আপনার পিতৃত্বকে উদযাপন করুন

প্রমা ইসরাত:

প্রকৃতিতে এক জাতের পাখি আছে, যারা পুরুষ সঙ্গীর সাথে মিলিত হয়ে কিছুদিন বসবাস করে, ডিম পেড়ে তারপর চলে যায় উড়ে। সেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে লালন পালন করে পুরুষটি। সেই প্রজাতির পাখির নাম জলময়ূর।
আবার পাখি যুগলের বেলাতেও, মা পাখি বাবা পাখি পালা করে ডিমে তা দেয়, খাবার জোগাড় করে, বাচ্চাকে দেখে।

প্রকৃতিতে, সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে আবার আরেকটি ইন্টারেস্টিং প্রাণী হাতি। হাতির পালের শিশুদের আবার সবাই মিলে দেখভাল করে। মানে মায়ের পাশাপাশি বাবা, খালা, ফুফু, চাচা পালের শিশুটিকে দেখভাল করে।

মানুষের সন্তানের বেলাতে, বিশেষ করে সেটা যখন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়, তখন সন্তান লালন পালনের পুরো ভারটি থাকে সেই শিশুটির জন্মদাত্রী মা, কোন ধাত্রী বা দাই, শিশুটির দাদি, নানি বা খালা, ফুফু তাদের হাতে। বহু আগে আঁতুড় ঘর সিস্টেম যখন ছিলো , পুরুষরা কোন মতেই আঁতুড় ঘরে ঢুকতে পারতো না। স্ত্রীর পাশে তাকে সাহায্য বা তাকে ভরসা দেয়ার জন্য স্বামীকে ঘেঁষতে দেয়া হতো না। পুরুষদের অনেকেই এগুলোকে মেয়েছেলেদের বিষয় বলে অতো মাথাও ঘামাতো না। বাচ্চা বড় হয়ে গেলে, ওই একটু গাল টিপে বা মাঝে মাঝে বাইরে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে তাদের পিতৃত্বকে সীমাবদ্ধ রাখতেন।
পুরুষদের আবেগ দেখানোর ব্যপারটি ছিলো খুবই “মেয়েলী” ব্যপার। মানে পুরুষ রান্না করে, পুরুষ কাপড় কাঁচে, পুরুষ বাচ্চা লালন পালন করে, তাহলে সেই পুরুষ “মাইগ্যা” বা স্ত্রৈণ। এই যে কনসেপ্ট, এটা খুব বাজে একটি কনসেপ্ট।

আমি একটি যুগলের সাথে একসময় পরিচিত ছিলাম। যুগলের মধ্যে পুরুষ সঙ্গীটির অনাগত সন্তানের জন্য যে আনন্দ দিয়ে আয়োজন, আমি তা খেয়াল করেছি। সেই ব্যক্তি তার বাচ্চার জন্য নিজ হাতে কাঁথা সেলাই করেছিলো, এটাও দেখেছিলাম। আর এই দৃশ্য দেখে দুই একজনকে তাকে নিয়ে আড়ালে ঠাট্টা করতেও দেখেছি। তারা সেই ব্যক্তির ইমোশন নিয়ে হাসাহাসি করতো। কারণ তারা তাদের মাথায় পিতৃতন্ত্রের ভাইরাস ধারণ করতো,  এবং মননে মগজে সেন্সেটিভ পুরুষের জন্য মাইগ্যা বা স্ত্রৈণ শব্দ লালন করতো। এই ধরনের চিন্তার মানুষরা মনে করে যেসকল পুরুষরা তাদের আবেগ প্রকাশ করে তারা দুর্বল। প্রেম ভালবাসা স্নেহ মায়া মমতা এগুলো প্রকাশ করলে সেই পুরুষ আর “পুরুষ” থাকে না।
মানে “মার্দ কো দার্দ নেহি হোতা” টাইপ চিন্তা।

সন্তান, পিতা মাতা দুইজনেরই, তো তার লালন পালনের দায়িত্বও দুইজনেরই থাকা উচিৎ। সন্তান জন্মদানের পরপরই একজন মা এর বিশ্রাম প্রয়োজন পড়ে। হ্যাঁ সেগুলো এতোদিন সেই নারীর মা, বোন বা শাশুড়ি সাহায্য করেছেন, কিন্তু স্বামীর বা পিতার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। শিশুটিকে বুকে আগলে, তার গায়ের উত্তাপ নিজের বুকের উত্তাপের সাথে মিশিয়ে, তার বুকের হৃদস্পন্দন অনুভব করে, পিতৃত্বের অনুভূতিকে উদযাপন করার আনন্দ ব্যাখ্যাতীত।

বাচ্চার জন্মের পর, স্তন্য পান করানো ছাড়া আর এমন কোন কাজ নেই যা পিতা করতে পারে না। বাচ্চার ন্যাপি, ডায়াপার চেঞ্জ করানো, তাকে খাওয়ানো, তাকে বুকে আগলে রাখা, ঘুম পাড়ানো, তার জন্য পরিষ্কার কাপড়ের ব্যবস্থা করা, এই সবই পিতা করতে পারেন। মানে পিতৃত্ব শুধু এটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, যে মা বাচ্চাকে খাইয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে জামা জুতো পরিয়ে রেডি করে বাবার কোলে দিবে, আর বাবা সেই রেডি বাচ্চাকে নিয়ে “প্রাউড ফাদার” সেলফি তুলে সবাইকে জানালেন, “আমার সন্তান”।
মাকে বিশ্রাম নিতে সাহায্য করাও সেই সন্তানের পিতার কর্তব্য।

একজন ন্যাপি চেঞ্জ করবে, একজন দুধের বোতল রেডি করবে, একজন খাবার রেডি করবে আরেকজন গোসল করাবে, একজন খাওয়ালে আরেকজন বাচ্চার কাপড় গুছিয়ে রাখবে। পিতামাতা দুজন মিলে সন্তানের দেখভাল করলে তবেই না একজন শিশু আনন্দে বড় হতে পারে।
আরেকটি বিষয় নানান সময় উপেক্ষা করা হয় যে, অনেক নারীর সন্তান জন্মের পর হরমোনাল নানান রোলার কোস্টারের ভিতর দিয়ে যেতে হয়, অনেকেই ভোগেন “বেবি ব্লু” তে। তখন সেই মা এর দরকার অনেক সাহায্য ও সহযোগিতা। এই দায়িত্ব আবার শুধু সেই দম্পতির নয়, পরিবার-আত্মীয়-বন্ধু সকলেরই।

একজন শিশু কতটুকু আকাঙ্ক্ষিত এটা সে বুঝতে পারে গর্ভাবস্থায় থেকেই। সাইকোলজি, মেডিকেল সায়েন্স তাই বলে। পিতারও সে ক্ষেত্রে তাই বড় ভূমিকা থাকে।
শিশু সন্তানকে কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পৃথিবীতে আনা আমি সেই শিশুর প্রতি অন্যায় মনে করি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন বনিবনা নেই, বাচ্চা নিয়ে নাও। তারপর সেই বাচ্চাকে উছিলা করে, অধিকার খাটানো, বাচ্চাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, এগুলো আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় খুব বেদনাদায়ক। শিশুটির কল্যাণের কথা না ভেবে অনেক মানুষ যখন সেই শিশুকে দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করে, আমার খুব কষ্ট হয়। সঙ্গীর সাথে বনিবনা না হলে বা স্বামীকে ধরে রাখার জন্য, বা স্ত্রীকে বাগে আনতে বাচ্চা নিতে চাওয়া আসলে সেই সংসারে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে না। হয়তো অনেকে মনে করেন, এতে কাজ হয়, তাই সাজেশন দেন। কিন্তু এরকম চান্স নিয়ে একটা শিশুর জীবন এর উপর বাজি ধরা কি কোন সুবিবেচনা হতে পারে?

থিওডর হেডসবার্গ বলেছিলেন, সেই পিতাই আদর্শ পিতা, যিনি তার সন্তানের মাকে ভালোবাসেন। তাই শিশু সন্তানের যিনি পিতা, তিনি যেমন শিশুর খেয়াল রাখবেন, তেমনি খেয়াল রাখবেন তার সন্তানের মায়ের প্রতি।
তাই শিশুর পিতা সকল, পিতৃত্বকে উদযাপন করুন।
শিশু জানুক মানুষ মাত্রই কাঁদে, মানুষ মাত্রই হাসে, শিশুরা জানুক মানুষ বলতে মানুষ শুধু।

 

লেখক: প্রমা ইসরাত
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 812
  •  
  •  
  •  
  •  
    812
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.