স্খলন প্রতিহত না হলে অবক্ষয় বন্ধ হবে না

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

টাকার ভাণ্ড, ক্ষমতার দাপট, প্রতিপত্তির দম্ভ, চাপার জোর, বড় গলা নিয়ে একেকটা করাপ্টেড বাবা আর দুর্ধর্ষ মা-গুলো একটা একটা করে ছোট ছোট অন্যায় ঢাকতে ঢাকতে দিহান ও তার ভাই সুপ্তের মতো বড় বড় অপকর্মের নায়ক নিজেদের পুত্রদের সজ্ঞানে বানায়। এক পুত্রের বউ মেরে ফেলার অভিযোগ উঠলে তা টাকা দিয়ে রফা করে তো আরেক পুত্রের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ বিকৃতির মাধ্যমে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর অভিযোগের প্রেক্ষিতেও এরা উঠেপড়ে অবশ্যই লাগবে কীভাবে এই পুত্রকে রক্ষা করা যায়! কখনও এদের মাথায় সন্তানকে মানুষ বানানোর চিন্তা আসেনি, আসে না কোন অজ্ঞাত কারণবশত। এসব পুত্রেরা নির্বিঘ্নে বাড়ি, গাড়ি, বাইক, মাদক,নারী নিয়ে যথেচ্ছ জীবন যাপন করতে পারে এদেরই বাবা,মায়ের ছত্রছায়ায়। বিপদে পড়লে ত্রাণকর্তা হিসাবে তো নষ্ট পিতামাতা এগিয়ে আসবেই, তা তাদের ভ্রষ্ট সন্তানেরা ভালো করেই জানে।

যে বাবা,মায়ের কাছে লক্ষ লক্ষ টাকা গচ্চা দিয়ে ড্রপ আউট স্টুডেন্ট হওয়া বা একটা বা দুইটা সার্টিফিকেট টাকার জোরে কেনা, বাসায় মেয়ে নিয়ে আসা, উঠতি বয়স থেকেই বাইক/গাড়ির বিভিন্ন অত্যাধুনিক মডেল নিয়ে পড়ে থাকা, যেকোনো মাদকের প্রতি আসক্তি সোজা বাংলায় সিগারেট, ইয়াবা, মদ, গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে থাকা, বিয়েশাদী করে ইচ্ছামতো বউ ছেড়ে দেয়া বা মেরে ফেলা অত্যন্ত মামুলি ও উৎসাহ দেয়ার মতো বিষয় মনে হয়, তাদের পুত্রদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো কিইবা পাবে সমাজ!

সন্তানকে জন্ম দিয়ে তার সঠিক প্রতিপালন করতে পারবেন না মনে হলে নিজেরা সজ্ঞানে বন্ধ্যাত্ব বরণ করুন। আপনাদের নিকৃষ্ট প্রতিপালনের দ্বারা গড়ে উঠা আবর্জনার স্তুপ থেকে এই সমাজটাকে রক্ষা করুন কারন অসৎ পরিবেশে,মূল্যবোধহীনতায় বেড়ে উঠা সন্তান মানুষ সাধারণত হয় না। এই দায়ভার এসব সন্তানের বাবা, মা কোনভাবেই এড়াতে পারে না। যতটা দোষ এসব পুত্রের, ততটাই দোষ তাদের এভাবে গড়ে উঠতে সহায়তাকারী বাবা,মায়ের। সন্তান বখে গেছে আর আপনারা তার আঁচ পাননি, সেটা বললেও তা অবিশ্বাস্য। আমি হলফ করে বলতে পারি এই ছেলের বাবা, মাকে ছেলের কৃতকর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বলবে “আমার ছেলে নির্দোষ”। দোষত্রুটি কাকে বলে সে বিষয়ে পিতামাতাও বোধ করি অবগত না। নিজেরা ঘুষখোর, মিথ্যাবাদী, প্রতারক, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, শোষণের সাথে জড়িত নিপীড়ক, চরিত্রহীন হবেন আর সন্তান তা দেখে দেখে সেই রূপ পরিগ্রহ না করে সয়ংক্রিয়ভাবে
আদর্শ মানুষ হবে সেটা তো এককথায় অকল্পনীয়। অবশ্য সেটা এইসব বাবা, মায়ের প্রত্যাশাও না।

একটা সন্তান যেকোন বিষয়ে মনের অজান্তে ভুল করলেও তার সবার আগে বাবা, মায়ের মুখোমুখি হতে ইতস্ততবোধ করার কথা যে বাবা, মা আঘাতপ্রাপ্ত হবে আমার দ্বারা এই ভুলটুকু হয়েছে যখন জানবে, অথচ সন্তান যখন ভুল সংশোধনে নয়, তার পাপের সাথী হতেও বাবা, মাকে পাশে পায়, তখন তার অমানুষ হওয়া বোধ হয় স্বয়ং ঈশ্বরও ঠেকাতে পারে না। সন্তান হতে পারে আপনার, কিন্তু সে যখন বয়সের সাথে সাথে সমাজের একজন হয়ে উঠে, তখন তার মন্দ আচরণের প্রভাব আর আপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিজের সন্তানের পাশবিক পিশাচ হওয়া বন্ধ করতে না পারার অক্ষমতা আপনি কোন যুক্তিতেই পাশ কাটাতে পারেন না।

সেদিন একটা হতদরিদ্র মায়ের শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন সন্তানের মানুষ হিসাবে বেড়ে উঠার গল্প শুনছিলাম। খেতে পায় না, পোশাক নেই পরার মতো তেমন, বইখাতাও এর-ওর কাছ থেকে যোগাড় করা, ফিস দেয়ারই ক্ষমতা নেই, সম্বল ছিলো শুধু মেধা! সেই পুত্র তার মাকে পাশে নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও নিজের স্থান করে নিয়েছিলো। সেই মা তার সন্তানকে কী দিতে পেরেছিলো যেটা চাওয়ার আগেই সব মুখের সামনে এনে হাজির করে দেয়া বাবা, মায়েরা তার সন্তানক দিতে পারছেন না! আমার মনে হয় আদর্শ, সততা, মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই এসব পরিবারে কাড়ি কাড়ি টাকার পাহাড়ে চাপা পড়ে থাকে।

এদের বাসার দারোয়ান থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই জানবে এই পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ানো ছেলেগুলো ও তাদের বাবা-মায়ের জীবনযাপনের ধরনের খবর, কিন্তু কেউ টুঁ শব্দও করবে না, এদের সঙ্গ ত্যাগ করা তো অনেক দূরের ব্যাপার! এখন বলবে ওরা এমন আমরা জানতামও না, অথচ পঁচা এমন একটা জিনিস সেটা দুর্গন্ধ না ছড়িয়ে থাকবে না।আপনার আশেপাশেই দিহান সুপ্তের মতো দুই ভাই ও তাদের বাবা,মায়েরা করাপ্টেড ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনের পর দিন নোংরামো করে যাচ্ছে। সংবাদের শিরোনাম হওয়ার আগে সবাই তাদের দেখেও, বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকেন। দিহান/সুপ্তদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের সুস্থ ভাবাটাও সম্পূর্ণ মানসিক অসুস্থতা।

আজ যারা একটা দিহানের ফাঁসি চাচ্ছেন, তারা নিজেদের আশেপাশের দিহানগুলোর প্রতি সোচ্চার হোন। সর্বোচ্চ অপরাধ করার পর জানি তো ওরা খারাপ বলে ক্যামেরার সামনে সাক্ষাতকার দেয়া কোন অর্থবহন আসলেই করে না। নিজের সন্তানকে মানবিক মানুষ বানান, অন্যের অমানুষ সন্তানের প্রতি আঙুল তুলুন। সামাজিকভাবে বয়কট করুন। মানুষ বুঝতে শিখুক সন্তানকে মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে না পারার মতো লজ্জা, ব্যর্থতা আর নেই। স্বাধীনভাবে সন্তানকে বড় হতে দেয়াটা যেন লাগামহীন, স্বেচ্ছাচারীতার পর্যায়ে না যায়।
স্খলনটা প্রতিহত না হলে অবক্ষয় বন্ধ কোনদিনও হবে না।

শেয়ার করুন:
  • 286
  •  
  •  
  •  
  •  
    286
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.