কয়েকটি রাজনৈতিক অশ্লীলতা ও নেতৃত্বের দোকানদারী

আলী আদনান:

একটা দেশের ভবিষ্যৎ কতোটুকু পাল্টাবে বা কীভাবে পাল্টাবে তা নির্ভর করে সে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের গুণগত মান, দূরদর্শী নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা, সততা ও নিষ্ঠার উপর। মেধা, সততা, দক্ষতা- প্রত্যেকটি গুণই আলাদাভাবে থাকা উচিত। একটা সমাজের অগ্রগতিও নির্ভর করে সেই সমাজের নীতিনির্ধারকদের উপর। নীতিনির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে অনেক সভ্যতা যেমন এগিয়ে যায়, তেমনি সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে সমাজে দেখা দেয় অরাজকতা। ফলে একটি দেশের রাজনীতিতে মেধাবী, সৎ, দক্ষ ও বিচক্ষন তরুণদের বিকাশ ঘটবে সেটাই প্রত্যাশিত।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোগুলো এখন ধীরে ধীরে রাজনীতি নির্ভর হয়ে গেছে। মসজিদ মন্দির থেকে শুরু করে গ্রামের ক্লাবেও এখন রাজনীতিকীকরণ চলে। প্রাইমারি স্কুলের সভাপতি কী আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাকি বিএনপি’র প্রার্থী এ প্রশ্ন যেমন আসে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার সরকারের কতোটুকু অনুগত তা প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শিল্প সাহিত্যের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন একাডেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাজার কমিটি, মহল্লা কমিটি কোথাই নেই রাজনীতি। আমরাই পৃথিবীর অন্যতম দেশ যেখানে মানুষ ক্ষমতাসীন দল ও সরকারকে এক করে ফেলি।

এতো কথা বলার উদ্দেশ্যে হলো আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নির্ভর। গ্রামে কেউ মারা গেলে জানাযার নামাজে কে দু’চার কথা বলবে- এমন সিদ্ধান্তেও রাজনৈতিক পরিচয় কখনও কখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ফলে বেড়েছে প্রতিহিংসা, বেড়েছে নোংরামি।

যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষকে এতো ক্ষমতাসীন করে তুলছে, একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ কেউ হয়ে উঠেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, সেখানে আমাদের দেশে রাজনৈতিক কর্মীদের গুণগত মান বাড়েনি। মেধাবী, সৎ ও বিচক্ষণ মানুষদের রাজনীতিতে আসার পথ দিন দিন বন্ধ হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এর দায়ভার এড়াতে পারেন না।

রাজনীতিতে মেধাবী তরুণরা আসছে না এমন অভিযোগ সবার। কিন্তু কেন আসছে না সেটাও ভেবে দেখা উচিত। সেরকম কয়েকটি বিষয় যদি আলাপ করি তাহলে নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলোই উঠে আসবে।

দুই

শুধু কেন্দ্রেই নয়, একেবারে তৃণমূলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণ এখন পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এমপি’র ছেলে যেমন এমপি হয়, চেয়ারম্যানের ছেলে চেয়ারম্যান হয়, এসব এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এদেশে অনেককিছু পরিবর্তন হয়েছে, বা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সামন্তবাদী মনোভাব থেকে আমাদের নেতাদের মুক্ত করার সংস্কৃতি এখানে গড়ে উঠেনি। বড় মনের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ।

বাবা জীবনে বেশ কয়েকবার এমপি মন্ত্রী হয়েছেন। তার বয়স হয়েছে। তার খুব ইচ্ছে দল তাকে মনোনয়ন না দিলে যেন তার ছেলেকে মনোনয়ন দেয়। তিনি মারা যাওয়ার আগে নাতিপুতির চেহারা যেমন দেখতে চান তেমনি ছেলেকে এমপি হিসেবেও দেখতে চান। মারা যাওয়ার আগে এটা তার শেষ ইচ্ছা। বাবাদের এমন ইচ্ছার কবলে পড়ে মাঠে ঘাটে সারাজীবন শ্রম দেওয়া, ঘাম দেওয়া অসংখ্য নেতাকর্মী বলি হয়। কর্মীরা প্রথম জীবনে নেতার পেছনে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়, মাঝ বয়সে নেতার ছেলের পেছনে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়, শেষ বয়সে নেতার নাতির পেছনে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়। আবার একটু অন্যরকমও দেখা যায়। যেমন রাজার ছেলে বংশ পরম্পরায় রাজা হচ্ছে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হচ্ছে। আর সৈনিক যেমন যুদ্ধের মাঠে রাজার জন্য প্রাণ দিয়েছিল তেমনি তার ছেলেও সৈনিক হয়ে রাজার ছেলের জন্য যুদ্ধের মাঠে প্রাণটাই দিচ্ছে।

আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন মন্ত্রী মহোদয়ের ছেলে কি রাজনীতি করার অধিকার রাখেন না? তিনিও রাষ্ট্রের নাগরিক। কেন তিনি এমপি হওয়ার সুযোগ চাইবেন না? চমৎকার! আমিও সেটাই বলছি। আপনি এমপি হোন, মন্ত্রী হোন, রাষ্ট্রের শিরোমণি হোন, কিন্তু বাবার ক্ষমতাকে ব্যবহার করছেন কেন? অতিরিক্ত আনুকূল্য পেয়ে কেন? সৎ সাহস থাকলে কর্মীদের কাতারে এসে আট-দশ বছর মাঠে ঘাটে কাজ করুন। বাবার পরিচয়ের বাড়তি সুবিধাটুকু দূরে সরিয়ে রাখুন। কর্মীদের সাথে থেকে মানুষ চিনুন। তারপর না হয় একটা মহড়া হবে!

মন্ত্রী মহোদয় যখন তার দলীয় দায়িত্ব, রাজনৈতিক পরিচয় পারিবারিক সম্পত্তির মতো তার সন্তানের কাছে হস্তান্তর করতে উদ্যত হোন, তখন কী তার লজ্জা লাগে না? এটা ব্রিটিশ আমল নয়। জমিদারের ছেলে জমিদার হতো। তাই বলে এমপি’র ছেলে এমপি হবে এমন প্রভাব খাটানোর আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন। উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়ি-গাড়ি সম্পত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে এমপি বানানোর, চেয়ারম্যান বানানোর যে অপচেষ্টা তা একটি শোষনহীন সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা। অসংখ্য মাঠকর্মীর সাথে সরাসরি বেঈমানি। কিছু মানুষ শুধু বংশপরম্পরায় ‘অভিনন্দন’ দিয়েই যাবে, আর একটি পরিবার বংশপরম্পরায় ‘অভিনন্দন’ পেয়েই যাবে আজকের বাংলাদেশে এটা সবচেয়ে বড় অশ্লীলতা। এর ফলে মেধাবী ও পরিচ্ছন্ন তরুণরা রাজনীতিতে বিমুখ হচ্ছে। তারা রাজনীতির চেয়ে নিজের ক্যারিয়ারে সময় দেওয়াটা সম্মানজনক মনে করছে। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে জাতি, রাষ্ট্র।

তিন

দলীয় কর্মী হওয়া ও নেতার ব্যক্তিগত কর্মী হওয়া এককথা নয়। বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা দুটো বিষয়কে এক হয়ে যেতে দেখছি। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে নেতার আনুগত্য দেখাতেই বেশি ব্যস্ত। ঔপনিবেশিক ধ্যানধারনা আমাদের চিন্তায় মজ্জায় গেঁথে আছে। অতি তোষামোদী করে একটু বেশি সুবিধা পাওয়ার আশায় দলীয় কর্মীরা বড় নেতার ব্যক্তিগত তোষামোদীতেই ব্যস্ত থাকে বেশি।

দলীয় গঠনতন্ত্রে যাই লেখা থাকুক না কেন কর্মীদের ভাগ্য ও ভবিষ্যত নির্ধারিত হয় নেতার মনমর্জি মতো৷ কর্মীদের যোগ্যতা, অবদান কোন কিছুই বিবেচনায় আসে না। মেধাবী তরুণরা খানিকটা আত্মসম্মানের কারণেই পিছিয়ে যায় তোষামোদী প্রতিযোগিতায়। এ সুযোগে এগিয়ে যায় অল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত গণ্ডমূর্খ ও সুবিধাবাদীর দল। তারাই ধীরে ধীরে বড় নেতা হয়। রাজনীতিতে আরও একধাপ পিছিয়ে যায় মেধাবী তরুণরা। দলীয় কর্মী যখন ব্যক্তিগত কর্মী হিসেবে পরিচিতি পায় তার চাইতে বড় অশ্লীলতা আর কী হতে পারে?

চার

‘রাজনীতি’ ও ‘সওদাগরি’ দুটো যদি এক হয়ে যায়, সেখানে ভালো মানুষদের অস্তিত্ব টিকবে না, সেটাই স্বাভাবিক। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের জেলা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একটা হাটবাজার হাটবাজার ভাব। আগে কর্মীরা নেতা বানাতো। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতারা নেতা বানায়। এখানে দল ও দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা হতে টাকা লাগে। নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে টাকা লাগে। যার টাকার পরিমাণ যতো বেশি রাজনীতিতে সে টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ততো বেশি। প্রার্থীর গুণগত মান বা রাজনীতিতে তার অবদান এখানে দেখা হয় না। প্রার্থী কতোটা জনমুখী বা জনবিচ্ছিন্ন কিনা তাও এখানে আলোচনায় আসে না।

এক দশক আগের চেয়ে পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ। একদশক আগে প্রার্থীরা ভোটারদের টাকা দিত। এতে সাধারণ মানুষ টাকাটা পেত। এখন টাকা দিতে হয় সরাসরি নেতাদেরকে। এর ফলে যাদের অবৈধ আয় আছে তারাই নেতৃত্বের দৌড়ে, জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে। আরেক ধরনের লোক এ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়৷ তারা ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। তারা এটুকু বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে রাখে যে নির্বাচিত হলে বা জনপ্রতিনিধি হলে এ টাকা তারা উসুল করে আনতে পারবে যেকোনো পন্থায়।
বাণিজ্য করার জন্য যেমন ঝুঁকি নিতে হয়, আমাদের অনেক জনপ্রতিনিধিও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা রাখেন। সাধুবাদ পাওয়ার মতো ব্যাপার বটে!

যারা চিন্তায় কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব লালন করে থাকেন তারা এই প্রতিযোগিতায় আগ্রহবোধ করেন না। ফলে তারা রাজনীতি বিমুখ হয়। তাদের শূন্যস্থান পূরণ করে টাউট শ্রেণী। সহজ বাংলা ‘নেতৃত্ব’ ও ‘জনপ্রতিনিধিত্ব’ এখন এখানে দোকানের পণ্য। নেতাদের অফিস, বাসভবন বা ড্রয়িংরুম পরিচিতি পায় দোকান হিসেবে। নেতৃত্বের আশায় বা জনপ্রতিনিধি হওয়ার আশায় দৌড়ে থাকা পাতিনেতাটি এখানে ক্রেতা। সচরাচর অন্য দোকানের সাথে এখানে একটা পার্থক্য আছে। অন্য দোকানে সব জিনিসের একই মূল্য। কিন্তু বর্তমানের রাজনৈতিক সওদাগরিতে যে বেশি টাকা দিতে পারবে পণ্যটি তার। বুঝতে নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে না পণ্যটি কী? পণ্যটি কখনো ‘নেতৃত্ব’ কখনও ‘জনপ্রতিনিধিত্ব’।

যে দেশের রাজনীতি টাউটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, পরিচ্ছন্ন মনোভাবের মানুষরা যেখানে রাজনীতিতে আগ্রহ হারায়, দীর্ঘদিন মাঠে ময়দানে পরিশ্রম করার পরও দিনশেষে যখন কর্মীদের মুখ থেকে নেতার গুণধর পুত্রমশায়রা নির্বাচনী মনোনয়ন ছিনতাই করে বা ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালায়- তখন সে রাজনীতি প্রজন্মের জন্য মোটেও আশাপ্রদ নয়, একথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

তাহলে করণীয় কী? করণীয় হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মেধাবী তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নতুন করে যুগোপযোগী ভাবনাগুলোকে উস্কে দেওয়া। ধর্মীয় অন্ধত্ব যেমন কাম্য নয় তেমনি দলকানা হওয়াও দেশের জন্য বিপজ্জনক। কোন অবস্থাতেই রাজনীতি বিমুখ হওয়া যাবে না। জনসম্পৃক্ত হওয়ার বিকল্প নেই। ‘মেধা’র চেয়ে বড় কোন শক্তি নেই। লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। বিজয় সুনিশ্চিত।

(লেখক: আলী আদনান, লেখক, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।
মেইল: [email protected])

শেয়ার করুন:
  • 184
  •  
  •  
  •  
  •  
    184
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.