সুপ্রীতি ধরের ‘সোভিয়েত নারীর দেশে’- একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

আফসানা কিশোয়ার লোচন:

আমাদের অনেকের শৈশব কৈশোর কেটেছে রাশান গল্পের অনুবাদ পড়ে। শক্ত মলাটের মালাকাইটের ঝাঁপি তো আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই। ৬ বা ৭ বছর বয়সে আম্মু একটা বই কিনে দিলো ‘তুপা কেন পাখি ধরে না’ – তুপা ছিলো একটা বিড়াল,সে হঠাৎ পাখি ধরা বন্ধ করে দিলো। তুপার সাথে কি পাখিদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল,না তুপার অসুখ করলো সে আমার আজকে ৩৫ ৩৬ বছর পর মনে নেই। শুধু মনে আছে আমি তখন তুপা ছিলাম। আমার মতোই তার জীবনের অনেক মনে না থাকা আবার বহুকিছু মনে থাকা স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন সুপ্রীতি ধর তার “সোভিয়েত নারীর দেশে” স্মৃতি কথায়।

এই যে ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করা একজন অল্পবয়সী মেয়ে,যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পিতৃহারা তার ঢাকায় এসে হলিক্রস কলেজে ভর্তি হওয়া,সেখান থেকে পাশ করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে চলে যাওয়া এ আমার কাছে দারুণ থ্রিলিং লাগে! সেই ১৯৮৬ সালের পরিবার কত অগ্রগামী! একবারও তারা সেই সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণীকে বলছে না “তোকে বিয়ে না করে বিদেশে পড়তে যেতে দিবো না!”। যা আমরা এখন হরহামেশা শুনি।

সাড়ে নয় বছর লেখক সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলেন,দেখেছেন সোভিয়েত ভেঙ্গে যেতে। সেইসাথে দেখেছেন রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে গেলে কেমনভাবে তা জাতির প্রকৃতিও পাল্টে দেয়।
১৯৮৬ সালের ৬ অক্টোবর লেখক এরোফ্লোটে করে নামেন মস্কোয় তথা বহুদিনের কল্পনায় থাকা স্বপ্নের দেশে। ভিসার নানা জটিলতার কারণে সেশন শুরু হবার দেড় মাস পরে এসে তিনি তার শিক্ষাকার্যক্রমে যোগ দেন। মস্কো ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে প্রাথমিক অবস্থায় গিয়ে সুপ্রীতি ভাবেন এখানেই তার পড়ার ব্যবস্থা হয়েছে। অনেক বাংলাদেশী মানুষ পেয়ে তিনি আশ্বস্ত ও হয়ে যান। বেরিয়ে পড়েন মস্কোর পাতাল রেল স্টেশন দেখতে ও চড়তে। উচ্ছ্বাস শেষ হতেই জানতে পারেন তাকে যেতে হবে আরমেনিয়ার ইরেভানে। মোটামুটি মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। বাথরুম আটকে কেঁদেকেটে ইরেভানের উদ্দেশ্যে একসময় ঠিকই যাত্রা করেন,যেখানে সাকুল্যে দুইজন দেশী মানুষ থাকেন। ঢাকা থেকে যাত্রা পথে যে ছেলেটা বিমানে বমি করেছে বলে সুপ্রীতি এড়িয়ে যাচ্ছিলেন সেই বমি নাসিরই ইরেভানে সুপ্রীতির সঙ্গী হয়।

ইরেভানে নয়মাস থাকতে হয়,যেখানে ভাষা শিক্ষার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো কেমন তা আমরা জানি লেখকের বয়ানে। এমনভাবে ভাষা আনন্দের সাথে শেখানো হয় যে লেখক আজও বাংলার পরে যে কোনকিছু মাথার ভেতর রুশিতে অনুবাদ করেন,তারপর ইংলিশে, এরপর সুইডিশে।

ইরেভানে থাকা অবস্থায় সুপ্রীতি জানতে পারলেন তিনি দেশ থেকে যে বিষয়ে পড়ার জন্য মস্কোতে আবেদন করেছিলেন,অর্থনীতি – সাবজেক্ট এর কোডের ভ্রান্তিতে তার পড়ার বিষয় হয়ে গেছে সাংবাদিকতা। এমন অবস্থায় লেখক দেশে চলে আসবেন যখন ভাবছেন তার শিক্ষক সের্গেই তাকে বললেন,”তুমি থেকে যাও,যেও না। এই জীবন তুমি আর পাবে না। জীবনের বড় মানে হচ্ছে জীবনটাকে তুমি কত বিস্তৃত করে উপলব্ধি করতে পারছো,সেখানে। এই সুযোগটা তুমি এখানেই পাবে।”
লেখক থেকে গেলেন।

ইরেভানে থাকা অবস্থায় আমরা লেখকের বয়ানে আরমেনিয়ার ইতিহাস জানি,জানি ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ এ তুর্কিদের হাতে আরমেনিয়ায় ঘটে যাওয়া গণহত্যার কথা। তুর্কিরা কিভাবে আরমেনিয়দের গর্বের আরারাত পাহাড় দখল করে নেয়,তা জেনে পাঠক ও ভারাক্রান্ত হবেন অনায়াসে।

ভিন দেশ কিন্তু প্রবীণদের মনোভাব তরুণদের প্রতি স্নেহের – রাস্তার পাশে ঠাণ্ডা বরফে বসলে একদিন একজন বাবুশকা (দাদী) ধমক দিলেন এই বলে যে পাথরের ঠাণ্ডা লেগে গেলে পরবর্তীতে মা হতে সমস্যা হতে পারে। গ্রীষ্মের ছুটিতে কাজ করা, কিছু টাকা রোজগার ও কাজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় কত জরুরী তা সেই সমাজতান্ত্রিক দেশে ছাত্রাবস্থাতেই স্টুডেন্টদের বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

নয় মাস পরে লেলিনগ্রাদ গিয়ে শুরু হয় প্রকৃত পড়ালেখা। এখানে আমরা প্রেম পাই,এখানেই আমরা ধীরে ধীরে কমিউনিজমের পতনের পর ৭০ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি দেশের কাঠামো ভেঙে যেতে দেখি, যে দেশে সব কাজে ছিল নারীরা অগ্রগামী সে দেশে নারীর একসময় পুঁজিবাদের চকোলেট এর কাছে হেরে যাওয়াও দেখি।
এই বিদেশে শারীরিক অসুস্থতায় বন্ধুদের রাত জেগে শুশ্রূষা, বন্ধুর ভরসায় ইউটেরাসের সিস্ট অপারেশনের মতো চিকিৎসাও করে ফেলতে দেখি। ১৯ এর তরুণী ২৩ এ মা হয়ে যায় সেই বন্ধুদের তত্ত্বাবধানেই। বন্ধুদের কোলে কাঁখে কন্যা পালিত ও হতে থাকে। এই যে কম্যুনাল বাঁচা এ সম্ভব ছিল সেই সমাজতন্ত্রেই।

প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার এই বই পড়া যাবে একটানে। ২০১৮ তে সুপ্রীতি গিয়েছিলেন আবার রাশিয়ায়, তার আরেক মাতৃভূমির কাছে, তার প্রেমের কাছে।
এ ধরনের বই যেহেতু প্রতিটি অধ্যায়ই একটি ছোটগল্প, তাই রিভিউ করা বেশ কঠিন। একজন বাংলাদেশীর চোখে যদি সমাজতন্ত্রের সহজ চালচিত্র জানার আগ্রহ থাকে তাহলে ‘সোভিয়েত নারীর দেশে’ একটি হৃদয়গ্রাহী পাঠ হবে। হ্যাঁ বইয়ে কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে। যেমন পাঠক হিসেবে আমরা জানতে পারি না ঠিক কি কারণে পল্লব লেখকের জীবনে যুক্ত হন না। আড়াই বছর পরে দেশে গিয়ে কেন ই বা লেখক ফেরেন ভিন্ন একজন মানুষ হয়ে।

তারুণ্যের সম্মেলন, সেই বয়সে গড়ে ওঠা বন্ধন,বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। বয়সের সাথে অনেককিছু পাল্টে যায় সময়ের প্রয়োজনে কিন্তু রক্তের বাইরে এই যে আত্মার সংযোগ তা খুব সহজে ছিন্ন হয় না, তা পাঠক হিসেবে বুঝতে পারি বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ধরে ঘটনার বর্ণনায়।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা, দেশের প্রথম নারীবাদী ওয়েবপোর্টালের প্রতিষ্ঠাতা সুপ্রীতি ধর এর এটাই প্রথম বই। ছবি সম্বলিত বইটি মুদ্রণে আকর্ষণীয় হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সব্যসাচী প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে এরই মধ্যে। বর্তমানে সব্যসাচী এবং বাতিঘরের চট্টগ্রাম, সিলেট শাখায় বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

নিচে লিংকে গিয়েও অর্ডার করতে পারবেন।

https://baatighar.com/shop/product/16537?fbclid=IwAR2SQCgNXQhVLQ6TzhjIu1MeqVNKwIza_IDQ2WLgBepemHhVsDU2VrO9rbk#attr=

#সোভিয়েত_নারীর_দেশে

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.