বরিশালের মনোরঞ্জন ব্যাপারী, এক চণ্ডালের দক্ষিণ এশিয়া জয়

মনিজা রহমান:

‘… আমার একটা ছোট বোন ছিল। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে আমাদের চোখের সামনে না খেতে পেরে ছটফট করে মরে গেল। পরনের কাপড় ছিল না বলে মা মশারী জড়িয়ে লুকিয়ে থাকতেন ঘরে। হোটেলে কাজ করেছি। থালাবাসন মেজেছি। রিকশা চালিয়েছি। এখন বাবুর্চির চাকরি করছি। প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ মানুষের রান্না করতে হয়! সেই আমার জীবনী ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে। অধ্যাপকরা আমার সঙ্গে কথা বলতে আসেন।’

কথাগুলো মনোরঞ্জন  ব্যাপারীর। বরিশালে জন্ম হলেও মাত্র তিন বছর বয়সে দেশত্যাগ করতে হয়েছিল তাঁকে। দেশভাগ হয়েছে পাঁচ-ছয় বছর আগে। পূর্ব বাংলা থেকে হাজারে হাজারে শরণার্থী তখনও পশ্চিম বাংলা আসছে, সালটা ১৯৫৩। এখন তিনি ভারতের নাগরিক। তাঁর লেখা ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন এই বইয়ের জন্য। দক্ষিণ এশিয়ান শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। অথচ কোনদিন স্কুলে যাননি তিনি।

কীভাবে পড়াশুনা শিখলেন? কীভাবে একজন চণ্ডাল, সমাজের নিচু তলার মানুষ হয়ে – ’মহৎ সাহিত্যিক’ এর তকমা পেলেন, তাই শোনাবো আজ।

বরিশাল থেকে প্রথমে আসেন তারা বাঁকুড়াতে। খেটে খাওয়া মানুষ ছিলেন মনোরঞ্জন ব্যাপারীর বাবা। জমি জায়গা নাই। টাকা পয়সা নাই। চলবেন কী করে? বাঁকুড়া জেলার শিরোমনিপুর রিফিউজি ক্যাম্পে যত মানুষ ছিল, রোজগারের তত সুবিধা ছিল না। পরে চব্বিশ পরগনা জেলার এক রিফিউজি ক্যাম্পে চলে যান তারা। কারণ ওখান থেকে কলকাতা কাছে ছিল। সেখানে গেলে দিনমজুরের কাজ করা যেত। মনোরঞ্জনের বাবা যাদবপুরে জনমজুরের কাজে আসতেন। ভোর চারটার সময় ট্রেনে চাপতেন। ছয়টা-সাতটার দিকে তিনি পৌঁছাতেন। যেদিন কাজ হতো, যে বাড়িতে কাজ করতেন, তাদের কাছ থেকে পঞ্চাশটা পয়সা চেয়ে নিতেন। সেটা দিয়ে পাউরুটি-আলুর দম খেতেন। যেদিন কাজ হতো না, সেদিন ওনার কিছু খাওয়াই হতো না। উনি যে বাড়ি ফিরে যাবেন, তাও পারতেন না। কারণ উনি এসেছেন বিনা টিকেটের ট্রেনে। সকালবেলা ট্রেনে চেকার থাকে না। কিন্তু দুপুরের ট্রেনে চেকার থাকে বিধায় উনি বিনা টিকেটে যেতে পারতেন না। অগত্যা স্টেশনে গামছা বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন। এভাবে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে থাকতে ওনার গ্যাস্ট্রিক আর আলসার হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে কাটা ছাগলের মতো শুয়ে পড়লেন। বাড়ির একমাত্র রোজগারক্ষম ব্যক্তি শুয়ে পড়লে সংসার চলে কীভাবে?

মনোরঞ্জনদের বাড়ির উনুন জ্বলা বন্ধ হয়ে গেল। তার এক পাঁচ-ছয় বছর বয়সী ছোট বোন না খেতে পেরে সবার চোখের সামনে ছটফট করে মরে গেল। মনোরঞ্জনের মায়ের লম্বা চুল ছিল। সেই চুল তেল আর সাবানের অভাবে জট পাকিয়ে গেল। তারপর গোড়া থেকে কেটে ফেলে দিতে হলো। পরার কাপড় ছিল না। সেই অনেকদিন আগে সরকারি ক্যাম্পে থাকার সময় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া শাড়ি ছিঁড়ে ত্যানা হয়ে গেছে। মশারী গায়ে জড়িয়ে ঘরের কোণে আত্মগোপন করে থাকতেন। দিনের বেলা ঘর থেকে বের হতেন না। তখন অনন্যোপায় হয়ে বালক মনোরঞ্জনকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে হলো গরু-ছাগল চড়ানোর জন্য। তারপর তাকে চায়ের দোকানে গ্লাস ধুতে হয়েছে। হোটেলে থালাবাসন মাজতে হয়েছে। পাউরুটি চুরি করেছেন। জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, গুয়াহাটি, লখনৌ, বেনারসে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন। বেগার খেটেছেন। তারপর আবার ফিরে গেছেন কলকাতায়। হোটেলে পেট পুরে খেয়ে দৌড়ে পালিয়েছেন। ক্ষিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

‘সবকিছুই স্বাভাবিক জীবনের পথকে অবরুদ্ধ করে দিয়েছিল।’ মনোরঞ্জন বেপারী বলেছেন,‘ একে তো দলিত সম্প্রদায়। সুন্দর নাম রাখতে পারবে না। ভালো জামাকাপড় পরতে পারবে না। পেট ভরে খেতে পারবো না। উচ্ছিষ্ট খেতে হবে। ধনসম্পদ করলে উচ্চবর্ণের মানুষের কেড়ে নেয়ার অধিকার শাস্ত্রে আছে। পরিকল্পিতভাবে একটা সম্প্রদায়কে নি:স্ব, নিরন্ন, বুভুক্ষু বানিয়ে রাখার চেষ্টা বহুকাল ধরে চলছে। এই জীবন এক সময় শেষ হয় লাশকাটা টেবিলে, কিংবা জেলখানার অন্ধকার কুঠুরিতে। লাশকাটা টেবিলে যাবার সম্ভাবনা অনেক ছিল। সারা শরীরে ছুরি চাকুর অসংখ্য দাগ আছে। কিন্তু প্রাণটা যায়নি।’

একসময় মনোরঞ্জন নিজেকে আবিস্কার করেন জেলের কুঠুরিতে। আগেও জেলে গেছেন তিনি। তবে সেবার ছিল দুই-একদিনের জন্য। কিন্তু এবার পুলিশ যে ধারায় তাকে আটক করলো, তাতে তার দশ বছরের জেল হলো। ওই সময়ে জেলের কুঠুরিতে তাঁর পরিচয় হলো এক বয়স্ক শিক্ষিত কয়েদীর সঙ্গে, যিনি চিটিংবাজি করে জেল খাটছেন দীর্ঘদিন। মনোরঞ্জন জানতেন, বোকারা খুন-ডাকাতি করে জেলে আসে, আর বুদ্ধিমানরা আসে চিটিংবাজি করে। মনোরঞ্জনের সরল চেহারা দেখে তার দশ বছরের জেল হয়েছে লোকটা মানতে পারেননি। তখন ওর কাগজ দেখতে চাইলেন। কিন্তু মনোরঞ্জন জানিয়েছিলেন, তিনি লেখাপড়া জানেন না। তখন লোকটা ওর দিকে বিশেষভাবে তাকালেন।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী বলেছিলেন- ‘ওই লোকের এক চোখে ছিল বুদ্ধের দয়া, আরেক চোখে দুর্বাসার ক্রোধ।’ দশ বছর জেল হবার জন্য কান্নারত অসহায় মনোরঞ্জনকে দেখে লোকটা বলেছিল, ‘কাঁদছিস কেন? বাইরে তোর খাওয়া জুটতো না। এখানে জেলখানায় তিনবেলা খাওয়া পাবি। বাইরে রোদে পুড়তি, বৃষ্টিতে ভিজতি, শীতে কাঁপতি- এখানে থাকার জন্য জায়গা পাবি। শোয়ার জন্য কম্বল পাবি। পাকা ছাদ পাবি। অসুখ হলে ওষুধ পাবি। বাইরে তো সেটা পাবি না। আমাদের মতো দলিত-দু:স্থদের জন্য মহামান্য সরকারের এটা একটা দান। বাইরে খেতে পাচ্ছ না। জেলে চলে যাও।’

ওই বয়স্ক লোকটাই প্রথম মনোরঞ্জনের জীবনের মোড় ঘুরাতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি হতদরিদ্র চণ্ডালকে লেখাপড়া শেখানোর উদ্যোগ নেন। জেলখানার উঠান হলো স্লেট, আর গাছের ভাঙ্গা সরু ডাল তার পেন্সিল। এভাবে দিয়ে অ আ ক খ লিখে শুরু হলো তাঁর হাতেখড়ি । তিনি মনোরঞ্জনকে বলেন, ‘পড়াশুনা জানলে তুই রাইটার হতে পারবি। আসামীদের খাতায় নাম ধরে ডাকার আরামের চাকরি পাবি। নয়তো ভারী ভারী জিনিষ বয়ে জীবন কাটাতে হবে।’ ছাত্র-শিক্ষকের আগ্রহ দেখে জেলার বইখাতা এনে দিলেন। প্রথম যে বইটা যুক্তাক্ষরসহ জেলখানায় মনোরঞ্জন পড়েছিলেন, তার নাম- নিশিকুটুম্ব।

ছাব্বিশ মাস পরে জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আগের মতো বোমা-চাকু নয়, মনোরঞ্জনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হলো বই। রিক্সা চালাতেন আর সময় পেলেই বই পড়তেন। একটা শব্দের মানে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শব্দটি ছিল-জিজীবিষা। একদিন তাঁর রিক্সায় এক সওয়ারী উঠলেন। দেখে মনে হলো অধ্যাপিকা হবেন। রিক্সাচালক মনোরঞ্জন তাঁকে ‘জিজিবীষা’ শব্দের অর্থ জানতে চাইলেন। উনি অবাক হয়ে মনোরঞ্জনের কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই শব্দটা তুমি পেলে কোত্থেকে? তোমার পড়াশুনা কতদূর?’ উত্তরে মনোরঞ্জন বলেছিলেন- তিনি কোনদিন স্কুলেই যাননি। বই থেকে নামটা জেনেছেন। ‘কী কী বই পড়েছো?’ তখন মনোরঞ্জন দশ-বারোটা বইয়ের নাম বললেন। ওই বইয়ের মধ্যে চার-পাঁচটা বই ছিল রিক্সা আরোহীর লেখা। পরে মনোরঞ্জন জানলেন- তিনি ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

জেলখানার সেই বয়স্ক কয়েদীর পরে দ্বিতীয়বার মনোরঞ্জন ব্যাপারীর জীবনের মোড় ঘোরাতে সাহায্য করলেন বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। উনি ওনার সম্পাদিত ‘বর্তিকা’ নামে একটি পত্রিকায় লিখতে বললেন মনোরঞ্জনকে। প্রথম লেখার রিভিউ ছাপা হলো যুগান্তর পত্রিকায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা দেখা করতে এলেন। তখন মনোরঞ্জনের মনে হয়েছিল, ‘একটা ঘৃণিত জীবন। কুকুর বেড়ালের মতো রাস্তায় শুয়ে থাকি। গরু-ঘোড়ার মতো রিক্সা টানি সারাদিন। সেই মানুষের একটা লেখাতেই যদি এতো আলোচনা হয়, তবে দশটা লেখাতে না জানি কী হবে!’

এভাবে দলিত সমাজের প্রতিনিধি মনোরঞ্জন ব্যাপারীর লেখক জীবন শুরু। আজ তিনি পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক। তাঁর আত্মজীবনী হাজারে হাজারে বিক্রি হচ্ছে, বইয়ের নাম ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ‘দ্যা হিন্দু’র সেরা লেখক বলে বিবেচিত হয় তাঁর নাম। দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের সবচেয়ে ওজনদার পুরস্কার ডিএসসি প্রাইজের ২০১৯ সালের তালিকায় যে পনেরটি উপন্যাস স্থান পেয়েছে তারমধ্যে আছে তাঁর উপন্যাসও- ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’। কিন্তু এখনও তাঁর জীবন আর পাঁচজন সাহিত্যিকের মতো না। একটি মূক ও বধির স্কুলের হোস্টেলের রাঁধুনি তিনি। দু’বেলা ১৫০ জন করে মোট ৩০০ জনের রান্না করেন, বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। তাঁর লেখা নিয়ে কেউ প্রশংসা করলে মনোরঞ্জন বলেন, ‘সুন্দর লিখতে আসিনি। এসেছি ভেতরের কষ্টের কথা বলতে, জাতপাতের বেড়াজাল ছিন্ন করতে।’

মনিজা রহমান, লেখক

মনোরঞ্জন ব্যাপারী লেখোয়াড় পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তিনি এসেছেন পিছিয়ে পড়া দলিত শ্রেণীর মানুষের লড়াইয়ের বার্তা দিতে, তাদের অধিকারের বার্তা দিতে। বিমানে চড়ুন আর ট্রেনেই চড়ুন, তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী গামছা। তাঁর কথায় তিনি সঙ্গে গামছা রাখেন, তাঁর শিকড়কে মনে রাখার জন্য। গামছা ঘাম-রক্ত মোছে, গামছা অনেকের বিছানা, অনেকের শীতবস্ত্র, গামছা অনেকের কাছে ছাতা, গামছা সব লড়াইয়ের সাক্ষী।

মনোরঞ্জন ব্যাপারীর কথা পড়লে বরিশালের আরেকজন হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া স্বশিক্ষিত, মুক্তচিন্তার মানুষকে স্মরণ হয়, তিনি হলেন- আরজ আলী মাতুব্বর। আবার জেলখানায় লেখাপড়া শেখার ঘটনা ফ্রেডরিক ডগলাসকে কিংবা ম্যালকম এক্সের কথা মনে করায়। কিংবা বয়স্ক বন্দী শিক্ষককে মনে করিয়ে দেয় আলেকজান্ডার দুমা’র বিখ্যাত উপন্যাস কাউন্ট মন্টিক্রিস্টোর সেই জেলখানার কয়েদীর কথা। আর মহাশ্বেতা দেবী, তিনি তো এক স্বয়ং আলোক বর্তিকা- জানা নেই মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মতো আর কত মানুষের জীবনকে আলোকিত করেছেন। আমরা ভাবি- মহৎ চরিত্ররা বুঝি উপন্যাসের পাতায় কিংবা সিনেমার কাহিনীতে বাস করে, কিন্তু মনোরঞ্জন ব্যাপারী জানিয়ে দেয়- তারা যে কোন অবস্থা থেকে উঠে আসতে পারেন।

শেয়ার করুন:
  • 241
  •  
  •  
  •  
  •  
    241
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.