চলে গেলেন আয়েশা খানম, আরেকটি বটবৃক্ষের পতন

চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা, দীর্ঘদিনের রাজনীতিক, নারী অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অগ্রগামী নেত্রী, মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকা অবস্থায় আজ শনিবার (২ জানুয়ারি ২০২১) ভোরে মারা যান। ষাটের দশক থেকে একনিষ্ঠভাবে নারী অধিকার আদায়ে যে অবদান তিনি রেখে গেছেন, যে অগ্রণী ভূমিকা তিনি পালন করেছেন প্রতিটি পদক্ষেপে, তাঁর মৃত্যুতে সেই আন্দোলনে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে অন্তরালে থাকলেও মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতোন তিনি ছিলেন, তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে গেছে নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলনগুলো।  উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি রইলো।

নেত্রকোনা ও দুর্গাপুরের মাঝামাঝি গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ই অক্টোবর জন্ম আয়েশা খানমের৷ পিতা গোলাম আলী খান এবং মা জামাতুন্নেসা খানম৷ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সহসভাপতি আয়শা খানম বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধসহ সব প্রগতিশীল আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক ছিলেন। পাকিস্তান আমলে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ঢাকায় শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে নামেন তিনি।

‘ডামি’ রাইফেল হাতে ঢাকায় নারী শিক্ষার্থীদের মিছিলের যে ছবি আলোচিত হয়, তাতে আয়শা খানমও ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত করেন আয়শা খানম। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেন তিনি।

১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং সংগ্রামী নেত্রী আয়েশা খানম৷ ফলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ঢাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব ছিল মূলত আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মী ছাত্র নেতাদের উপর৷ এছাড়া ছাত্র নেতা হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা ও সচেতনতার কাজেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন তিনি৷ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি যেটা গঠিত হয়েছিল সেটার উপর দায়িত্ব ছিল সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা৷ ফলে সেই কাজের সাথে বেশি জড়িত ছিলাম৷ এছাড়া বিশেষ করে সাতই মার্চের পর থেকে ঢাকা শহর সংগঠিত করা এবং যোগাযোগ রক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করছিলাম৷ সেসময়ের বন্দুক কাঁধে করা একটি ছবি এখন সবাই দেখতে পান, সেখানে আমিও রয়েছি৷”

এপ্রিল মাসের শেষদিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় যান আয়েশা খানম৷ সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ক্রাফটস হোস্টেলে উঠেন তিনি৷ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাঁরা ভারতে আসতেন, তাঁদের এক অংশের সাময়িক আবাসস্থল ছিল ক্রাফটস হোস্টেল৷ সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা, প্রণোদনা দান এবং শরণার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগাতে কাজ করেন আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মীরা৷

আগরতলায় তাঁর কাজের কথা বলতে গিয়ে আয়েশা খানম জানান, ‘‘আগরতলায় আমি প্রাথমিক একটা প্রশিক্ষণ নিই চিকিৎসা সেবার উপর৷ এরপর আগরতলার প্রতিটি ক্যাম্পে গিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সহায়তা দিতে আত্মনিয়োগ করি৷ এছাড়া বিভিন্ন অভিযানে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠানোর আগে তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা হতো৷ সেখানে তাদের ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার কাজ করতাম৷ আমি যেহেতু আগে থেকেই সচেতনতা সৃষ্টির কাজে এবং বক্তৃতা ও কথা বলার ক্ষেত্রে জড়িত ছিলাম সেজন্যই বোধায় সেখানেও আমাকে এ ধরণের কাজেই বেশি করে জড়িত রাখা হয়েছিল৷” এছাড়া ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন আয়েশা খানম৷

মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয়মাসের নানা স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে একটি তুলে ধরলেন আয়েশা খানম৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে যেদিন প্রথম আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যোগ দিলাম, সেটি ছিল আমার কাছে খুবই স্মরণীয়৷ কারণ আমি সেদিন খুব আনাড়ি হাতে হলেও আহত কিশোর-তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষতস্থানগুলো পরিষ্কার করে যখন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিচ্ছিলাম তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল আমি সত্যিই দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সরাসরি কোন কাজ করছি৷”

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, সমান অধিকারভিত্তিক সমাজ গড়ার কাজে জড়িয়ে রেখেছিলেন আয়েশা খানম৷ এছাড়া নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি৷ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেন তিনি৷ শুরু থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত৷ প্রথমে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অবস্থাতেই চলে গেলেন আমাদের বটবৃক্ষ, পথিকৃত আয়েশা খানম৷

তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে ও প্রথম আলো

শেয়ার করুন:
  • 320
  •  
  •  
  •  
  •  
    320
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.