‘আমি নারীবাদী নই’ ভগিনীকূল সমীপে…

সাদিয়া আফরিন:

বাংলাদেশে গত দুইদিনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের একটি ছিলো দিনে প্রায় ৪০ টি বিবাহবিচ্ছেদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই খবর নিয়ে আলোচনা চলছে বিস্তর। আলোচনা, সমালোচনার সমেত এই সংবাদটির পরিবেশনের কায়দা ছিলো লক্ষ্য করার মতো। যেমন-

কেউ কেউ বলছেন –
“মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে এখন আর সংসারে থাকতে চাচ্ছে না”
“বদমেজাজ না ওটা বিদ্যার অহংকার, ইনকামের অহংকার”
“নারীবাদী হয়ে গেলে কীভাবে সংসারে মন বসে”

অনেকে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবকে দায়ী করছেন:
“সংসারে দুজনকেই মিলেমিশে থাকতে হবে, পাশাপাশি থাকতে হবে, কাউকে উদাসীন হলে চলবে না”
“সন্তান না হলে বিচ্ছেদ মানা যায় না, যে কারও এটা হতে পারে।”

আরেকটি দল পেলাম, যারা নারীর বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ঠিকই, তবে একটি ‘কিন্তু’ ব্যবহার করে যেমন, “সমস্যা হলে নারীরা বিচ্ছেদে যেতে পারে, কিন্তু তারা যদি নারীবাদী চিন্তা থেকে বিচ্ছেদ করে থাকে, তাহলে সেটা সমর্থনযোগ্য নয়।“

অথবা

“যদিও আমি নারীবাদী নই, তবুও আমি মনে করি মেয়েদের কারণগুলো ভ্যালিড… পুরুষের বিবাহবিচ্ছেদের কারণগুলো কেমন হালকা মনে হলো……নারীরা কি সারাজীবন কলের পুতুল থাকবে? মেজাজ পুরুষের একার থাকবে? নারীরা সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছে…বিচ্ছেদ তাদের অধিকার…”।

আমার আজকের এই লেখাটি “যদিও আমি নারীবাদী নই” দলভুক্ত ভগিনীদের জন্য, যারা লেখার শুরুতেই জানিয়ে দেন তাদের চিন্তাভাবনা নারীবাদের ‘পাপ’ মুক্ত।

বোঝা দরকার, এই যে ভগিনীরা বিসমিল্লায় বলেন ‘আমি নারীবাদী নই’, এর মাধ্যমে তারা আসলে কী বোঝাতে চান? কারণ তারা এরপর যে বক্তব্য হাজির করেন সরলভাবে বললে, সেসব নারীবাদী চিন্তারই প্রতিফলন। শুধু বিচ্ছেদের এই খবরটির ক্ষেত্রেই নয়, নানাসময়েই এই শব্দবন্ধটি নজরে আসে। প্রায়ই দেখি কোন প্রসঙ্গের অবতারণা করার আগে কিছু ভগিনী নারীবাদীদের নাম নিয়ে তারপর আগে বাড়েন, যেনবা খাবার আগে তারা হাত ধুয়ে নেন।

কেন গো ভগিনীরা? আপনাদের সমস্যা কী? নারীবাদীদের সাথে আপনাদের কীসের শত্রুতা? তারা কি ভিন গ্রহের কেউ যে খুব শীঘ্রই পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে আপনাকে উচ্ছেদ করতে আসছে? নাকি তারা ওরাং ওটাংদের কোন বিশেষ প্রজাতি, যাদের লোমশ শরীর দেখলে আপনার গা কুটকুট করে!

সত্যি করে বলুন তো, ‘আমি নারীবাদী নই’ এই পরিচয় দিয়ে আপনাদের নারীবাদী বক্তব্য তুলে ধরতে হয় কেন? নিজেকে নারীবাদী বলতে কোথায় বাধে আপনাদের?

আন্দাজ করি এর বড় একটা কারণ নারীবাদ সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ভাবনাগুলোকে আমলে নেয়া, বিশ্বাস করা এবং সাথে সাথে নারীবাদীদের সম্পর্কে যে বিদ্যমান ঘৃণা সেসব থেকে গা বাঁচানো। অথচ নারীবাদ সমাজে বিদ্যমান লিঙ্গীয় অসমতাকেই তুলে ধরে এবং সমতার ভিত্তিতে পৃথিবী সাজাতে চায়। সমতায় বিশ্বাসী যে কোন মানুষেরই হয়তো তা চাওয়া উচিত। আপনি চাইলে না চাইবেন কিন্তু ‘আমি নারীবাদী না’ বলার মাধ্যমে এই যে নারীবাদীদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে চাওয়া এবং নারীবাদীদের নেতিবাচক ক্যাটাগরি হিসাবে দেখতে চাওয়া কেন হে ভগিনীরা?

নারীবাদীদের অপরাধ কি এই যে তারা আপনার চলার পথকে মসৃণ দেখতে চায়? নাকি তাদের অপরাধ এই যে তারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে একটি ব্যবস্থার বিপক্ষে লড়াই করার ধৃষ্টতা দেখায়? জেনে রাখবেন, একজন রোকেয়া ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলেন আপনাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য, এতে তার কোন ব্যক্তিস্বার্থ ছিলো না। তাছাড়া বিশ্ব ইতিহাস পড়লেও জানতে পারবেন পৃথিবীর এক একটা পর্বে নারীরা কীভাবে এক একটা ইস্যু ধরে এগিয়ে গিয়েছিলো, সিস্টারহুড গড়ে তুলেছিলো।

লেখক: সাদিয়া আফরিন

হ্যাঁ, অনেক নারীবাদী পুরুষও ছিলেন সেই কাতারে। নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পাশে থাকতে তাদের কোথাও বাধেনি। কারণ যে বা যারাই চোখে জেন্ডার লেন্স পরে, তারা পৃথিবীকে আপনার চেয়ে ভিন্নভাবে দেখে। যেচে পড়ে নিজের ভিতর জায়গা দেয় নরক যন্ত্রণা। ভাগ করে নেয় পৃথিবীর তাবৎ কন্যা, জায়া, জননীর সংগ্রাম, এমনকি নির্যাতিত পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের বেদনাও।

মনে রাখবেন, পিঠ বাঁচিয়ে চললে রোকেয়ার মত নারীরা ঘর থেকে বের হতেন না। জমিদার কন্যা হিসাবে আরাম আয়েশে জীবন পার করে দেয়া তাদের জন্য কোন সমস্যাই ছিলো না। সাজানো জীবন তো দূরে থাক তার জন্য কবরের মাটির ব্যবস্থা করাই ভীষণ দুরূহ হয়ে ওঠেছিলো।

সুতরাং হে ভগিনীগণ, আপনারা নারীবাদী হবেন কি, হবেন না, সেজন্য আপনাদেরকে কেউ জোরাজুরি করছে না, শুধু কথায় কথায় নারীবাদীদের স্মরণ করার প্রবণতা বন্ধ করুন। কেননা আপনার তাচ্ছিল্য ও ঘৃণাযুক্ত শব্দবন্ধ “আমি নারীবাদী নই তবুও” কারও কারও লড়াই সংগ্রামের জায়গাকে পিচ্ছিল থেকে পিচ্ছিলতর করে। তবে হ্যাঁ সেজন্য নারীবাদ থেমে থাকেনি, থাকবেও না। লিঙ্গীয় সমতা অর্জনের লক্ষ্যে এ এক অব্যাহত সংগ্রাম। নারীরাও যার যার জায়গা থেকে প্রাপ্য সম্মান ও অবস্থান অর্জনের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। ৭০% নারী নিজেই যখন সিদ্ধান্ত নেয় ঘর ভাঙার মতো একটি সামাজিক ট্যাবুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাবার, তখন আপনাদের ‘আমি নারীবাদী নই’ সত্ত্বায় কি কোন বার্তা পৌঁছায় না হে ভগিনীগণ?

লেখকঃ নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

শেয়ার করুন:
  • 179
  •  
  •  
  •  
  •  
    179
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.