালন করুক না কেন সে খারাপই থাকবে। আর যে ভালো সে ভালোই। তার সাইনবোর্ড তাকে ভালো কাজে আটকাতে পারবে না।”

ধর্মান্তরিত যুবক এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়বে তা জীবনেও কল্পনা করেনি। চিকিৎসক ও ধর্মান্তরিত যুবকের মধ্যে সেদিন অনেক কথা হয়েছিল। কী কথা হয়েছিল তা এখানে সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে লেখা সম্ভব নয়। তবে কিছুদিন পর দেখা গেল যুবক আবার তার আগের ধর্মে (পারিবারিক ধর্মে) ফিরে গেছে। কেন ফিরে গেছে সেটা এদেশে যারা গবেষণা করছেন তাদের গবেষণার বিষয়।

দুই.

যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত রাজাকার শিরোমণি দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সমর্থকরা একসময় বুক ফুলিয়ে বলতো, তার মাহফিলে হিন্দু মুসলিম হয়ে যায়। এখন জাকির নায়েকের সমর্থকরাও একই কথা দাবি করে। মিজানুর রহমান আজহারী নামের এক সেলিব্রেটি ওয়াজ করে সাড়া ফেলেছিল কিছুদিন আগে। তার মাহফিলে হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া নিয়ে বেশকিছু নাটকীয় ঘটনাও ঘটে গেছে। এমন ঘটনাগুলো আমাদের মিডিয়া বেশ রং চং মেখে প্রকাশ করে। হিন্দু মুসলমান হয়ে যাচ্ছে বা হয়ে গেছে- এমন সংবাদ এমনভাবে কিছু পোর্টাল আপ করতো- মনে হতো বাংলাদেশ মহাকাশে নতুন মহাকাশযান পাঠাচ্ছে!

এমন ঘটনায় সুদূরপ্রসারীভাবে কার কী লাভ হয় বা কার কী ক্ষতি হয় সেটা গভীর তর্কের বিষয়। তবে তাৎক্ষণিক একটা লাভ হয়। সে লাভটা হলো মাওলানার। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী’র মাহফিলে হিন্দু মুসলমান হয়ে যাচ্ছে- এমন সংবাদে মাওলানা সমাজে সাঈদী’র দাপট বৃদ্ধি পেতো। বৃদ্ধি পেতে পেতে এমন একটা অবস্থা হয় মানুষ ভুলেই যায়, সাঈদী একাত্তরে একজন নরঘাতক ছিল৷ গোল্ডফিশ মেমোরির জনগণ সেই সাঈদীকে শেষ পর্যন্ত সংসদে পাঠায়। সাঈদী’র পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বিরোধীতাকারী দল জামায়াত। বিএনপি’র সাথে জোট বেঁধে তারা সংসদে গিয়ে মন্ত্রীত্ব পেয়ে যায়। আমরা খেয়াল করলে দেখছি, হিন্দু থেকে মুসলমানে ধর্মান্তরিত করার কতো কয়েকটি ঘটনার ফল হিসেবে জামায়াতের মতো দলকে সংসদে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের কাছে যেটা ‘বেহেশতে যাওয়ার সুযোগ’ ওদের কাছে সেটাই ‘ক্ষমতা’। শুধুমাত্র ধর্মান্তকরণকে ব্র্যান্ডিং করে একজন শয়তান হয়ে যায় দেবদূত! অপমানিত হয় শহীদের রক্তে স্নাত মানচিত্র।

মিজানুর রহমান আজহারীর ব্র্যান্ডিংয়েও এ বিষয়টা বেশ কাজ দিয়েছে। সহজ সরল জনগণ ভাব, ” এই মাওলানা এমন কী বলে যে হিন্দুরা নিজ ধর্ম ছেড়ে মুসলমান ধর্মে চলে আসছে!” ফলে তার মাহফিলে শ্রোতা বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার বাড়তে থাকে। তার ভিডিওগুলোতে লাখ লাখ ভিউয়ার্স হতে থাকে। তার ভক্তরা ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে নিজের ছবির পরিবর্তে মিজানুর রহমান আজহারীর ছবি দিতে থাকে। ঘরে ঘরে, বাসে, চায়ের দোকানে তার ওয়াজের ভিডিও চলতে থাকে। এত পরিচিতি, ক্ষমতা, প্রভাবের পেছনে সবচেয়ে বড় ইস্যুটা হলো ধর্মান্তকরণ। ” হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে” এ লাইনটির মধ্যে, এ লাইনটির আড়ালে এতো বেশি রাজনীতি আছে তার ব্যাখা অনেক।

আরেকটি বিষয়ের প্রতিযোগিতা আমাদের এখানে বেশ জোর গলায় চলে। কিছু নাম সর্বস্ব সস্তা বইয়ে কিছু উদ্ভট তথ্য পাওয়া যায়। সে তথ্যের উপর ভিত্তি করে মসজিদে বা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে হুজুররা একধরনের তথ্য দিয়ে থাকেন৷ তথ্যগুলো সাধারণত এরকম: সম্রাট নেপোলিয়ান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন! বিজ্ঞানী নিউটন শেষ জীবনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন! ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন তথ্যে বেশ সাড়া পড়ে যায়। কোন এক মাওলানা মাইকে ওয়াজ করতে করতে বলছিলেন, “সক্রেটিস মুসলমান ছিলেন!” হলিউডের কোন তারকা মুসলমান হয়ে গেল- এমন নিউজের আমাদের এখানে বাম্পার ফলন হয়।

আমার বক্তব্য হলো, সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, নিউটন, আইনস্টাইন – সবাই মুসলমান হলেই কী আসে যায়, খৃষ্টান হলেই কী আসে যায়, ইহুদি হলেই বা কী আসে যায়! তারা তাদের জীবনে কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন কী ছিলেন না- তাতে সভ্যতার কী? তারা তাদের নিজ নিজ উদ্ভাবনের জন্য, গবেষণার জন্য, আবিষ্কারের জন্যই পৃথিবীতে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ধর্মের জন্য নয়। একজন মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী মুসলমান, তাতে কী আসে যায়? অসংখ্য মুষ্টিযোদ্ধা মুসলমান নয়- এই তথ্য কেন আলোচনায় আসে না?

কেউ যদি আবিষ্কার করে বসেন নিউটন অনেক বড় ধর্মপ্রচারক ছিলেন, তা নিয়ে আমি পুলকিত যেমন হবো না, পক্ষে বিপক্ষেও কিছু বলবো না। আমার কাছে স্যার আইজ্যাক নিউটনের একটাই পরিচিতি। তিনি মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। একইভাবে রবীন্দ্রনাথ কতোখানি হিন্দু ছিলেন আর কতোখানি ব্রাহ্ম ছিলেন- সেটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নয়। যে রবীন্দ্রনাথ চোখের বালি, গোরা, শেষের কবিতা লিখতে পারেন- সে রবীন্দ্রনাথের অন্য কোন পরিচয় আমাদের কাছে দরকার নেই।

প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের জীবন দর্শন গ্রহণের অধিকার রাখে। কার বাড়িতে ফজরের নামাজ দিয়ে দিন শুরু হয়, আর কার বাড়িতে রোজ ঘটা করে পূজো হয়- এটা একান্তই সেইসব বাড়ির ব্যাপার। কে তার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ‘খৎনা’ করে আর কে পৈতা পড়বে, এটাও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত৷ কে ‘কবুল’ বলে বিয়ে করবে, আর কে সাত পাক ঘুরবে – তাতে আমার, আমাদের, সমাজের, রাষ্ট্রের কী? কিন্তু যখন জোর জবরদস্তি এসে যায় বা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ফায়দা হাসিল করা হয় বা আমাদের অনুভূতির কাঁধে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা হয়- তখন কিন্তু প্রতিবাদটা হওয়া উচিত। এবং এখন আমাদের এখানে সেটাই হচ্ছে।

তিন.

আমাদের জীবনে ধর্ম আসে উত্তরাধিকার সূত্রে। বাবা-মা মুসলমান হলে সন্তানও মুসলমান হয়। বাবা হিন্দু হলে সন্তানও হিন্দু ধর্ম পালন করে। বাবা-মা বৌদ্ধ হলে সন্তানও বৌদ্ধ- আমরা সাধারণত এমনটাই দেখি। আমার জন্মের জন্য যেমন আমি দায়ী নই, আমার পারিবারিক পরিচিতির জন্য যেমন আমার কোন দায়ভার নেই, তেমনি আমার ধর্মীয় পরিচিতিতেও আমার কোন হাত নেই। আমি ‘আলী আদনান’ মুসলমান, কারণ আমার বাবা-মা মুসলমান। আমি যদি পাঞ্জাবে কোন ‘শিখ’ পরিবারে জন্ম নিতাম, তাহলে আমার নাম ‘আলী আদনান’ হতো না। কোন একটি শিখ নামেই আমি পরিচিতি পেতাম। আফ্রিকান কোন আদিবাসী পরিবারে জন্ম নিলে বাংলা শেখার সুযোগ যেমন হতো না, তেমনি ইসলামি নিয়ম নীতি বা সংস্কৃতির সাথেও পরিচয় ঘটতো না।

পৃথিবীতে আজকের দিনে চার হাজার তিন’শটির ও বেশি ধর্ম আছে। হাতে গোনা দশ বারোটি ধর্ম পৃথিবী জুড়ে বেশি পরিচিতি পেলেও অন্য ধর্মগুলোর অনুসরণকারীর সংখ্যা কম নয়। নাস্তিক বা অধর্মীয় মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে একশত দশ কোটি। প্রত্যেক ধর্মের ধার্মিকদের মধ্যে একটা মিল আছে। বড় মিল। তা হলো, প্রত্যেকেই নিজের ধর্মকে সঠিক মনে করে৷ প্রত্যেক ‘ধার্মিক’ এর কাছে নিজের ধর্মটাই সেরা। একমাত্র নিজের বিশ্বাসটাই সঠিক। প্রত্যেক ধার্মিক মন থেকে বিশ্বাস করে মৃত্যুর পর তার ধর্মের অনুসারীরা স্বর্গে যাবে। অন্য ধর্মের অনুসারীরা নরকে যাবে। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীরা পৃথিবী সৃষ্টি, পরিচালনা নিয়ে নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থের দাবিকেই একমাত্র সঠিক মনে করে। অন্য দাবি তারা শোনার প্রয়োজন কখনো অনুভব করে না।

বাংলাদেশে একটা বিষয় ভয়াবহ আকারে সমাজে ফাটল ধরাচ্ছে। মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক মনোভাব ফুটে উঠছে ভার্চুয়াল জগতের কল্যাণে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন- এমন খবর কোন পোর্টালে প্রকাশ পেলে আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ি। কমেন্ট বক্স সেই দগদগে ঘৃণার সাক্ষী হয়। আর আমাদের দেশের কোন ‘হাজী সাব’ মারা গেলে কমেন্ট বক্সে কান্নার রোল পড়ে যায়। এই পার্থক্যের অন্য কোনো কারণ নেই। কারণ একটাই, ধর্ম। প্রণব মুখার্জী’র জায়গায় যদি পাকিস্তানের ইমরান খান বা তুরস্কের এরদোগান হয়, তাহলেও আমরা কাঁদছি, আফসোস করছি। প্রণব মুখার্জী’র বেলায় হাসাহাসি করছি, বাজে মন্তব্য করছি, তার অন্যতম কারণ তার ধর্ম। শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য একজন মানুষ খারাপ হয়ে যাবে, এটা কেমন হাস্যকর যুক্তি?

‘হাজী সাব’ এর করোনা হয়েছে শুনে আমরা আফসোস করছি। হ্যাঁ, তিনি মানুষ। মানুষের বিপদে কাতর হওয়াই মনুষ্যধর্ম হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা কাতর হওয়ার সময় ‘মানুষ’ পরিচয়টা মাথায় রাখছি না। আমরা হাহাকার করছি কারণ হাজী সাব ‘মুসলমান’। শুধুমাত্র মুসলমান পরিচয়ের জন্যই তার সাত খুন মাফ। অনেক অনেক দুর্নীতিবাজ, চোর-বাটপার, ইয়াবা ব্যবসায়ীও হজ করে এসে হাজী সাব হয়ে যাচ্ছেন । সেটা মাফ। হাজী সাব মধ্যপ্রাচ্যে মুনাফার লোভে আদম পাচারের সাথে জড়িত। সেটা মাফ। হাজী সাব একাধিক বিয়ে তো করেছেনই। সুযোগ পেলে কাজের মেয়ের বুকে লুকিয়ে হাত দেন। সেটাও মাফ। কারণ, হাজী সাহেবের আগা কাটা। আর অন্যধর্মের একজন সারাজীবন মানুষের উপকার করলেন, সমাজের জন্য রাষ্ট্রের জন্য অনেককিছু করলেন। অথচ তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য খারাপ হয়ে গেলেন! ধার্মিকরা দাবি করে ‘ধর্ম’ শান্তির কথা বলে। যে ধর্ম মানুষের মাঝে দেওয়াল তুলে দেয়, সেটা কেমন শান্তি?

আমার বিশ্বাসকে বা পারিবারিক রীতিনীতি নিয়ে যদি কেউ টানাহেঁচড়া করে তা অবশ্যই বড় ধরনের বদমায়েশী। কাউকে ধর্মের কারণে অপদস্থ করা বা ধর্ম নিয়ে অপদস্থ করা বা কেউ যদি ধর্মের জন্য তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তা ক্ষমা অযোগ্য অপরাধ। যে সমাজ বা রাষ্ট্র তার সকল নাগরিককে নিজ নিজ ধর্মীয় চেতনা লালনের অধিকার দিতে পারে না, সে সমাজ ও রাষ্ট্র অসভ্যদের নিয়ন্ত্রণে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অন্য ধর্মকে তাচ্ছিল্য করা, অন্যধর্মের আচার অনুষ্ঠান নিয়ে মজা করা, অন্য ধর্মের কেউ মারা গেলে বা বিপদে পড়লে তা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা- তা সে যেই করুক তা বর্বরতার নামান্তর। ধর্ষণ যেমন বর্বরতা, মানুষের শ্লীলতাহানি করা যেমন বর্বরতা, ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য মানুষের মধ্যে দেওয়াল তুলে দেওয়াটাও বর্বরতা।

চার

কেউ যখন নিজ থেকে স্বেচ্ছায়, স্বাধীনভাবে, নিজে ভালবেসে- ধর্মান্তরিত হয় সেক্ষেত্রে আমার বা আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে যতোগুলো ধর্মান্তকরণের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে স্বেচ্ছায় ধর্মপরিবর্তনের সংখ্যা খুবই কম। জোর করে কাউকে বিয়ে করা, মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করা বা নিরাপত্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে কোন নারী যদি কোন পুরুষকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়- বা একইরকম নিরাপত্তাহীনতায় কোন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যদি মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে সেটাও মহা অপরাধ। ‘বাংলাদেশ’ নামক সভ্য (?) রাষ্ট্রটি কী এ অপরাধের দায় এড়িয়ে যেতে পারে?

যুক্তি দেখাতে গিয়ে বলবেন, যারা হিন্দু থেকে মুসলমান হচ্ছে, তারা স্বেচ্ছায় ভালবেসে হচ্ছে? না। গত পঞ্চাশ বছরে এদেশে যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে তাদের অধিকাংশই গরীব, অসহায় ও সমাজে বঞ্চিত হিন্দু। তারা নানা ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কেউ সম্পত্তি হারানোর ভয়ে থাকে, কেউ স্থানীয় অন্য ইস্যুতে বিপদে পড়ার ভয়ে থাকে, কেউ কাজ হারিয়ে না খেয়ে মরার ভয়ে থাকে। এবং এ ধরনের হিন্দুদেরকেই ধর্মান্তকরণে সুবিধা বেশি। শিক্ষিত প্রভাবশালী সচেতন হিন্দুরা মুসলমান হয়েছে বা এদের সংখ্যা কয়জন এমনটি কেউ দাবি করতে পারবেন? যিনি নিজের নিরাপত্তাহীনতায় বা যিনি একটু স্বাচ্ছন্দে থাকার আকাংখায় ধর্মান্তরিত হন, তাকে আমি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণকারীদের তালিকায় ফেলতে পারি না।

আপনি নিশ্চয় বলবেন, হিন্দু থাকা অবস্থায় নিরাপত্তাহীন ছিল, মুসলমান হওয়ার পর নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। হিন্দু থাকা অবস্থায় চাকরি ছিল না। মুসলমান হওয়ার পর চাকরি দেওয়া হয়েছে। তো? এটাকে কি আপনি দয়া ভাবছেন? একজন মুসলমান রাষ্ট্রে যে নিরাপত্তা পায়, রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল নাগরিক হোক সে হিন্দু বা অন্যকোন ধর্মাবলম্বী, হোক সে আস্তিক বা নাস্তিক- সমান সুবিধা পাবে, এবং সেটা তার অধিকার। নাগরিক অধিকার পাওয়ার জন্য ধর্মান্তরিত হতে হবে কেন? তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আপনি তাকে ধর্মান্তরিত করবেন ( এটা অবশ্যই ব্ল্যাকমেইলিং) এবং দয়া দেখানোর ফাঁদ পাতবেন- তা কাম্য নয়।

ধর্মান্তরিত করার মধ্যে রাজনীতি আছে, গণমানুষের স্বার্থ নেই। ধর্মান্তরিত করার মধ্যে আধিপত্য আছে, অর্থ আছে, ব্র্যান্ডিং আছে। এর মধ্যে মুক্তি নেই। যারা ধর্মান্তরিত হচ্ছেন বা হওয়ার কথা ভাবছেন তারা নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রতিবাদ করা উচিত। আপনি যদি সত্যিকার অর্থে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জেনে, স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়ে থাকেন, তাহলে তা আপনার ব্যাপার। আর যদি ‘পরিস্থিতি’ নামক কোন প্রেক্ষাপট আপনাকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে, তাহলে বলবো প্রতিবাদ করুন, প্রতিরোধ করুন। মুখ খুলুন।

মানুষ তার চিন্তার জগতে স্বাধীন। কে তার জীবন দর্শন কীভাবে সাজাবে এটাও তার নিজ নিজ ব্যাপার। ধর্ম নিয়ে, চিন্তা নিয়ে, দর্শন নিয়ে আমি গঠনমূলক আলোচনা করতে পারি৷ কিন্তু আমার আলোচনায় যদি কোন ব্যক্তি বিশেষ, ধর্ম বিশেষকে নাজেহাল করা হয় বা কেউ নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে, তাহলে তা অবশ্যই দুর্বৃত্তায়ন। রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের লালন করবে নাকি তাদের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিবে তা রাষ্ট্রকেই ঠিক করতে হবে। তবে ইতিহাস শিক্ষা দেয়, দুর্বৃত্ত লালন করে কোন রাষ্ট্রই এগিয়ে যেতে পারেনি। দুর্বৃত্তদের দাপট সহ্য করতে না পেরে অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রও অতীতে ধ্বংস হয়েছে। আমরাও সেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি না তো?

(লেখক: আলী আদনান, লেখক, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট। ই মেইলঃ [email protected])

শেয়ার করুন:
  • 411
  •  
  •  
  •  
  •  
    411
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.