সেক্স এডুকেশন আর আমাদের মানসিকতা

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

আমার মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছে, “সমকামিতা কি পাপ?”

মা হিসেবে আমার উত্তরটা ছিলো এরকম।

“পৃথিবীর শুরু থেকেই বংশবৃদ্ধির জন্য নারী -পুরুষ উভয়ই একটা কয়েনের এপিঠ ওপিঠ। একজন ছাড়া অন্যজন অসহায় প্রকৃতিগতভাবে। আর যারা সমকামী তারাও প্রকৃতির সৃষ্টি, এদেরকে অস্বীকার করার উপায় নাই। কিন্তু সমকামিতা যদি মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যায়, তবে অবশ্যই পরিবেশের ভারসম্য নষ্ট হবে। সেক্ষেত্রে সৃষ্টির সেরা জীব হুমকির মুখে পড়বে। তবে প্রকৃতি নিজেকে রক্ষার জন্য কোন না কোন উপায় ঠিকই বের করে। কিন্তু যারা সমকামী, তাদের কি বেঁচে থাকার অধিকার নেই? অবশ্যই আছে। এজন্য সমকামিতা আসলে পাপ নয়, প্রকৃতির একটি সৃষ্টি, একে অস্বীকার করার উপায় নেই”।

মেয়েটা আমাকে এই প্রশ্ন করার সাহস কোথা থেকে পেয়েছে বলেন তো? আমরা ওকে সেক্স সম্পর্কে জানিয়েছি। স্বচ্ছ ধারণা দিয়েছি। বলেছি, তুমি তোমার বন্ধুদের থেকে বা লুকিয়ে ভিডিও দেখে যেটা শিখবে সেটা সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু মা-বাবা বা স্কুলের সেক্স এডুকেশন থেকে তুমি যেটা শিখবে সেটা অবশ্যই সঠিকই হবে। তুমি সেক্স করতেই পারো, তবে সেটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে করা উচিত হবে না। এতে তোমার নিজেরই শারীরিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সেক্স শারীরিক চাহিদার সাথে সাথে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশও। বৈজ্ঞানিকভাবে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতে সেক্স দোষের কিছু না। দোষ হচ্ছে প্রতারণার উদ্দেশ্য সেক্স করা। সেই প্রতারণা যে কেউই (ছেলে-মেয়ে) করতে পারে। সেক্স এডুকেশন এর মাধ্যমে কিশোর বয়সের যে অজানা ভয় কিংবা অনেক অজানা প্রশ্ন-উত্তর থাকে সেগুলো সম্পর্কে তারা জানতে পারবে। “ভালোবেসে” একজন ছেলে একজন মেয়ের সাথে সেক্স করতেই পারে, তবে সেখানে অবশ্যই দুজনেরই পূর্ণ সমর্থন থাকতে হবে। দুজনের যেকেউ বিন্দুমাত্র অমত প্রকাশ করলে সেটা সেক্স বলে গণ্য হবে না।

কিছু মানুষের ধারণা হয়েছে, সেক্স এডুকেশন মানে ক্লাসরুমে বসে বাচ্চাদের পর্ণ দেখানো। যেন সেক্স এডুকেশন দিলেই ছেলেমেয়েরা দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেক্স করতে শুরু করে দিবে! তাদের উদ্দেশ্য বলছি, একটা নারী বা পুরুষ তার জীবদ্দশায় অনেক নারী বা পুরুষের সাথে পরিচিত হয়, তাদের সবার সাথেই কি সবাই সেক্স করে? করে না। একটা সুস্থ-সুন্দর সেক্স করার জন্য অবশ্যই শারীরিক চাহিদার সাথে সাথে একটা মেন্টাল এটাচমেন্ট এর প্রয়োজন হয়। সেক্স এডুকেশন এর অভাবে কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণ-তরুণীরা শুধুমাত্র শারীরিক চাহিদা থেকেই মিলিত হয়ে থাকে। এবং পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন অপরাধ করে বা বিভিন্ন হ্যারাসমেন্ট এর শিকার হয় বা বিকৃত মানসিতার সৃষ্টি হয়। অনেকের এমন একটা ভাব, যেন সেক্স নিয়ে কথা বললেই সেক্স করা হয়ে গেল!

বিভিন্ন সিনেমাতে একসময় দেখানো হতো “দুইজন এক কম্বলের নিচে ঢুকেছে, পরের দিন বউ প্রেগন্যান্ট কিংবা দুইটা গোলাপ বাড়ি খাচ্ছে, ব্যস মেয়ে প্রেগন্যান্ট! কেন এতো লুকোছাপা? এভাবেই তো বাচ্চাদের মনে আগ্রহের জন্ম দেয়। পর্ন সাইটে অবাধ ঘোরাঘুরির সুযোগ থাকার কারণে কিশোর-কিশোরিরা ভুলভাল স্টেপ শিখছে, যার ফলে যৌনবিকৃতির শিকার হচ্ছে। যখন বাস্তবে এর প্রয়োগ করতে যায় তখন সবসময় এর ফলাফল ভালো হয় না। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে কিংবা বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেকক্ষেত্রে শারীরিক ও মানুসিক তৃপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাচ্চাদের সেক্সের উপকারিতা বা অপকারিতা সম্পর্কে জানানো হলে সেক্স সম্পর্কে যে আকাঙ্খা তাদের মনে উঁকি দেয়, সেটা তারা নিজেরাই দমন করতে পারবে। বেশিরভাগ মানুষ ভাবছে স্কুলে সেক্স সম্পর্কে পড়ালেই বাচ্চাদের সেক্স এর প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাবে, বরং ব্যাপারটা উল্টো, নিষিদ্ধ ব্যাপারের প্রতি বরাবরই মানুষের আগ্রহ বেশি, বাচ্চাদের তো আরও বেশি। আর এজন্যই সেক্স এডুকেশন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

এখন আসি বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক এর ব্যাপারে, ছোটবেলা থেকেই একটু একটু করে জমানো আকাঙ্খা এর প্রতিফলন হচ্ছে বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর প্রথম রাত। অধিকাংশ পুরুষই নিজের বউকে এই রাতে ধর্ষণ করে, কারণ তারা জানেই না সেক্স এ নারী-পুরুষ উভয়েরই পূর্ণ সমর্থন দরকার হয়। বেশিরভাগ এরেঞ্জ ম্যারেজেই বিয়ের আগে ঠিকমতো কথা পর্যন্ত হয় না ছেলেমেয়ের মধ্যে, তার উপর দুইজনের বয়সের পার্থক্য থাকে বিশাল। অথচ বাসর রাতে তারা সেক্স করে। পুরুষ তার পুরুষত্ব দেখায় মেয়েটার হাইমেন ছেঁড়ার মাধ্যমে। মেন্টালিটি না মেলা বা সেক্স সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণে অথবা অতিরঞ্জিত পর্ন দেখে মনে মনে বাসর রাতে যে স্বপ্নের রাত দুই নারী-পুরুষ কল্পনা করে, সেখানে বেশিরভাগই মনঃক্ষুন্ন হয় বা ফ্রাস্ট্রেটেড হয়। কিন্তু ওই যে সমাজের বাধা বা ধর্মীয় বাধা, বেশিরভাগই কপালের দোষ দিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। ফলে পরকীয়ার মতো নোংরা ব্যাপারগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দিনের বেলার সুন্দর চেহারা বা কথার মানুষগুলো গভীর রাতে হায়েনা হয়ে ধরা দেয়। ছাড় পায় না ৪ মাসের শিশুও। পার্টনারের সাথে যদি সেক্স নিয়ে হ্যাপি না থাকে, সেক্ষেত্রে পার্টনারের সাথে খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে সেটার ট্রিটমেন্ট করানো উচিত।

সেক্স কি আমাদের জীবনে প্রয়োজনীয় নয়?

একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেক্স খুব দরকারি। এরপর কিন্তু আমরা ভালোবাসার কাঙ্গাল। ভালোবাসা ভক্তি শ্রদ্ধা এবং সেক্স এগুলো ছাড়া একটা সুস্থ সুন্দর সংসার করা যায় না। জীবনের প্রতিটি ধাপে আমাদের ছাড় দিতে হয়, আমরা দেই। কিন্তু সেটা যেন অতৃপ্তির পর্যায়ে না পৌঁছে যায়।

শেয়ার করুন:
  • 425
  •  
  •  
  •  
  •  
    425
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.