সিনড্রেলা হয়ে রাজকুমারের অপেক্ষা আর কত!

ফারজানা নীলা:

জনপ্রিয় রূপকথাগুলোর প্রায় অধিকাংশতেই একটা কমন দৃশ্য দেখা যায়। রাজকুমারী বন্দি থাকে বা অবহেলিত থাকে, তাকে উদ্ধার করতে আসে কোনও রাজপুত্র বা রাজা। বন্দি বা অবহেলিত রাজকুমারীগণ হোন অপূর্ব সুন্দরী, মানবিক গুণাবলীতে অনন্যা, কিন্তু তারা তাদের করুণ অবস্থা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেন না। এঁরা স্বপ্ন দেখেন কোনোদিন ঘোড়ায় চড়ে কোনও এক বীরপুরুষ আসবে, তাকে উদ্ধার করে তাকে নতুন জীবনের স্বাদ দিবে। এই রূপকথার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনড্রেলা।

এই যে কেউ এসে নারীকে উদ্ধার করে স্বাধীনতা দিবে বা মুক্তি দিবে, কিন্তু নিজে চেষ্টা করে স্বাধীনতা অর্জন করতে ভয় পায়, তাকে সিনড্রেলা কমপ্লেক্স বলে। একে প্রথম ব্যাখ্যা করেন একজন আমেরিকান লেখিকা এবং সায়ক্রাটিস্ট কলেটে ডওলিং (Colette Dowling )।

শুনতে শব্দটা সুন্দর হলেও এই কমপ্লেক্স বা আরও ভেঙ্গে বললে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা অত্যন্ত পুরনো। এখানে অধিকাংশ নারী এই ধারণায় বাস করে যে এরা যতই শিক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, এদের একজন পুরুষ অভিভাবক লাগে, যারা তার হয়ে যাবতীয় সকল সিদ্ধান্ত নিবে। বা তাকে একটা নতুন জীবন দিবে। অথচ চেষ্টা করলেই সে নিজেই কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিতে পারে, নিজেই নিজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। এই যে নিজে করার প্রবণতা নেই, সাহস নেই, সেটাও আবার সম্পূর্ণভাবে নারীর একান্ত দোষ না।

কারণ জন্ম থেকে পরিবার এবং সমাজ তাকে এটাই শিক্ষা দেয় যে নারীও চাইলে উচ্চশিক্ষিত হতে পারে, করতে পারে বাইরে কাজ, কিন্তু তবু তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য একজন পুরুষ দরকার। একজন সবল সচ্ছল যোগ্য পুরুষের যোগ্য নারী হওয়ার জন্য নারীকেও শিক্ষিত মার্জিত তথা লোক দেখানো সার্টিফিকেট নিতে হবে। তাকেও সকল গুণে গুণান্বিত হতে হবে।

অবিবাহিত থাকলে নারীর হয়ে তার সকল সিদ্ধান্ত নিবে তার বাবা, বিবাহিত হলে নিবে স্বামী। কাগজে কলমে অভিভাবকের জায়গায় বাবা বা স্বামীর নাম উল্লেখ থাকতে হবে। কিন্তু বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রে অভিভাবকের নামের জায়গায় স্ত্রীর নাম থাকে না।

স্ত্রী কি স্বামীর অভিভাবক হয়? না। একজন সক্ষম সচ্ছল প্রতিষ্ঠিত পুরুষের অভিভাবক সে নিজেই। কিন্তু সক্ষম সচ্ছল প্রতিষ্ঠিত নারীর অভিভাবক অন্য কেউ হয়। এমনকি সশরীরে কোনও আত্মীয় পুরুষ না থাকলে প্রয়োজনে পাড়া প্রতিবেশী কাউকে ধরিয়ে দিবে “একটু দেখে রাখবেন” বলে অভিভাবক হিসেবে।

কেন একজন সক্ষম প্রতিষ্ঠিত নারীরও পুরুষ অভিভাবক লাগবে? লাগবে কারণ আমাদের শিক্ষা হচ্ছে নারী যতই শিক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন তার একজন পুরুষ সঙ্গী লাগবেই যে তার দায়িত্ব নিবে। একজন পুরুষ অভিভাবকহীন নারীকে সমাজ খুব একটা ভালো নজরে দেখে না। খারাপ নজরে দেখার মতো কোনও কাজ না করলেও সমাজ তাকে বাঁকা নজরেই দেখে। এই নজর যেন “ভালো” থাকে, সেজন্য পরিবারের শিক্ষা এমনই হয় যে নারী শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত সক্ষম সবল হলেও তাকে একজন পুরুষের দায়িত্বে থাকা উচিত।

এই শিক্ষা আমাদের মেয়েদের মাথায় মগজে এমনভাবে গাঁথা যে খুব কম মেয়েই নিজেদের এই ধারণা থেকে মুক্ত করতে পারে। যারা মুক্ত হচ্ছে, নিজেদের অবস্থার উন্নতি নিজেরাই করছে, নিজের দায়িত্ব নিজেরাই নিচ্ছে, যারা মনে করে তাদের অভিভাবক তারা নিজেরাই তাদের সাধুবাদ।

এই মজ্জাগত শিক্ষার প্রভাবে নারী চেতন বা অবচেতন মনে নিজেদের পুরুষের উপর নির্ভরশীল ভাবতে ভালোবাসে। নারীর শিক্ষা কর্ম অর্থ কিছুই তাকে বা “আমার স্বাধীনতা আমি নিজেই আনবো”, “নিজের অভিভাবক নিজে” ভাবতে দেয় না। কারণ তার ভেতরে সেই শিক্ষা বার বার আওয়াজ দেয়, “তোমার একজন রাজপুত্র দরকার”। “তুমি সিন্ড বা সুন্দরের প্রতিমা বা ননীর পুতুল, তোমাকে মাথায় তুলে পুজা করার জন্য একজন রাজপুত্রের দরকার”। কারণ রাজপুত্র ছাড়া নিজের রক্ষা নিজে করা সম্ভব নয়। একমাত্র রাজপুত্রই পারে তোমার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করতে।

পাশ্চাত্য দেশের প্রেক্ষাপট আমাদের দেশের মত নয়। সেখানে এই কমপ্লেক্সের উৎপত্তি কারণ সকল গুন এবং যোগ্যতা থাকার পরও যদি কেউ পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতে চায় তবে সে সিনড্রেলা কমপ্লেক্সে আক্রান্ত। যেটা স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিকভাবে কেউ কারো উপর নির্ভর হতে চায় না। কেউ চাইলে সেটা অস্বাভাবিকতার মধ্যে পড়ে।

আমাদের এখানে এই নির্ভরশীল হওয়ার জন্য কিছু সামাজিক চিন্তাধারা “ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক” হিসেবে কাজ করে। এই নির্ভরশীল হওয়ার দরুণ নারীদের শিক্ষা এবং কর্ম অনেকক্ষেত্রে হাস্যকর উপাদান হিসেবে বিবেচ্য হয়। প্রায়শই আশেপাশে ছেলে কলিগদের থেকে শুনতে পাই “আরে আপনাদের খরচ কী! নিজের বেতন তো জমা করেন, খরচ তো সব স্বামীর টাকায় করেন”। বা সংসার তো চলে স্বামীর টাকায়, বৌয়ের টাকা তো বৌ খরচ করে না, জমায়।

আমরা যারা এই কমপ্লেক্সে আক্রান্ত নই, যারা মনে করি না আমাদের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য একজন পুরুষ অভিভাবক লাগবে, আমরা নিজেরাই নিজের যোগ্যতা দিয়ে নিজের এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারি এবং পারছিও তাদের জন্য উপরোক্ত কথা গুলো অত্যন্ত আপত্তিজনক এবং অপমানকর।

জোর গলায় প্রতিবাদ করতে যাওয়ার সময় আশেপাশের কিছু নারীদের কর্মকাণ্ড খেয়াল হয় যে এরা আসলেই চাকরি বা উপার্জন করলেও নিজেদের বেসিক চাহিদার সবকিছু স্বামীকে দিয়েই পূরণ করায়। এবং এতে এরা অপমানিত বোধ করার চেয়ে বরং এগুলোকে ‘স্ত্রীর অধিকার’ বলে বুক ফোলায়।

তাদের ভাষ্যমতে, নারী যতই শিক্ষিত এবং উপার্জনক্ষম হোক না কেন তাকে অবশ্যই একজন পুরুষদের দায়িত্ব থাকা উচিত। নারী উপার্জন করুক বা না করুক তার যাবতীয় খরচাপাতি একজন পুরুষকেই (আগে বাবা তারপর স্বামী) বহন করা উচিত। নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারা যে গৌরবের সে ব্যাপারে হয়তো এসব নারীদের কোনও ধারণা নেই। অথবা তাদের মজ্জাগত পারিবারিক এবং সামাজিক শিক্ষা তাদের আত্মসম্মান বোধকেই বিনষ্ট করে দেয়। আমরা রূপকথার সিনড্রেলা হয়ে আর কত কাটাবো জীবন! আর কত রাজকুমারের অপেক্ষা করবো! এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিজেদের “এলসা” আর “এনা” বানাতে কত দেরি!

অন্যর জন্য অপেক্ষা না করে নিজেদের শক্তি মেধা দিয়ে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করবই এই মানসিকতা সকল নারীর মধ্যে কবে আসবে? কবে আমাদের সাহসের কোনও অভাব হবে না? কবে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য নিজের যোগ্যতা দিয়ে লড়াই করবো! কবে আমরা বলতে পারবো আমরা সিনড্রেলা নই এলসা, আমরা আমাদের যোগ্যতা আর শক্তি দিয়ে নিজেই গড়ি নিজের ঠিকানা।

শেয়ার করুন:
  • 165
  •  
  •  
  •  
  •  
    165
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.