ডেনমার্কের প্রথম নারী ইমাম শেরিন খানকান

সুপ্রীতি ধর:

২০১৯ এর সুইডেনের গোথেনবার্গ বইমেলায় পরিচয় হয়েছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রথম নারী নেতৃত্বাধীন ‘মারিয়াম’ মসজিদের দুজন ইমামের সঙ্গে। তার মধ্যে একজন ছিলেন শেরিন খানকান। তিনিই পাইওনিয়ার ইমাম। তাঁর উদ্যোগ আর নেতৃত্বেই ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অফিসিয়ালি যাত্রা শুরু হয় এই মসজিদের। সেই একই বছরে বিবিসির চোখে ১০০ জন নারীর একজন নির্বাচিত হন তিনি।

সেদিনের ওই আলোচনা অনুষ্ঠানের অনেক নোট আমি নিয়েছিলাম, আজ বাংলাদেশের আদালতের একটি রায়, ‘নিকাহ্ রেজিস্ট্রার বা কাজি হতে পারবেন না বাংলাদেশের নারীরা’ পড়ে হঠাতই মনে পড়লো শেরিনের কথা, সেদিনের কথা। নোটগুলো পেলাম না খুঁজেও। পেলে ভালো হতো এই কারণেই যে আমি অনেকগুলো প্রশ্ন সেদিন তাকে করেছিলাম আমার দেশের প্রেক্ষাপটে। আর তিনি উত্তর দিয়েছিলেন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। যেহেতু আমার হাতে কিছু নেই, তাই নেট থেকেই পেলাম।

একটি পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে শেরিন বলেছেন, সত্তর দশকে ইসলামিক ফেমিনিজম বলে যে বৈশ্বিক মুভমেন্ট শুরু হয়েছিল, মারিয়াম মসজিদ’ তারই বৃহত্তর একটা অংশ বলে তিনি মনে করেন। বর্তমান সময় এবং সমাজ অনুসারে, বিশেষ করে নারী অধিকারের বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে কোরানকে যেভাবে উপস্থাপন করতে চাইছেন বিশ্বজুড়ে নারী ইমাম এবং স্কলাররা, এই মসজিদ এবং তাতে ইমামতি এই আন্দোলনেরই অংশবিশেষ। তার মতে, মারিয়াম মসজিদ নারী অধিকারের বিষয়টিতেই অন্যদের চাইতে ব্যতিক্রম। আর যৌক্তিকতার দিক দিয়েও তারা সঠিক পথেই আছেন।

শেরিন ওই সাক্ষাতকারে এও বলেন যে, ইসলাম ধর্মমতে বিয়ের শর্ত বা চুক্তিতে স্পষ্টই লেখা আছে যে নারীর অধিকার আছে ডিভোর্স দেয়ার, এবং বহুগামিতা মোটেও বিকল্প নয়। শারীরিকভাবে সহিংসতার শিকার হলে বিয়ে ভেঙে যাবে। আর বিয়ে না টিকলে সন্তানের কাস্টডি দুজনেরই পাওয়ার অধিকার আছে।

ব্যক্তিগতভাবে শেরিনের মা ফিনিশ এবং বাবা সিরিয়। অন্যান্য মুসলিম নারীর মতোন তিনি হিজাব পরেন না। এ নিয়েও তার একটি মতামত আছে। তিনি বলছিলেন যে, মানুষজন যখন অবাক হয় আমার হিজাব না দেখে, আমি তাদের একটি কথাই বলি, তাহলো, আমার কাছে হিজাবের ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। আমার কাছে হিজাবের অন্য অর্থ হলো আনুগত্য এবং সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তি হওয়া। সেটা আমার আছে।

জন্মের সময় তার নাম ছিল অ্যান ক্রিস্টিন খানকান। ‘ক্রিটিক্যাল মুসলিমস’ নামে একটি সংস্থাও তৈরি করেন শেরিন, যেখানে তিনি ইসলাম এবং রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রচুর সংখ্যক কলামে তিনি একাধারে ইসলামোফোবিয়া এবং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর সাথে লড়াই করছেন। তিনি মনে করেন যে, নারীর নেতৃত্ব নেয়া এজন্যই প্রয়োজন, কারণ এতে করে সমাজে একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে এবং ক্রমেই তা সাম্যবাদী ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। ২০০৭ সালে তিনি Islam and Reconciliation – A Public Matter নামে একটি বই লিখেন।

তিনি বলেন, নারী যখন প্রার্থনায় নেতৃত্ব দেন, খুতবা দেন, এর মধ্য দিয়েই তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থেকেই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেন, এবং কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেন। তবে এ শুধু ইসলামিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, খ্রিস্টান এবং ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোও সমানভাবে পুরুষ-অধ্যুষিত। কাজেই সেইসব ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
কেবলমাত্র কোরানের পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার পরিবর্তনই চাই না আমরা, আরও ভিতরে, একেবারে গোড়ায় গিয়ে কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে চাই, আর এটা সম্ভব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থেকেই, বলেন শেরিন।

১৯৭৪ সালে জন্ম নেয়া শেরিন ব্যক্তি জীবনে চার বাচ্চার মা, এবং ডিভোর্সি। বাবা ছিলেন সিরিয় শরণার্থী এবং একজন নারীবাদী। দামেস্কে পড়াশোনা শেষে শেরিন ২০০০ সালে ফেরত আসেন ডেনমার্কে। তিনি নিজেকে দুই বিশ্বের মাঝামাঝি জন্ম নেয়া একজন হিসেবে দেখেন এবং তার লক্ষ্য হচ্ছে দুই বিপরীত মেরুর একীভূত করা। কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটি থেকে সোশিওলজি অব রিলিজিওন এন্ড ফিলোসফিতে মাস্টার্স করেন শেরিন।

সাধারণত নারীর কাজ ছিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করা, অবলোকন করা, তাতে তাদের উপস্থিতি ছিল না। এখানেই পার্থক্য তৈরি করেন শেরিন নারী নেতৃত্বাধীন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানিতে আগেই এ ধরনের মসজিদ থাকলেও ডেনমার্কে এটিই ছিল প্রথম। ইমামতি ছাড়াও এ পর্যন্ত প্রচুর সংখ্যক বিয়ে তিনি পড়িয়েছেন মারিয়াম মসজিদে। এমনকি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিয়েও ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক, যা অন্য মসজিদগুলোতে পড়ানো হয় না। এজন্য সাধারণ রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের বিরোধিতার মুখেও তাকে পড়তে হয়েছে বার বার।

শেয়ার করুন:
  • 1.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.8K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.