আমরা আমাদের সন্তানদের আসলে কী দিচ্ছি?

সুপ্রীতি ধর:

গতকাল ঢাকার অভিজাত মাস্টারমাইন্ড স্কুলের এক ছাত্রী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, ‘ধর্ষণ’ এর কারণে এই রক্তপাত হয়। এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ মেয়েটির সম্মতিতে যৌনক্রিয়া হলে হাইমেন ছিঁড়ে গেলেও এতোটা রক্তপাত হওয়ার কথা না, যতোটা হলে মৃত্যুপর্যন্ত হতে পারে। আর এজন্য যে পরিমাণ পেইনফুল পেনিট্রেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেটা যদি ধর্ষণ না হয়, তবে কোনটাকে আমরা ধর্ষণ বলবো? অবশ্য এসবই বলছি সাধারণ জ্ঞান থেকে, বিশেষজ্ঞের জ্ঞান থেকে না। শুধু ভাবছি, কতোটা এবং কতোক্ষণ ধরে রক্তপাত হলেই একটি মানুষ মারা যেতে পারে! তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়তো বেঁচে যেতো মেয়েটি।

এদিকে একদল অতি উৎসাহী আগেপরে কিছু না জেনেই মেয়েটি, মেয়েটির পরিবারের চরিত্রহননে নেমেছে। এটা নতুন কিছু না। এটি ধর্ষণ নাকি দুজনের সম্মতিক্রমে যৌন সম্পর্ক ছিল, তা এখনও প্রমাণ হয়নি। কাজেই এইক্ষেত্রে বিষয়টি মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ছেলেটিকেও আমরা কেউই ধর্ষক বলতে পারি না, পারি কি? কিন্তু আমাদের ফেসবুকিয় আদালতকে কে বোঝাবে এটা? তারা মৃত মেয়েটিকে তো কাঁটাছেঁড়া করছেই, সেইসাথে ছেলেটিকেও করছে। পুরো বিষয়টাই ‘জাত গেল, জাত গেল, সমাজ রসাতলে গেল’ রবের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। নিউজগুলোর নিচে চোখ পাতা যাচ্ছে না।

আমি ময়নাতদন্ত বা সোয়াব রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত একটু নিরপেক্ষ থাকারই চেষ্টা করছি। আর কাকেই বা দোষারোপ করবো? আমাদের সন্তানদের? আমার যে সন্তান একটা খেলার মাঠের জন্য হাহুতাশ করতে করতে অবশেষে ইন্টারনেটে আশ্রয় নেয়, তাকে আমি কোন মুখে দোষ দেবো? যে সন্তানেরা স্কুল বলতে বোঝে একটা কাঠখোট্টা দালান আর ভারী ব্যাগ, ক্লাস, কোচিং, আর বাসা বলতে বুঝতে শিখছে অবাধ ইন্টারনেটের ব্যবহার, সেখানে তাদের কাছ থেকে আমাদের আশা-ভরসাটুকুই বা কী? জাগতিক নিয়মেই তো ওদের বয়ো:সন্ধিকাল পার হয়ে এমন একটা বয়সের মুখোমুখি যখন তাদের কাছে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ হওয়াটাই স্বাভাবিক, এর অন্যথা হওয়া মানেই অস্বাভাবিকত্ব। সেটা যতদিন না আমরা মানতে পারবো, ততদিন সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

সেক্স বা যৌনতা খারাপ না, কিন্তু আমাদের দেশের লোকজন এটাকে খারাপভাবে উপস্থাপন করে থাকে। এটাকে নিষিদ্ধ করতে করতে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়াবহ একটা বিপর্যয়ের মুখে। যৌন অবদমিত সমাজ এর চেয়ে কিছু ভাবতেও পারে না। আর এই অবদমন থেকেই তৈরি হয় একেকজন ধর্ষক। ভূমিষ্ট হওয়ার পরই কেউ ধর্ষক হয়ে উঠে না, তাকে নারী-পুরুষ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি ভালো মানুষ, সৎ, খারাপ মানুষ, লুটেরা, ডাকাত, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, নির্যাতক, ধর্ষক, খুনি হিসেবেও গড়ে তোলা হয়। আর এটা করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। কেউই এর দায় থেকে মুক্ত নয়। আমরা অভিভাবকরা তো নই-ই।

সত্যি করে বলুন তো, সেক্স কি খারাপ বিষয়? অন্যায়? নিষিদ্ধ? যদি তাই হতো, তাহলে সেক্স করে কেন মানুষ? আর এক জিনিসের জন্য জগত সংসার সব উল্টেও যায়। কেন? যদি এর শক্তি নাই থাকতো, তবে তো পৃথিবীতে এতোকিছু ঘটতো না, মানব জনমও হতো না।

প্রতিটা মানুষ ইন্ডিভিজ্যুয়াল, কেউ কারও মতোন নয়। কাজেই আপনি যদি ধরে বসে থাকেন যে আপনার ছেলেমেয়েও আপনারই মতোন হবে, প্রচণ্ড ভুল আপনি। একটা ভালো পরিবেশ আপনি তাকে দিতে পারবেন, কিন্তু গড়ে উঠবে সে নিজেই। কারণ আশেপাশের অনেক কিছুর শিক্ষাও সে একইসঙ্গে পাবে। কিন্তু ওই ভালো পরিবেশটা দেয়ার দায় আমাদের, সমাজের, রাষ্ট্রের। একটা কথা আছে না, ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়’- এখন মনে হয় এটা ভুল ধারণা। কারণ বৃক্ষেরও প্রকারভেদ আছে, কোন জমিতে, কোন মাটিতে, কোন সার দিয়ে সে বেড়ে উঠেছে, এবং বেড়ে উঠার পর সেই মাটি এখনও আগের মতোন জৈব আছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করছে ফলের পুষ্টতা।

হমম, আমরা বাচ্চাদের বই পড়ার কথা বলি, খেলাধুলার কথা বলি। সেগুলো তো অবশ্যই দরকার আছে একজন ব্যক্তির মানস গঠনে, কিন্তু এগুলো বাদেও আমরা যে জীবনটা যাপন করছি, সেই জীবনে হঠকারিতা আছে কি নেই, দুর্নীতি, অন্যায়ের সাথে আপোস করছি কিনা, তার ওপর আছে স্কুল, সমাজ, রাষ্ট্র। এসব মিলেই একটা মানুষ গড়ে উঠে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন অজস্র বই পড়তাম, পড়ার বইয়ের বাইরে আমাদের জগত ছিল বিশাল, সেই জগতে সংস্কৃতি চর্চা ছিল, খেলাধুলা ছিল, স্বপ্ন ছিল। এমনকি প্রেমও ছিল। খুবই স্বাভাবিক নিয়মেই আমাদের স্কুল জীবনেই প্রেম এসেছে। কিন্তু বড়রা কী করতো? মেরেকেটে, অপমান করে ভূত ছাড়ানোর মতোন করে প্রেম ছাড়াতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এতে হিতে-বিপরীত হয়েছে বরাবরই। প্রেম তো ছাড়েইনি, বরং জীবনটাই ছেড়ে যেতো, না ছাড়লেও ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে যেতো সেই জীবনে। অথচ এটাকে খুবই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিলেই এমন কিছুই হতো না। স্বাভাবিক নিয়মেই সেই প্রেম হয়তো টিকতো, হয়তো টিকতো না। নিজেরাই বেরিয়ে আসতো অসম সম্পর্ক থেকে। এক কঠোর অনুশাসনের নামে জীবনটাকে বিষিয়ে দেয়া হয়েছে আমাদের আমলেও। এখনও তাই হয়। তবে এখনকার বাচ্চারা যেহেতু আগের চেয়ে স্বাধীন, তখন তারা ঘরের অনুশাসন আর বাইরের স্বাধীনতা গুলিয়ে ফেলে। আর তার ফল হয় ভয়াবহ।

একটা ১৭/১৮ বছর বয়সীর কাছে সেক্স বিষয়টি হওয়ার কথা কৌতুহল, আনন্দের, নিখাদ প্রেমের। সেখানে জোরজবরদস্তির কিছু নেই। ভয় থাকতে পারে, কিন্তু অত্যাচার বা নির্যাতনের প্রবণতা থাকার কথা না।

আর তাই আগেও বলেছি, বার বার বলি, আবারও বলি যে সেক্স এডুকেশনটা এজন্যই খুব খুব জরুরি। মানুষ যদি এখন সবকিছু ধর্ম দিয়ে অবদমন করতে চায়, সেটা আরেকটা নির্যাতন ছাড়া কিছু না। কারণ এই বয়সটা আর ফেরত আসবে না, এই কৌতুহল আর থাকবে না, এই আনন্দও থাকবে না।

মেয়েটাকে যারা দোষারোপ করছে, তারা নিজেদের ঘরের দিকে মনোযোগ দিক। আর ছেলেটার অপরাধের দিকেও আঙ্গুল তোলার আগে নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখুক, কী জীবন তারা নিজেরাই যাপন করছে। কেন ছেলেটা এমন আচরণ করলো, এর অবশ্যই মনোজাগতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে। কথা হচ্ছে আমরা আমাদের এবং সমাজের মানসিক চিকিৎসাটা কবে করাবো?

শেয়ার করুন:
  • 215
  •  
  •  
  •  
  •  
    215
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.