নারী স্বাধীনতা, নারী ক্ষমতায়ন শব্দগুলোই যখন দুর্বোধ্য!

ফওজিয়া চৈতি:

আজকাল নারী ক্ষমতায়ন ও নারী স্বাধীনতা, এ দুটি বিষয় খুব আলোচিত। যদিও এর সঠিক ব্যাখ্যা আমরা কেউ বুঝি কিনা সন্দেহ। নারীরা এখন কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে যথেষ্ট এগিয়ে গেছে এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু স্বাধীনতা কী আদৌ পেয়েছে?

একজন নারী বাইরে চাকরি করে মানেই এই নয় যে সে স্বাধীনতা পেয়ে গেছে! মাস শেষে যখন পুরো বেতনের টাকাটা স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়, সেখানে স্বাধীনতা থাকে না। ২/৩ দিন অফিস শেষে কোন পুরুষ কলিগের সাথে একসাথে ফিরলে যখন স্বামী, শাশুড়িকে হাজারটা কৈফিয়ত দিতে হয়, সেখানে স্বাধীনতা থাকে না।
আবার অন্যদিকে অনেকে মনে করে আমার বউয়ের বেশকিছু ছেলে বন্ধু আছে। মাসে ২/১ বার যোগাযোগ করে। আমার বউকে আমি পুরো স্বাধীনতা দিয়েছি। কিন্তু সেই স্বামী জানে না কোন ছেলের ফোন আসার সাথে সাথে কে, কেন, কী এতো কথা, এতোক্ষণ কথা বলা লাগে – এই রকম হাজারটা প্রশ্নে মেয়েটির বিব্রতবোধে স্বাধীনতা থাকে না। প্রতিদিন একবার করে মেসেঞ্জার চেক করাকে স্বাধীনতা বলে না।

এক বড় ভাইয়ের বৌ পুলিশ অফিসার। ভাই একদিন গল্প করছিল – অল্প বয়সে ভাবীকে বউ করে নিয়ে আসেন। ভাবীর পড়াশোনা করার খুব আগ্রহ ছিল। তারপর উনিই ভাবীকে পড়াশোনা করান। ভাবী বিসিএস দেয়। বিসিএস পাশ করে পুলিশে জয়েন করেন।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম – কেন আপনি পুলিশের জবটাকেই প্রাধান্য দিলেন? একজন মেয়ে হিসাবে ভাবীর জন্য তো ক্যাডার/টিচার ভালো ছিল। উনি উত্তর দিলেন – কারণ আমি চিন্তামুক্ত থাকতে চেয়েছি। এখন তোমার ভাবীকে নিয়ে আমার কোন টেনশন করতে হয় না। সে ক্যাডার হলে তো আমাকে টেনশনে থাকতে হতো। কোনো বিপদ হলো না তো কোথাও! ঠিকমতো অফিসে গেলো তো! ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এখন অন্যরা তাকে নিয়ে টেনশনে থাকে। মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে যাদেরকে আমরা ভয় পাই, তারা এখন তোমার ভাবীকে ভয় পায়।
অদ্ভূতভাবে উনার কথাগুলো শুনছিলাম। আমরা বেশিরভাগ মেয়েরাও এভাবে চিন্তা করতে পারি না। সমাজের প্রতিটি ছেলের মানসিকতা যদি এমন হতো, তাহলে হয়তো সুন্দর একটা সমাজ আমরা পেতাম।

এখন অনেক পুরুষই চায় তার বউ কিছু করুক। কিন্তু কিছু শর্ত জুটে দেয়। যেমন – ঘরে বসে কাজ করতে হবে, এই কাজ করলে লোকে কী বলবে, বাইরে গেলে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে, অন্য পুরুষদের সাথে বেশি কথা বলা যাবে না, তোমার কাজের জন্য যেন সংসারের কোন কাজ পড়ে না থাকে। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এখনকার বাবারা ভাবে, মেয়েকে কম্বাইন্ড স্কুল, কলেজে পড়িয়েছি। কিছু বন্ধুদের নামও শুনি। আমার মেয়েকে আমি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি। আর কী লাগে! কিন্তু সেই বাবাই স্টাডি টুরের নাম শুনলেই জোর গলায় “না” বলে দেন। গ্রুপ স্টাডির কথা শুনলে কটু কথা শোনান। আবার মেয়ে প্রেম করছে শুনলেই নিজের মেয়েকে মাগী, বেশ্যা বলে গালি দিতেও দ্বিধা করেন না।
আবার এক প্রজাতি আছে যারা মেয়েদেরকে বেডরুমের সাজানো ফুলদানি মনে করে। তাদের ভাষায় মেয়েরা বেডরুমের বাইরে গেলে শিরক হয়, পড়াশুনা করলে শিরক হয়। বেগানা পুরুষের সাথে কথা বললে কাফির হয়ে যায়, বেগানা পুরুষদের সাথে চাকরি করলে কাফির হয়ে যায়। ওই মেয়ে লেখালেখি করে, গান গায়, নাচে। সেতো নাস্তিক।
যেন এই শিরক, কাফির, নাস্তিক তাদের বাপের সম্পত্তি। যখন যার উপর ইচ্ছা ঠাপ্পা লাগায় দেয়।

এসবের মাঝে কোন স্বাধীনতা নেই। এখনও বাইরে চাকরি করার জন্যও মেয়েদের বাবা, ভাই, স্বামীর অনুমতি নিতে হয়। অনেক সময় অনুমতি পেয়েও যায়। এইজন্য না যে তারা চায় তাদের মেয়ে/বোন/বউ নিজের পায়ে দাঁড়াক। অনুমতি দেওয়ার কারণ, তারা চায় তাদের মেয়ে/বোন/বউ সংসারে কাজ করার সাথে সাথে অর্থনৈতিকভাবেও তাদের সহযোগিতা করুক।

হাজার বছর ধরে শোষিত হতে হতে আমরা মেয়েরাও খুব অল্পতে বেশ খুশী হয়ে যাই। আমরা নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, কিন্তু কখনও বাবা মাকে, কখনও স্বামীকে খুশী করাতে তটস্থ থাকি। সেজন্যই সাজুগুজু করতে পছন্দ করা মেয়েটাও বিয়ের পর বরের কথা মতো হালকা লিপস্টিক দেওয়া ছাড়া কিছুই করে না। গান গাইতে ভালবাসে যে মেয়েটা বাবার ধমকের ভয়ে বাথরুমেই গুনগুন করে। স্বামীর সাথে বনিবনা না হলেও মায়ের শাসনে মেনে নেয় – পুরুষ মানুষের ভুল ধরতে নেই।

মেয়েদের গ্রুপে মাঝে মাঝে কিছু পোস্ট দেখা যায়।
বাসে কোন পুরুষ বাজে ইংগিত দিয়েছে বা রাস্তায় কেউ গায়ে হাত দিয়েছে। মার্কেটের ভীড়ে এক অসভ্য বাজেভাবে ছুঁয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে সেই পুরুষের ছবিসহ পোস্ট করে অনেকে। ব্যাপারটা ভালো। অবশ্যই এই ধরনের ঘটনা ও সেই পুরুষদের চেহারা সামনে আসা উচিত। কিন্তু সেই পোস্টেই মেয়েটা লিখে দেয় – আমি শালীন পোশাকে ছিলাম, বা আমি হিজাব পরা ছিলাম, অথবা আমি বোরখা পরি। এই কথাগুলো থেকে বোঝা যায় মানসিকভাবে আমরা এখনও কত পিছিয়ে আছি। তাহলে কী ধরে নেবো যে এই মেয়েদেরও ধারণা- ধর্ষণের জন্য মেয়েদের পোশাক দায়ী? দুঃখজনক ব্যাপার। নারী স্বাধীনতা, নারী ক্ষমতায়ন আমরা সবাই চাই, কিন্তু আমাদের চিন্তার জায়গাটাই পরিস্কার না।

আমরা এখনো এটা বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি – আমার শরীর। আমার পোশাক। আমার শরীরকে কি ধরনের পোশাকে সাজাব সেটা একান্ত আমার পছন্দ। কিন্তু আমার এই শরীরে আমার অনুমতি ছাড়া স্পর্শ করার অধিকার কারো নেই। তা নারী বোরখা পরুক বা উলঙ্গ চলুক। আর পোশাক যে পুরুষের লালসার প্রধান কারন না তার অন্যতম উদাহরণ – নুসরাত, মিতু, তনুরা।

কেউ কেউ এসে ফতোয়া দিবে এখন – ধর্মে নিষেধ আছে। মেনে নিলাম নিষেধ আছে। কিন্তু আপনার পূন্যের জন্য যেমন আমি বেহেস্তে যাব না তেমনি আমার পাপের জন্যও আপনি দোযখে যাবেন না। যার যার আমলনামা তার কাছে। সুতরাং আপনি কে শাস্তি নির্ধারণ করার?

স্বাধীনতা চাওয়া বা দেওয়ার আগে চিন্তা পরিস্কার হওয়া খুব জরুরি। আর শারীরিক এর চেয়ে চিন্তা ও মানসিক স্বাধীনতাই বড়। স্ববিরোধিতামূলক চিন্তা মানসিকতায় কর্মসংস্থান মিললেও, স্বাধীনতা মিলে না। আর ক্ষমতায়ন তো দূরের ব্যাপার। ক্ষমতায়ন হলো – কর্ম প্লাস স্বাধীনতার যৌথ প্রয়োগ।

দিন যেমন হুট করে রাত হয়ে যায় না। দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়। তেমনি আমাদেরও আস্তে আস্তে মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের স্বাধীনতা ও নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে।

লেখক- ফওজিয়া চৈতি, উদ্যোক্তা।

শেয়ার করুন:
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.