ধর্ম ও রীতি-নীতি শুধু অন্যের বেলায় কেন?

ফওজিয়া চৈতি:

এই সমাজে আমরা সবাই খুব ভালো। এই যে আপনি বিশ্বাস করেন বিধাতা ঈশ্বর বলে কিছু নেই। সবই যুক্তির সৃষ্টি। আবার আপনিও যিনি ধর্মের নাম দিয়ে সবকিছু আদায় করতে চান। এবং আপনিও অনেক ভালো যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের গালিও দেন। আপনারা সবাই মানে আমাদের এই সমাজটাই অনেক ভালো। কিন্তু ব্যাপারটা হলো আমরা সবাই নিজেদের কাছে ভালো। অন্যের কাছে নয়। আপনার জন্য যা জায়েজ, অন্যের জন্য তা নাজায়েজ, সুতরাং অন্যরা খারাপ।

এক.
তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি৷ প্রতিবেশী এক বন্ধুর বাসার কয়েকজন (দুইজন মেয়ে, তিন জন ছেলে) বন্ধু মিলে কোন কাজে বা বেড়াতে গিয়েছিলাম। খুব হাসাহাসি করছিলাম সবাই মিলে৷ হঠাৎ বন্ধুর মা এসে আমাদের দুজন মেয়েকে বললো – মেয়ে মানুষের এতো জোরে হাসতে হয় না। মেয়ে মানুষের হাসি রুমের বাইরে গেলে গুনা হয়।
ছোট্ট মনে কথাটা খুব লেগেছিল। তখন থেকে চেষ্টা করতাম হাসি কন্ট্রোল করার বা হাসি আসলে মুখ চেপে ধরতাম। তার ১/২ সপ্তাহ পরে, ওই আন্টির বাসার পাস দিয়ে যাওয়ার সময় খুব জোরে জোরে হাসির শব্দ পেলাম। পরেরদিনও একই ঘটনা। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম- “এত জোরে কে হাসে? ” দারোয়ান হাসতে হাসতে উত্তর দিল – “আপু, ম্যাডাম। ম্যাডাম হাসলে তিন এলাকা খবর হয়”।
সেই ছোট্ট জীবনে প্রথম বুঝলাম নীতি কথা অন্যের জন্য নিজের জন্য নয়। তারপর থেকে হাসি আর কোনদিন কন্ট্রোল করিনি।

দুই.
সম্ভবত নবম/দশম শ্রেণীতে পড়ি। এক আত্মীয়র বিয়েতে গিয়েছিলাম। গায়ে হলুদ রাতে বসার জন্য কোন চেয়ার পাচ্ছিলাম না। আমার এক আংকেলকে বললাম চেয়ার ম্যানেজ করে দিতে। উনি মুখের উপর বললেন – “ওখানে বসতে হবে না। পরপুরুষ দেখবে তোমাকে।” আমার ভীষণ রাগ হলো। বললাম – “আমি তো দেখাতেই চাই। লাগবে না, আমিই চেয়ার ম্যানেজ করে নেবো”।

ওই আংকেলের দুই মেয়ে। এক মেয়ে দেশের বাইরে থাকে। আরেকজন দেশে। দেশের বাইরে যে থাকে তার কথা বাদই দিলাম, দেশে যে মেয়েটি থাকে তাকেও আমি প্রায় দেখি ছেলেদের সাথে বিভিন্ন টুরে গিয়ে ছবি দিতে। চারপাশে ৮/৯ জন ছেলে মাঝে মেয়েটি। আংকেল ও কিছু ছবি শেয়ার দিয়ে ক্যাপশান দেন – “আমার মেয়ে ঘুরে এলো অমুক জায়গা থেকে”। আমি হাসি৷ অন্যের মেয়ের বেলায় পরপুরুষ। নিজের মেয়ের বেলায় বন্ধু-আংকেল। ধর্মের বাণী শুধু অন্যের বেলায় কেন?

তিন.
২০১২/১৩ সালে দেশ তখন উত্তাল রাজাকারদের বিচারের দাবীতে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, অনলাইন সব জায়গায় এক দাবী – রাজাকারের ফাঁসি চাই।
কৌতুহলবশত একদিন নিজামী, মুজাহিদ, কাদের মোল্লা সহ কয়েকজনের পারিবারিক বিস্তারিত পড়ছিলাম। খুব অবাক হলাম দেখে – এদের কারো সন্তানই মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে নাই। আল্লাহর পথে চলার জন্য মাদ্রাসার শিক্ষার প্রতি তাদের যে জোর গলা ছিল তা সবার জানা। উনারা পারলে সব মিডিয়াম বন্ধ করে শুধু মাদ্রাসাই চালু রাখে। কিন্তু নিজের সন্তানদের বেশির ভাগ ইংলিশ মিডিয়ামে, কিছু সংখ্যক বাংলা মিডিয়ামে পড়িয়েছেন। এবং মোটামুটি সবার সন্তানই দেশের বাইরে স্যাটেলড।
এই যে এক মানুষের ভিতর দুটি সত্ত্বা বাস করে, কেন? অথচ উনাদের ওয়াজ শুনে শুনে বাংলার কোটি কোটি মা বাবা সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়ান একটু বেহেস্তে যাবার লোভে।

চার.
বিয়ের পর প্রতিটি মেয়েকে একটা কমন কথা শুনতে হয় – তোমার বাপ মা কিছু শেখায়নি তোমাকে? দোষ কার সেটা বড় ব্যাপার নয়, এমনকি সেটা দেখারও বিষয় নয় পান থেকে চুন খষলেই ঘরের বধূকে শুনতে হয় – তোমার পারিবারিক শিক্ষা কেমন? তোমার বাপ মা কিছু শিখায়নি তোমাকে? এমনি এমনি ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে পাঠায় দিছে?
অপরদিকে স্বামী যতই দোষ করুক বউয়ের মুখে কখনোই আসে না – তোমার পরিবার শেখায়নি কিছু তোমাকে। স্বামী বা স্বামীর পরিবারের দেখাদেখি দু একবার যদি বলেও ফেলে এমন কথা তাহলে সেদিন সেই বউয়ের আর নিস্তার নাই। সবাই গায়ে হাত না তুললেও কথার বাণে মারে বারে বার।
কথা হচ্ছে, বউয়ের দোষে যদি পারিবারিক শিক্ষা খারাপ হয়, স্বামীর দোষে তা হবে না কেন? একই ঘরে দুই নীতি কেন?

এরকম শত শত উদাহরণ আমাদের চারপাশে আছে। যা লেখে শেষ করা যাবে না। আমরা সবাই নিজেকে রাইট মনে করি৷ যে দেশে ফ্রি মদের অফার পাইলেও মানুষ লুটে পুটে খায়, সেই মানুষগুলোই আবার তর্ক করে শামুক খাওয়া হারাম না হালাল, কচ্ছপ খাওয়া হারাম না হালাল। সারাজীবন মানুষের হক মেরে খাওয়া লোকটাও বাণী শুনায় – “আমি অনুমতি না দিলে আমার বউ বেহেস্তে ঢুকতে পারবে না”। অন্যের সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়ানোর জন্য জোর করা হুজুরটাও নিজের সন্তানকে ঘুষ দিয়ে হলেও ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করানোর চেষ্টা করে।

অন্যের দোষ ধরা, অন্যের সমালোচনা করা, অন্যের সব কাজে বাধা দেওয়া আমাদের অভ্যাস নয় শুধু, স্বভাবে পরিণত হয়েছে। অন্যকেউ যেন সামনে এগুতে না পারে সেজন্য পিছন দিয়ে টেনে ধরতে ধরতে আমরা পুরো জাতিটাই কীভাবে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছি, আমরা নিজেরাও জানি না।
আফসোস, দেশটা তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া হতে পারতো, কিন্তু দেশটা পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে যাচ্ছে।

লেখক- ফওজিয়া চৈতি, উদ্যোক্তা।

শেয়ার করুন:
  • 440
  •  
  •  
  •  
  •  
    440
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.