নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে বাধা কোথায়?

আমিনুল ইসলাম:

১.
“মুসলিম বিবাহ একটি দেওয়ানী চুক্তি” মর্মেই মুসলিম আইন পড়েছি ও বুঝেছি! বৈধ মুসলিম বিবাহের আবশ্যকীয় তিনটি শর্ত হলো:

১। ভয়ভীতিহীনভাবে বর ও কনের সম্মতি দেয়ার মতো মানসিক সুস্থতা;
২। একপক্ষ হতে বিবাহের প্রস্তাব প্রদান; এবং
৩। অন্যপক্ষ হতে প্রস্তাব গ্রহণ।

এই শর্তগুলো পালিত হলেই হয়ে গেলো মুসলিম বিবাহ। হ্যাঁ! বৈধ বিবাহের জন্য এই প্রস্তাব প্রদান ও গ্রহণকালে দুজন পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী থাকা আবশ্যক! সাক্ষী না থাকলেও বা প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাক্ষী না থাকলেও বিবাহ কিন্তু অবৈধ নয়, হয় অনিয়মিত!

উল্লেখ্য যে, যে মেয়ের বিবাহ হবে তিনি বিবাহের দিনে বা সময়ে ঋতুবতী হলে বিবাহ হবে না এমন কিছু কিন্তু ইসলামে নেই! অথবা যে মেয়ে বিবাহের সাক্ষী হবেন তাঁকেও ঋতুবতীহীন অবস্থায় থাকতে হবে এমন বিধানও কিন্তু ইসলামে নেই। বিবাহ মসজিদে বা কোন ধর্মিয় পবিত্র স্থানে পড়াতে হবে এমন কোন শর্তও ইসলামে নেই। তাছাড়া আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় কোনদিন শুনিনি বা দেখিনি যে, মসজিদে বিবাহ পড়ানো হয়! ইসলাম বিবাহ পড়ানোকে এমন সহজ করেছেন যে, এতে কোন মন্ত্র বা ধর্মীয় দোয়া পড়াও বাধ্যতামূলেক করেনি। নেই কোন মাওলানা বা ইমাম উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা। মুসলিম বিবাহ যে কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ পড়াতে পারেন! এখানে কোন মাওলানা বা ধর্মীয় পণ্ডিতের আবশ্যকীয়তা ইসলাম আরোপ করেনি। মানুষ মাওলানাকে ডেকে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এই বিবেচনায় যে, তাঁরা সাধারণত শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তি হোন এবং বিবাহ শেষে মহান আল্লাহর কাছে সকলকে নিয়ে দোয়া পরিচালনা করে নব দম্পতির সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করেন। মনে রাখা দরকার যে, যে কেউ কিন্তু নব দম্পতির জন্য দোয়া পরিচালনা করতে পারেন, এবং এক্ষেত্রে পিতা-মাতার চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে?

২.
অন্যদিকে নিকাহ রেজিস্ট্রারগণ মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯৭৪ এর অধীনে আইন মন্ত্রণালয় হতে নিয়োগপ্রাপ্ত (লাইসেন্সপ্রাপ্ত) হোন স্থানীয় অধিক্ষেত্রের মধ্যে বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন করার জন্য! এটি কিন্তু কোন সরকারি চাকরি নয়। এই বিবাহ রেজিস্ট্রেশন হলো রাষ্ট্রীয় আইনি বিধান এবং তা বিবাহের জন্য কোনভাবেই ইসলামিক শর্ত নয়! একসময় স্থানীয় বিচারকগণ (কাজী) ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও ধর্মীয় পণ্ডিত! তাঁরাই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতেন! তাই তাঁদের পদবী কাজী (বিচারক) বর্তমান নিকাহ রেজিস্ট্রারগণ বেআইনিভাবে ব্যবহার করেন এবং জনগণ তা না বুঝেই নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ‘কাজী’ সম্বোধন করেন। রাষ্ট্রীয় আইন মতে তাদের পদবী নিকাহ ও তালাক নিবন্ধক বা সহজভাবে নিকাহ রেজিস্ট্রার!

আমিনুল ইসলাম

রাষ্ট্রীয় আইন মতে মুসলিম বিবাহ ও তালাক সংক্রান্তে রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রার মেইনটেইন করার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ হলো মূলত বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন করা! মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর ২১ বিধি মতে, এজন্য একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার প্রতি ১০০০ টাকা দেনমোহর এর বিপরীতে ১০ টাকা ফি আদায় করবেন এবং একটি বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের জন্য সর্বনিম্ন ১০০ টাকা ও দেনমোহরের পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন সর্বোচ্চ ৪০০০ টাকা ফি গ্রহণ করবেন। আর তালাক রেজিস্ট্রেশনের জন্য ফি প্রাপ্য হবেন ২০০ টাকা! আইনে একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। অর্থাৎ একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ হলো আইনত: করনিক ধাঁচের। তাছাড়া বর্ণিত বিধিমালার ৮ নং বিধিতে একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের যোগ্যতার পূর্বশর্ত হিসেবে বলা হয়েছে যে তিনি কমপক্ষে আলীম পাশ হবেন; আবেদনকালে তাঁর বয়স হবে ২১ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ বছর; এবং তার বাড়ি যে এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে চান সেই এলাকায় হতে হবে। আইনে কিন্তু একজন নিকাহ রেজিস্টারের লিঙ্গ কী হবে তা বলা হয়নি!

৩.
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বিবাহের একপক্ষ নারী হতে এবং তিনি বিবাহকালে ঋতুবতী থাকলেও ইসলামে ও রাষ্ট্রীয় আইনে বাধা নেই! বিবাহের সাক্ষী নারী হতে এবং তিনি ঋতুবতী অবস্থায় সাক্ষী হলেও সমস্যা নেই। রাষ্ট্রীয় আইনে নিকাহ রেজিস্ট্রার প্রার্থীর যোগ্যতার ক্ষেত্রে লিঙ্গগত নেই কোন পূর্ব শর্ত! সামাজিক আচারে মসজিদ বা ধর্মীয় স্থানে বিবাহ অনুষ্ঠানের লক্ষণমাত্র নেই! নারীরা বিচারক অর্থাৎ কাজী হতে এবং তাদের ঋতুবতী অবস্থায় বিচার করতে বাধা নেই! ইসলামে ও রাষ্ট্রীয় আইনে বিবাহ পড়াতে নেই কোন নির্দিষ্ট বা নির্ধারিত ব্যক্তির উপস্থিত থাকার আবশ্যকীয়তা! তাহলে নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশনের মতো করনিক ধাঁচের কাজের জন্য নারীরা অযোগ্য হোন কোন যুক্তিতে? যে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন নারী, সেই রাষ্ট্রে ইসলামের সাথে সামান্যতম সংঘর্ষ নেই এমন রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কাজে একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার নারী হতে পারবেন না কেন? তাও আবার এই একবিংশ শতাব্দিতে!

মনে রাখা দরকার, এদেশেই একসময় নারীরা বিচারক হতে পারতেন না! বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানাদের হাত ধরেই নারীরা এদেশে বিচারিক কাজে যোগ দিয়েছেন! আজ বিচার ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই পরিচালিত হচ্ছে তাঁদের হাতে! শুধু মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন হলেই অনেক অর্জন সম্ভব; ধর্ম তাতে কোন মতেই বাধা সৃষ্টিকারী নয়।

লেখক: আমিনুল ইসলাম
(পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স, যুক্তরাজ্য)।

শেয়ার করুন:
  • 300
  •  
  •  
  •  
  •  
    300
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.