কুড়িয়ে পাওয়া ডায়েরির পাতা থেকে

ছন্দা দাশ:

পূর্বকথা:

একদিন রেলস্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ছেঁড়াখোড়া ডায়েরি রেল লাইনের পাশে পড়েছিল। পথ চলতে গিয়ে এমন অনেক ডায়েরির পাতা, চিরকূট আর চিঠি দেখতে পাই। কখনও কুড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু এই ছেঁড়া ডায়েরি যে জন্যে আমাকে আকর্ষণ করেছিলো তা হলো হস্তাক্ষর। এমন অপূর্ব হাতের লেখা আমি খুব কম দেখেছি। তারপর আমি তা কুড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম। পড়তে পড়তে আমার কৌতূহল ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিল। একজন নারী তার জীবন নিয়ে লিখেছে। সম্ভবত তাঁর ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিলো। ডায়েরির মাঝে মাঝে কিছু পাতা ছিল না। আবার কোথাও কোথাও পানিতে লেখা মুছে গেছে। আমি সেই অজানা নারীর ডায়েরি সাজিয়ে গুছিয়ে একটি আকার দেবার চেষ্টা করেছি। যদি ডায়েরির লেখিকা আমার এ প্রয়াসে অপরাধী করেন, তবে ক্ষমাপ্রার্থী।

আমার শৈশব

আমি পিতা মাতার প্রথম সন্তান। আমার জন্মমুহূর্তে আমার পিতা মাতার, পরিবারের মনোভাব কেমন ছিল আমি দেখিনি। যদিও সব পিতামাতার কাছে প্রথম সন্তান থাকে আদরের, আকাঙ্খার আর আদরের।
কিন্তু আমি তাঁদের কাছ থেকে তেমন আচরণ পাইনি। আমার পর পাঁচজন ভাই জন্মে। তাদের নিয়ে পিতা মাতার ছিল গর্ব, ভাবনা। সব ভালোবাসা ওদের ঘিরে। অর্থাৎ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলো পাঁচ ভাই। ওরা ছেলে বলেই কি? ওদের মধ্যে আমি ছিলাম অস্তিত্বহীন এক মানুষ। যার কিছু চাওয়ার থাকতে নেই, পাওয়া তো নয়ই। মা বাবা ওদের ভালো স্কুলে ভর্তি করে দিলেন, আর আমার কাজ ভাইদের জামা কাপড়, বই, ব্যাগ গুছিয়ে রাখা, ওদের জন্য ভালো ভালো নাস্তা তৈরি করা। আমার চারপাশের মেয়েরা তাই করতো। কিন্তু আমার তা ইচ্ছে করতো না। আমার ভেতরে জেদি এক মেয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করতো। আর তার ফলে প্রায়ই বকাঝকা এমনকি মারও খেতাম।

আমার বাবা বলতো এরকম নালায়েক, বেশরম মেয়ে কী করে যে আমার মেয়ে হয়? মাকে বলতেন এ তোমাদের বংশের ধারা। মা বড়ো অপরাধির মতো মাথা নত করে নীরবে তা হজম করতো। আমার ভাইদের লেখাপড়া করতে দেখে আমারও খুব ইচ্ছে করতো লেখাপড়া করতে, স্কুলে যেতে। কিন্তু আমি জানি মা বাবার কাছে এ ইচ্ছের কথা বলা আর পাথরে মাথা কুটে মরা একই। তাই মনের সাধ মনেই রয়ে গেল। অবশ্য দুপুরে যখন সবাই ঘুমাতো আমি ছোট ভাইটিকে নিয়ে শেখার চেষ্টা করতাম। এভাবে আমি পড়তে আর লিখতে শিখেছি। এটুকুই শেষ।

এ নিরানন্দ, নির্মম পরিবেশে বাস করেও আমি স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমার বিয়ে হলে যার ঘরে যাবো, সে নিশ্চয় আমার স্বপ্ন, আমার চাওয়াকে পূর্ণতা দেবে। কিন্তু জন্মই যার আজন্ম পাপ, দুঃখ যে তার সাথী। তাই যার সাথে আমার বিয়ে হলো সে আমার পিতার চাইতেও অনেক বেশি গোঁড়া। বাবার কাছে তবু মাঝে মাঝে ফাঁক পেতাম। কিন্তু স্বামীর কাছে নৈব নৈব চঃ। এ রকম ধার্মিক, গোঁড়া ছেলেকে জামাই করতে পেরে আমার মা-বাবা বেশ গর্ববোধ করতেন। স্বামীর ঘরে আমি আমার লালিত অনেকদিনের স্বপ্নগুলি নিয়ে যেদিন পা রাখলাম, সে রাতেই আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। কানে শুধু বাজতে থাকে “মনের ব্যথার কথা প্রকাশিতে নারি, কত পাপ ছিলো তাই হয়েছিনু নারী”। বুঝতে পারলাম আমি এক খাঁচা থেকে অন্য খাঁচায় বন্দি হলাম চিরদিনের জন্য। এ বাঁধন আরও শক্ত, আরও নির্মম। এখানে কেবল নারী আর স্বামীর মুখ ছাড়া অন্য পুরুষের মুখ দেখা নিষিদ্ধ, সে চার বছরের শিশুই হোক, বা আশি বছরের বৃদ্ধ। চার দেয়াল ঘেরা একটি রুমে থাকতে থাকতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতো। উচ্চস্বরে কথা বলা, উচ্চস্বরে হাসাও বারণ। জানালাগুলো কোনকালেই বোধ করি খোলা হয়নি।

বিয়ের ছয় বছর পর আমি বাবার বাড়ি যাই। কোলে আমার তিন বছরের শিশুপুত্র। রাতের অন্ধকার তখনও কাটেনি। সারা ট্যাক্সি কাপড়ে মুড়ে, আমিও কাপড়ের পুটলি হয়ে বাবার বাড়ির দরজায় যখন পা রাখলাম, এক নিমেষে আমার সমস্ত অন্ধকার কেটে গেলো। মনে হলো আমি মুক্ত, স্বাধীন। কিন্তু তা কিছুদিনের জন্য। আবার ফিরে গেলাম কারাগারে। শুধু একটাই সুখ, আমার শত চেষ্টাতেও আর সন্তানের মা হইনি। এজন্য স্বামীর গঞ্জনার অন্ত ছিল না। ছেলের বয়স যখন ছয়, স্বামী সন্তানের অজুহাতে আবার বিয়ে করলো। উনার মতে এটা শরীয়ত মতেই করেছেন। কিন্তু এবারে আমার বিদ্রোহী সত্ত্বা জেগে উঠলো। ছেলের হাত ধরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু যা আমার বিস্ময় ছিলো তা আমার স্বামী। একবারও আমায় বাধা দিলো না। সে হয়তো কিশোরী বধুর সান্নিধ্যের মধুরতায় পুরানো সবকিছু ত্যাগ করতে ব্যাকুল ছিলো। ফিরে এলে পর বাবার বাড়ির অভ্যর্থনা সুখকর ছিলো না একমাত্র ছোট ভাইটি ছাড়া, এমনকি আমার গর্ভধারিণী মাও না। আমি এখানে এসে সবকাজ নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলাম। সবাইকে খুশি রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম।

তবুও পারলাম না। আমার জীবনের নাটক শেষ হয়নি।

আমার দ্বিতীয় বিয়ে

এভাবে যখন আমার দিন কাটছিলো আমার বাবা যে ভিতরে ভিতরে আমার বিয়ের চেষ্টা করছিলেন, কিছুই টের পাইনি। যখন বুঝেছি আমার করার আর কোন উপায় নেই। বিধাতা পুরুষ বড়ই রসিক। তাই আমার জীবন নিয়ে আবার লীলাখেলা চালালেন। আমাদের এক দূর সম্পর্কিত মামাতো ভাই কD কাজে আমাদের বাড়ি এসে আমাকে দেখে পছন্দ করে। বাবা সুযোগ পেয়ে সাথে সাথেই তা কার্যকর করে নিলেন। সেই রাতেই আমার মতামত ছাড়াই কাজী ডেকে বিয়ে হয়ে গেলো। বাস্তব বড় নিষ্ঠুর। বিয়ের পরের দিন সন্তানসহ আমি আমবাগানের কাছে একটা ছোট্ট ভাড়াবাসায় উঠে এলাম। আমার এই স্বামী তেমন খারাপ না, তবে সীমাহীন অলস।একদিন কাজে যায় তো তিন দিন শুয়ে কাটায়। সংসার আমার আর চলছিল না।

একদিন সে আমাকে বললো, চাকরি করবে? আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি যে লেখাপড়া জানি না। সে বললো কেন লিখতে, পড়তে তো পারো। আমি মাথা নাড়ি। ওটুকু হলেই হবে। সেদিন‌ই সে আমাকে একজন নারী ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। আর সেদিন থেকেই আমার নতুন জন্ম। এই দয়ালু ডাক্তার আমাকে শুধু নার্সিং ট্রেনিং নয়, শেখার পর হাসপাতালে চাকরিও দিয়েছিলেন। জীবনে যেন আলোর আভাস দেখতে পেলাম। সংসার আর চাকরি এই দুটো নিয়ে আমার যত আনন্দ। তাই প্রচণ্ডভাবে আঁকড়ে থাকি এ নিয়ে। কাজের বাইরে চোখ দেবার সময় ও মানসিকতা আমার ছিল না। আর সেই সুযোগে আমার দ্বিতীয় স্বামী একটু একটু করে কখন যে সরে যাচ্ছিল বুঝতেই পারিনি। যখন পেলাম সেই মুহূর্তে সে পাশের বাসার কিশোরী কন্যাকে নিয়ে পালিয়েছে। আমি কিন্তু ভেঙে পড়িনি। বিস্মিতও হ‌ইনি। ভয়ও পাইনি। আমার পায়ের নিচের মাটি তখন শক্ত। পৃথিবীর সব পুরুষের চেহারা আমার কাছে চেনা। আমি আমার শিশু পুত্রটিকে নিজের মতো করে মানুষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আশা না রেখেই।

ছোটবেলা থেকেই বুঝেছি লেখাপড়ার বিকল্প কিছু নেই। তাই ছেলেকে ভালো স্কুল, ভালো শিক্ষক, ভালো ব‌ই সবকিছু দিয়ে মানুষ করেছি দরিদ্রতা সয়েও। কিন্তু পৃথিবীতে কেউ কেউ আসে শুধু দুঃখ স‌ইবার জন্য। তাই তো ছেলে বড় হয়ে, মানুষ হয়ে, প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে আলাদা বাসা নিয়ে চলে গেল। সেদিনও আমি কাঁদিনি, ভেঙে পড়িনি, দুঃখও করিনি। আমি অভাগিনী সাবিহা বেগম সারাজীবন একা রয়ে গেলাম। শুধু যখন হাসপাতালে প্রসূতি মায়েরা ডেলিভারি রুমে ঢুকে, আর তার পরিবার পরিজন অপেক্ষায় থাকে অনাগত শিশুটির জন্য, আমি সেখানে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করি যে সন্তান যেন কন্যা হয়। আমার হাতে যেন কোনো পুত্র সন্তানের জন্ম না হয়। আর কোন পুত্রের মুখ আমি দেখতে চাই না।

শেয়ার করুন:
  • 354
  •  
  •  
  •  
  •  
    354
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.