সম্পর্কগুলো থাকুক ভালোবাসা আর যত্নে

সানজিদা আহমেদ:

গত ২২ শে ডিসেম্বর দেশের শীর্ষ স্থানীয় প্রত্রিকা দৈনিক ‘প্রথম আলো’য় দেশে তালাকের হার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয় ঢাকায় এই তালাকের হার দিনে ৩৯। যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এছাড়া প্রতিবেদনটিতে একটি বাক্য বেশ ভালোভাবে গোটা অক্ষরে উঠে এসেছে। তাহলো শিক্ষিত ও চাকরিজীবীদের মধ্যে তালাকের হার বেশি।

এছাড়া তালাকের কারণগুলোও নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন রকমের। পুরুষেরা কারণ হিসেবে বলেছেন, নারীর বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সস্তান না হওয়া ও অবাধ্য হওয়া। অপরদিকে নারীরা বলেছেন, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, অন্য নারীর সাথে সর্ম্পক, মাদকাসক্তি।

ইদানিং ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ এই শব্দটি ভীষণরকমের এ্যাবিউজ শব্দ বলে মনে হয়। অনেকেই বলে থাকেন, নারীকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। নারীর ক্ষমতা নেই তাই তাকে এবার ক্ষমতা দিতে হবে। সত্যিকার অর্থে কোন ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেবার কিছু নেই। জন্মগতভাবে প্রতিটি মানুষ তার মৌলিক কিছু অধিকার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, মতামত দেয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে জন্মায়। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরাই লিঙ্গের ভিত্তিতে কম/বেশ করে ফেলি। আমি বিশ্বাস করি, ক্ষমতার যেই ৪টি ধরন, এর মধ্যে ব্যক্তির আত্মশক্তি ও নিজস্ব ক্ষমতা অনেক বেশি ক্ষমতায়নকে ফোকাস করে। যদিও আমাদের সমাজে ক্ষমতা বিষয়টিকে ”Power To” বা কর্তৃত্ব পরায়ন ক্ষমতার সাথে অনেক বেশি যুক্ত করা হয়। এই কর্তৃত্ব পরায়ণ ক্ষমতাকে মূল ক্ষমতা বলে মনে করা হয় বলেই, চলে আসে একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি।

এবার আসি শিক্ষিত ও চাকরিজীবী হবার বিষয়ে। গ্রাম বাংলায় একটি কথা বেশ প্রচলিত যেসব মেয়েরা পড়ালেখা করে ও চাকরি করে, সেসব মেয়েদের চোখ ফুটে যায় বেশি। তাদের নিয়ন্ত্রন করা কঠিন। আসলে বিষয়টি চোখ ফোটার না। একজন শিক্ষিত ও চাকরিজীবী নারী নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন হয়। যে অধিকারগুলো একজন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের থাকে। মেয়েটি নিজেকে মানুষ হিসেবে আইডেন্টিফাই করে। মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিতে চায়। নিজের মতামত প্রকাশ করতে চায়।

সমস্যাটা হয়ে যায়, বহুদিনের পুরুষতান্ত্রিকতার অনুশীলন পুরুষকে নিজের সহধর্মিনীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে বাধা দেয়। তাকে দেখে শুধুমাত্র ঘরের বউ হিসেবে। তখনই তালাকের কারণ হিসেবে চলে আসে অবাধ্য হওয়া অথবা নারীর বদমেজাজ। মেজাজ বা রাগ প্রকাশ তো পুরুষের ভূষণ, নারীর নয়। তাই পুরুষরা তার রাগ কমাতে নারীর উপর নির্যাতন করেন, যেটি আবার নারীর তালাকের অন্যতম কারন।
এই কর্তৃত্ব পরায়ণ ক্ষমতা যে সব সময় পুরুষ প্রদর্শণ করেন সেটি নয়। নারীরাও করেন। সংসার চালানোর দায়িত্ব শুধুমাত্র পুরুষের এই চিন্তা-ভাবনাও অনেক সময় পরিবারে দ্বন্দের সৃষ্টি করে। করোনার সময়ে একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি হিসেবে পুরুষের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ততা পারিবারিক অশান্তি বৃদ্ধি করে। বিষয়টি অনেকটা চক্রের মতো। যেই চক্রে নারী ও পুরুষ উভয়ই বন্দী।

লেখক: সানজিদা আহমেদ

এখন কথা হলো, এর সমাধান কী? নারীকে কম শিক্ষিত করে চাকরী ক্ষেত্রে না আনা কি সমাধান? না কী সংসারের মুখের দিকে তাকিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করা সমাধান? অথবা নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাববো না সেটি সমাধান?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আপনার পাশের ব্যক্তিকে নারী বা পুরুষ হিসেবে ভাবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবুন। তার নিজস্ব ইচ্ছা, পছন্দ, অপছন্দ, মতামত আছে সেটিকে শ্রদ্ধা করুন ও গুরুত্ব দিন। যাকে বিয়ে করে এনেছেন তার গায়ে হাত তোলা কোন পৌরুষের বিষয় নয়। একে অপরকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করুন। সে স্বামী তার স্ত্রীকে করুক, অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে।

নিজের মেয়েকে স্বাবলম্বী করে তোলার সাথে সাথে ছেলেকে সেই স্বাবলম্বী মেয়ের সাথে সংসার করার জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলুন। চুপ থাকা কোন সমাধান নয়। একে অপরের সাথে বসুন। কথা বলুন। মনের লুকানো ক্ষোভ, মান অভিমানের কথাই না হয় বলুন। প্রয়োজনের পারিবারিক কাউন্সিলিং এর সাহায্য নিন।
সম্পর্ক গড়া সহজ, ভেঙ্গে ফেলা এরচেয়েও বেশি সহজ। কঠিন হলো একে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর যত্ন দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

শেয়ার করুন:
  • 408
  •  
  •  
  •  
  •  
    408
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.