কান্না

মোহসিনা খাতুন:

ক্রিং ক্রিং ক্রিং—-
কর্কশ কণ্ঠে ফোনটা বাজছে অনেকক্ষণ ধরে।
ঘরের ভেতর থেকে ক্ষীণকণ্ঠ ভেসে এলো,
“দেখো তো বৌমা, এ অসময়ে কে—”
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, নিষ্প্রাণ চাহনী, অগোছালো এলোমেলো চুল,
নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু জলকণা,
দৌড়ে এলো একটি মেয়ে—
ফোনটা উঠালো—

তারপর নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠলো,
” কে? মা ? কেমন আছো ? বাবা কেমন আছে ?”
হঠাৎই নিষ্প্রাণ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো,
শুকনো ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললো,
“ভালো আছি মা । খুব ভালো।”
গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকা কান্নাগুলো,
বেরিয়ে আসতে চাইলো চোখ ফেটে।
গিলে ফেললো কান্নার দলাটাকে মেয়েটি,
—খুব কষ্ট হলো, ভীষণ কষ্ট।
বাবার বুকের ব্যথাটা বেড়েছে? চলে গেছে রান্নার লোকটা?
তোমার তো হাত ভাংগা—কী হবে মা? কে দেখবে তোমাদের?
“বউ-মা, ও বউ-মা, কই গেলে? কে ফোন করেছে এই অসময়ে ”
” আসছি মা—” গলা উঁচিয়ে বলে মেয়েটি।
” ভাবিসনে মা। ব্যবস্হা একটা হবে। বড্ড অসময়ে ফোন করে ফেলেছি।
তুই ভালো থাকিস মা—”

ওপাশ থেকে ভেসে আসে—লজ্জিত, নিষ্প্রাণ, অস্পষ্ট একটা কণ্ঠস্বর।
খাবার টেবিলে হৈ চৈ—
“বউমা, মুরগির ঝোলটা দারুণ রেঁধেছো”, বললেন শাশুড়ি আম্মা
” না, না, মুড়িঘণ্টটা দারুণ হয়েছে ” প্রতিবাদ করলেন শ্বশুরমশাই।
ননদিনী বললো, “সবজিটা যা রেঁধেছো না—“।

মেয়েটি বোবা দৃষ্টিতে তাকায়, একবার এর দিকে, একবার তার দিকে।
হঠাৎ তার ঠোঁট দুটো নড়ে উঠে নিজের অজান্তেই—
“আমার বাবারও খুব পছন্দ মুড়িঘণ্ট, আর মা’র তো সবজি ছাড়া চলেই না ”
কিছু বললে বউমা? বললেন শাশুড়ি আম্মা।

মেয়েটি চমকে উঠে, তাড়াতাড়ি বলে,
” না মা, এমনি —। আরেকটু দেবো মা ?”
মেয়েটি ঠোঁট দুটি চেপে ধরলো শক্ত করে।

বিকেলে বাড়ি ফিরলো স্বামীটি—
ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল একগাদা, মেয়েটির দিকে।
“মাকে ওষুধ দিয়েছো? বাবার প্রেশারটা দেখেছো ? টুনি কলেজ থেকে ফিরেছে?”
“হ্য্যঁ, হ্যাঁ, সব ঠিক আছে । ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি খাবার দিচ্ছি।”
—তাড়াতাড়ি করে বলে মেয়েটি।

কাঁপছে বুকের ভেতরটা মেয়েটির,
কীভাবে বলবে স্বামীকে, যেতে চায় একটু মায়ের কাছে!
হাত বুলাতে চায় একটু বাবার বুকের ব্যথাটাতে!
“পারমিশন” দেবে তো স্বামী? বাবার বাড়ি যাওয়ার?
খেতে বসে স্বামী—
স্বামীর প্লেটে মাছের মুড়ো তুলে দিয়ে মেয়েটি বলে, শুনছো —?
কপাল কুঁচকিয়ে স্বামীটি বলে, হু—-
কাঁপছে বুকের ভেতরটা মেয়েটির।
“আমি, আ-মি একটু—”

এমন সময় স্বামীর সেলফোনটা বেজে উঠে।
“হ্যালো, হ্যালো—-কে? বড়পা? তোমরা আসছো—?”
স্বামীর কপালের ভাঁজগুলি সোজা হয়ে যায়।
ফোন রেখে বলে, ” বড়পা আসছে। রাতে খাবে। পায়েস বানিও। বড়পার খুব পছন্দ।”
আরও কী কী যেন বলে স্বামীটি।
মেয়েটি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে স্বামীটির দিকে।

হঠাৎ মনে পড়লো যেন স্বামীটির,
বললো, কী যেন বলছিলে?
মেয়েটি খুব ঠাণ্ডা গলায় বলে, না, কিছু না । এমনি—
” ও, আচ্ছা। ঠিক আছে।” স্বামীটি বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
মেয়েটি এসে দাঁড়ায় জানালাতে, দুহাত দিয়ে শক্ত করে গ্রিলগুলি আকঁড়ে ধরে।
আর তাকিয়ে থাকে দূর আকাশের দিকে—
মেয়েটির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে,
—–সেই কান্নার দলাটা গলে গলে
—–যা সে গিলে ফেলেছিল।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.