ধর্ষণ নারীর অধিকার সীমিত করার একটা কৌশলও বটে!

কানিজ ফাতেমা:

নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্ষণকে নারী নির্যাতনের বহুল ব্যবহৃত কৌশল বা অস্ত্র ও বলা যেতে পারে। ধর্ষণ নারীর অধিকার সীমিত করার একটা কৌশল ও বটে।

ধর্ষণ কী?

এই প্রসঙ্গে বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয় পুরুষাধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি উপাদান হচ্ছে ধর্ষণ, পুরুষতন্ত্রের একটি বড় অস্ত্র হচ্ছে ধর্ষণ, নারীর উপর বলপ্রয়োগের চরমরূপ হচ্ছে ধর্ষণ যেখানে পুরুষ নারীর সম্মতি ছাড়া তার সাথে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়।

ধর্ষণ একধরনের যৌন আক্রমণ। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ব্যতীত তার যোনি বা পায়ুতে শরীরের কোনো অংশ বা বস্তু দ্বারা অনুপ্রবেশকে ধর্ষণ বলে। বর্তমানে বাংলাদেশ সবচেয়ে ধর্ষণপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। দিনে দিনে ধর্ষণ সমাজে স্বাভাবিক রূপ লাভ করছে। কেননা যে সমাজে বছরের পর বছর ৫ বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হয় বা হচ্ছে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সেখানে ধর্ষণের মতো অমানুষিক বিষয় সত্যিই সকলের কাছে স্বাভাবিক রূপ নিতে বাধ্য। এদেশে পিতা ধর্ষণ করছে তার কন্যাকে, শিক্ষক ধর্ষণ করছে তার ছাত্রীকে, শ্বশুর ধর্ষণ করছে তার পুত্রবধূকে।এভাবেই চলছে ধর্ষণের মহোৎসব। চারিদিকে কেবল অমানুষ ছড়াছড়ি। একটা মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে সে আর কোনোকিছুর ভয় পাচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের। ধর্ষণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো নারী এই অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেই।

“জোর যার মুল্লুক তার” একটা পুরুষতান্ত্রিক আদর্শ।
সোজা বাংলায় বললে যার ক্ষমতা আছে এবং যিনি এই ক্ষমতা দুর্বলের উপর প্রয়োগ করেন তিনিই পুরুষতান্ত্রিক।
পুরুষ কেন ধর্ষণ করে??

তার অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ ক্ষমতার প্রভাব খাটানো। ক্ষমতাকে নারীর উপর দেখানোর জন্যই তারা ধর্ষণ করে। একটা উচ্চ সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন নারীকেও একজন নিচুস্তরের পুরুষ ধর্ষণ করতে ভয় পায় না। কোনো কোনো পুরুষের একমাত্র হাতিয়ার কেবলই ধর্ষণ। যার কোনো ক্ষমতা নাই তারও ধর্ষণ করার ক্ষমতা আছে।
ক্ষমতা কাঠামো সবসময়ই পুরুষকে ধর্ষণ করার শক্তি জোগায়।
যে মনস্তত্ত্ব নিয়ে পুরুষ বেড়ে উঠেছে যে তারা ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী এবং নারীদেরকে তাদের ক্ষমতার চাইতে একটু হেয় করে দেখা, দুর্বল ভাবা ;
তাকে সবসময় নিপীড়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করার যে চেষ্টা, মগজে গেঁথে ফেলা যে নারীকে ভোগ করা, নির্যাতন করা,মেরে ফেলার অধিকার তাদের আছে- এটাই মূলত ধর্ষণের জন্য দায়ী।।

ধর্ষণ ব্যাপারটা আগাগোড়া পুরুষতান্ত্রিক। জন্মের পর থেকেই ছেলে মেয়ে দুজনের মগজই ধোলাই করতে শুরু করে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। জন্মের পর থেকেই ভিন্ন দরজা দেখানো হয় দুজনকে। নারীকে সেই শুরু থেকেই মগজে গেঁথে দেওয়া হয় বাইরের পরিবেশ তার জন্য নয়।
আর পুরুষকে শেখানো হয় কিভাবে নারীকে ভোগ করতে হয়,নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং সেই সাথে রক্ষা ও। নারীকে সেখানো হয় নারী নিজের রক্ষা নিজে করতে পারবে না তার পাশে কোনো পুরুষ না থাকলে সে দুর্বল।

ধর্ষণ যারা করে তাদের জন্মের পর থেকেই পুরুষতন্ত্র দ্বারা মগজ ধোলাই হওয়া। তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নারী মানেই দুর্বল, নারী মানেই তাকে ভোগ করা যায়, নির্যাতন করা,নিপীড়ন করা, শোষণ করা,মেরে ফেলা কেটে ফেলা মানে তার সাথে যাচ্ছেতাই করা যাবে। তাই যতদিন পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র বজায় থাকবে ততদিন ধর্ষণ চলবে। যতদিন প্রত্যেকটা পুরুষ মানুষ না হবে মানসিক পরিবর্তন না আনবে, পারিবারিক শিক্ষা না পাবে, ততদিন পর্যন্ত ধর্ষণ চলবে। ধর্ষণ করে ক্ষমতার প্রভাবে ছাড় পেয়ে যাওয়ার অনেক দৃষ্টান্তও আছে এই সমাজে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ করে যখনই একটা আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে যখনই একটা মানুষ বুঝতে পারে সে দোষ করে ছাড় পেয়ে যাবে তার কোনো শাস্তি হবে না তখনই সে একধরনের বিচারহীনতার সুবিধা ভোগ করে।
প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। যখন যে ক্ষমতায় থাকছে তাকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দেখানো ও ধর্ষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিষ্কার ভাবে দেখা উচিত কারা তাদের দলে ঢুকছে, রাজনীতি মানে তো কেবল বক্তৃতা দেওয়া না। তাদের উচিত দলটাকে সুসংগঠিত করা। যারা এধরনের অপকর্মের সাথে জড়িত তাদের দল থেকে বের করে দেওয়া। কারন এরা তো সবার জন্য ক্ষতিকর। এরা কেবল নারীর জন্য নয় জাতির জন্য বিষাক্ত।

আগেকার দিনে বিভিন্ন ধরনের রোগ মহামারী আকার ধারণ করতো এবং মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান কাজে লাগিয়ে একসময় রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু এখন মানুষ নিজেই সবচেয়ে বড় ঘাতক হয়ে গেছে তাই এর প্রতিকার কঠিন হয়ে পড়েছে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যে ধর্ষণ বন্ধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা, তা ঠিক বলা যায় না, বরং ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে ধর্ষণের পর ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার তালিকা আরও বাড়তে থাকবে। আমাদের আসলে বোঝা দরকার কেন ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করেছে এবং কীই-বা করণীয় আছে এই অশুভ রোগের চিকিৎসার জন্য।

আবার ধর্ষণের বিরুদ্ধে কেবল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। ধর্ষণের শিকার হয়ে নারী কোনো অপরাধ করেনি, তাকে কলঙ্কিত মনে করা, অপমানিত মনে করার পরিবর্তে সে নির্যাতিত বা অত্যাচারিত হয়েছে এই বিষয়টা মানতে শিখতে হবে। কলঙ্কিত হবে ধর্ষক, ওই নারী না। চরিত্রের উপর প্রশ্ন উঠবে ধর্ষকের, নারীর না। ধর্ষণের ভয়ে মেয়েকে ঘরে বন্ধ না করে ছেলেকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে, পুরুষ করে গড়ে তুলতে যেয়ে ছেলে শিশুটিকে মানুষ করতে ভুলে যাচ্ছেন না’তো সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। নিজের বুলি দিয়ে ধর্ষিতাকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করার আগে অন্তত একটিবার তার জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবুন।
ডিজিটাল বাংলাদেশ, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, মাদকমুক্ত বাংলাদেশের পাশাপাশি ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠন ও পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নাম: কানিজ ফাতেমা।
প্রতিষ্ঠান: হলিক্রস কলেজ (দ্বিতীয় বর্ষ)

শেয়ার করুন:
  • 107
  •  
  •  
  •  
  •  
    107
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.