নির্যাতিতাকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন

মুশফিকা লাইজু:

একটা ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরপরই ধর্ষকের পক্ষে সাফাই গাইতে সুশীল সমাজ ১০১ অজুহাত দিতে থাকে। যেমন- বাবার প্রচুর টাকা, ব্রোকেন ফ্যামেলি, মা-বাবা ভালো শিক্ষা দেয়নি সন্তানকে, হাতে স্মার্টফোন, পর্ন দেখে, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব, আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের যৌনশিক্ষা দেয়া হয় না, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে, মাদ্রাসার শিক্ষার প্রভাব, পরিবারে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি ডানহাত-বামহাত এবং আরো নানা অজুহাত। কেউ কি ভেবে দেখেছেন, এই সকল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে একজন কন্যাশিশুও বেড়ে উঠে! কই, কোনো মেয়েকে তো ধর্ষক হয়ে উঠতে দেখি না! একজন ধর্ষকের অপরাধের সকল দায়-দায়িত্ব একান্তই তার নিজের। কোন সামাজিক প্রথা বা অপ্রাপ্তি বা অবস্থান ধর্ষণের জন্য দায়ী নয়। যদি তাই হতো, তবে সমাজে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সমান সংখ্যক ব্যক্তি ধর্ষক বা অপরাধীতে পরিণত হতো। ধর্ষণের দায় এককভাবে ব্যক্তির নিজের। নারীর পোশাক, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, একাকি চলাফেরা, বাক-স্বাধীনতা, প্রতিবাদী ভূমিকা, প্রেম-বিবাহে অস্বীকৃতি ইত্যাদি কোনো কারণই নয়।

ধর্ষণের মূল কারণ হলো পুরুষের সহিংস মনোভাব, পুরুষতন্ত্রের অন্ধ আস্ফালন, রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, রাষ্ট্রে-সমাজে এবং পরিবারে পুরুষতন্ত্রের লালন ও চাষাবাদ। পুরুষতান্ত্রিক আইনি কাঠামো। রাষ্ট্রের পুরুষবান্ধব অবকাঠামো। আইন প্রণয়নে, শাস্তির বিধানে পুরুষবান্ধব ব্যাবস্থাপনা। এবং সবক্ষেত্রে পূঁতি-দুর্গন্ধময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের হীনপ্রবণতা। আইন ও প্রশাসনের ভাবনার মধেই প্রোথিত আছে যে নারী হীন এবং তার সাথে হওয়া সকল সহিংসতাই পলকা- ধর্তব্য নয়। তাই তো আইনের এতো ফাঁক-ফোকর, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর এতো আস্ফালন, এতো গড়িমসি, এতো দায়িত্বহীনতা। মূলতঃ জন্মের আগে থেকেই পরিবার, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিশেষে রাষ্ট্র একজন ছেলেশিশুকে ধর্ষক বানাতে শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। পরিবার ধর্ষককে অভিগম্যতা দেয়। সমাজ ধর্ষককে পারিতোষিক দেয়। আর প্রশাসন বাহবা দেয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্ষককে স্যালুট করে।

তাই তো, আনুশকার ধর্ষণজনিত মৃত্যুর পর আপামর জনসাধারণ প্রথমেই প্রশ্ন তুললো, মেয়েটা একা বাসায় কেন গেল? ছেলেটার সাথে তার প্রেমের সর্ম্পক ছিল! মেয়ের মা-বাবা সঠিক শিক্ষা দেয়নি, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েরা এমনই হয়। মেয়েটা যেহেতু স্বেচ্ছায় গেছে, সেহেতু এটাকে ধর্ষণ বলা যাবে কি? নাহ্, ছেলেটার তেমন দোষ নেই। সে বাঁচাতে চেষ্টা করেছে! নানা ধরনের মিথ্যা বাতুলতা। একবারের জন্যও কেউ প্রশ্ন তুললো না যে একটা মেয়ে খুন হয়েছে! নিষ্ঠুর খুন, সে আর কখনও ফিরে আসতে পারবে না বাবা-মায়ের কাছে। সুন্দর এই পৃথিবীতে। খুনটার প্রশ্নই সর্বাগ্রে উঠা উচিত ছিলো। উপরের কোনো একটি কারণও যদি ঘটনাচক্রে সত্যি হয়, তবুও এর বিনিময়ে একটি মেয়েকে খুন করা জায়েজ হয়ে যেতে পারে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে বলে কি একজন ধর্ষককে প্রশ্রয় দেয়া রাষ্ট্রের বা নাগরিকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

আমরা যদি ঘটনাটির দিকে একটু ফিরে তাকাই তাহলে দেখবো, পুলিশ প্রসাশন প্রাথমিকভাবে বিতর্কিত ভূমিকায় অভিনয় করলো। প্রায় ১২ ঘন্টায়ও বেশি সময় আমরা ধর্ষকের বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে পারিনি। অথচ ততক্ষণে আনুশকরা কুষ্টি-ঠিকুজি জাতি জেনে গেছে, বিভিন্ন মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বরাতে। যদি এমনই হয়, গোপনীয়তা পুলিশের কাজেরই অংশ, তবে উভয়পক্ষের তথ্যই গোপন রাখা অবশ্য কর্তব্য ছিল।

পরদিন আমরা কয়েকটি মিডিয়ার ভূমিকা কী দেখলাম, এই খুনটা প্রায় অপমৃত্যু বলে চালিয়ে দিচ্ছিল তারা। কেউ কেউ আবার প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষকে প্রায় কিশোর বানানোর পাঁয়তারা করেছিল। যাতে আইনের মারপ্যাঁচে ঐ ধর্ষকের শাস্তিটাকে লঘু করা যায়। বাদ সাধলো মেয়েটার বয়স ১৮ নাকি ১৭ এই প্রশ্ন উত্থাপনে। যদি ১৭ হয়, ছেলেটি তার চেয়ে দুবছরের বড় শিক্ষার ধাপ বিবেচনায়। যদি মেয়েটির বয়স ১৭ হয়, তবে সেটা ধর্ষণ এবং খুন। আর যদি ১৮ হয়, তবে ধর্ষণজনিত খুন। তাদের উপস্থাপনাটা এমন ছিল যেনো একলা মেয়ে কেন গেছো বয়ফ্রেন্ডের বাসায়? কেন যৌনতায় লিপ্ত হয়েছো! এটাই তোমার পরিণতি হওয়া উচিত। মাকে মিথ্যে বলে গেছো কেন? এবার মরো।

আচ্ছা, যদি যৌনসংগমের কারণেই মেয়েটার মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে তো পৃথিবীতে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ (নারী) মারা যেতো দাম্পত্য জীবন যাপনের জন্য। আমাদের কাছে এমন কোন উদাহরণ আছে কি? যেন যৌনসংগমের কারণে রক্তপাত হয়ে কোন নারী মারা গেছে! এমনকি বাংলাদেশের বা পৃথিবীর এমন কোন তথ্য আমার জানা নেই যে, যে সকল ‘গে কাপল’ যৌথ জীবনযাপন করে, রক্তক্ষরণে কারণে তাদের কারও মৃত্যু হয়েছে বলে।

বিষয়াটা যে বলপ্রয়োগ একটি নিষ্ঠুর সহিংসতা, প্রতারণার মাধম্যে ডেকে নিয়ে পাশবিক যৌনসম্ভোগ, তা স্বীকার করতে এতো নারাজ কেন? কেন এতো অনীহা? কীসের এতো আড়াল, কীসের এতো স্বজনপ্রীতি? কেন অপশক্তির এতো তোষণ! পোস্টমর্টেমে নিয়োজিত ডাক্তারের নির্লজ্জ ভূমিকা দেখে সভ্যসমাজও লজ্জায় মুখ লুকাবে। পোস্টমর্টেম করে বের হয়েই তিনি গণমাধ্যমকে তথ্য দিলেন যে, বিকৃত যৌনাচারের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে। তার মুখমণ্ডলের ভাষা দেখে আমি হতবিহ্বল যেন মৃত মেয়েটাই ঐ ধর্ষককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, আসো আমাকে বিকৃতপথেই যৌনতার অভিজ্ঞতা দাও। কোন পুরুষ পাষণ্ড কি অনুভব করতে পারবে যে অনিচ্ছায় পায়ুপথে লিঙ্গ প্রবেশের যাতনা কত ভয়ংকর!

যৌনমিলন বা ধর্ষণ যা-ই বলি না কেন, তার সময় ঠিক কতটা অতিবাহিত হয়েছে ১০ মিনিট, ৩০ মিনিট, ১ ঘন্টা! তারপরে কী হয়েছে? সাড়ে তিন কেজি রক্ত ছিঁড়ে যাওয়া যোনী বা পায়ুপথ থেকে ঝরে যেতে কতটা সময় লাগে? শুনেছি হাত-পায়ের শিরা কেটে যারা আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়, তারাও ঘন্টার উপরে সময় নিয়ে থাকে। তাহলে আনুশকার মরে যেতে কত ঘন্টা সময় লেগেছিল? যন্ত্রণাকাতর মুমূর্ষু মেয়েটাকে কেন গাড়ি থাকা সত্ত্বেও ৫ মিনেটের পথ অতিক্রম করে হাসপাতালে নেয়া হলো না? এমন তো নয়, তার ধর্ষণ দৃশ্যের কোন ভিডিও ধারণ করা হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ভয় দেখানো হয়েছে, যে বাড়িতে বা হাসপাতালে যেন না যাওয়া হয়। কারণ ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত অন্য তিনজনের ফোনের কোন হদিস পুলিশবাহিনী করতে পারেনি।

একটি খুন, একটি ধর্ষণ, একটি নিষ্ঠুর সহিংসতা নিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রে নিরাপত্তায় নিয়োজিত দলের ও কোন কোন প্রচার মাধ্যমের এতো কারসাজি কেন? কার স্বার্থে? পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির দীর্ঘজীবিতার জন্য! রাষ্ট্র কি কোন বর্বরতন্ত্রের কাছে হেরে যাওয়া পালক ঝরা শালিক পাখি? যদি তাই না হবে, তবে কোন্ দুঃসাহসে প্রকাশ্যে ধর্মীয় নেতারা এবং প্রচারকরা নারীর প্রতি সহিংস হওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত মদদ যোগায়? নারীকে অথর্ব আসবাবের সাথে তুলনা করে। নারীকে তুচ্ছ তেঁতুল বলে আখ্যায়িত করে? কোন্ দুঃসাহসে বিজ্ঞ আদালত নারীর মাসিকজনিত কারণকে নিকাহ রেজিষ্ট্রার পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেন। যেখানে স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান একজন নারী, স্পিকার একজন নারী, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে যেখানে নারীরাই অবস্থান করছেন! তবে কি আদালত পক্ষান্তরে প্রধানমন্ত্রীকে প্রচ্ছন্নভাবে অযোগ্যতার কাতারে দাঁড় করিয়ে দিলো?

শেয়ার করুন:
  • 267
  •  
  •  
  •  
  •  
    267
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.