মায়েদের আর্তনাদ শুনি কেবল

সুপ্রীতি ধর:

বিদেশ-বিভুঁইয়ে নিজের লড়াই তো চলেই সবসময়। তার চেয়েও বেশি লড়াই হয় নিজের অক্ষমতার বিরুদ্ধে। প্রতিদিন কত কত মেয়ে যে একটুখানি সহায়তা চেয়ে, খানিক প্রশ্রয়ের আশায়, নিজের ভিতরের ক্ষরণ একটুখানি হলেও লাঘব করতে ইনবক্সে মেসেজ পাঠায়, তার ইয়ত্তা নেই।

মেয়েগুলো যে কতরকম সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়! কাউকে মেরে-কেটে স্বামীর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, যৌতুকের দাবিতে অত্যাচার চলছে, স্বামী পরকীয়া করছে, ডিভোর্স দিচ্ছে না। সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটার কথা শুনি, তাহলো, বাচ্চা রেখে দিয়েছে স্বামী। মাকে দেখা করতে দিচ্ছে না সন্তানের সাথে। যখন সন্তানের দাবি জানাচ্ছে মেয়েটি, তখন তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এমনকি আইন ও সালিশ কেন্দ্রে গিয়েও কোন সুরাহা হচ্ছে না। স্বামীকে সেখানে ডাকা হলে সময়মতোন তো হাজির হচ্ছেই না সেই পুরুষটি, মাসখানেক পর উপস্থিত হয়ে বলে আসছে, ‘আপনাদের যা খুশি করুন, বাচ্চা আমি দেবো না’। মেয়েটি তার বাচ্চার সাথে দেখা করতে চাইলে পুরোপুরিই অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এক্ষেত্রে মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়ে আমার দ্বারস্থ হয়। বলে, ‘আপু, আমি আমার বাচ্চাটাকে একটিবার চাই শুধু, আমি যে মা’। আমার চোখ ধরে আসে। কাছে থাকলে বুকে জড়িয়ে ধরতাম। তাই মনটা পেতে দিই ওই মায়ের জলটুকু শুষে নেয়ার জন্য। কথা বলতে বলতে একসময় সে একটু থিতু হয়, আমি সেই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকি।

এই মায়ের কষ্ট লাঘবের কোন ক্ষমতা এই অধমের নেই। থাকিও দেশের বাইরে। এই অবাধ্য সময়ে একটুখানি মানসিক আশ্রয়ই যে কতখানি একটা মেয়ের জন্য তা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে না গেছে, সে কোনদিন জানবে না। এই সময়টাতে একজন ভুক্তভোগী খড়কুটো হাতড়ে বেড়ায়, যাকে পায় তাকেই সে অবলম্বন করে জাস্ট বেঁচে থাকতে চায়। এই অবলম্বনটাই অনেক বেশি প্রয়োজন এখন।

আমি হয়তো কেবলই কথা বলতে পারি, সান্ত্বনা দিতে পারি। বলতে পারি, এখন একটু ঘুমাও। একটা ফ্রেশ ঘুম দিয়ে উঠে নতুন করে ভাবো। আর কী বলতে পারি! দেশে কি আইন নেই? নারী সংগঠনগুলো কি কাজ করছে না আর? করছে অবশ্যই। হয়তো এরকম ভুক্তভোগীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সমাজে, সেই হারে তো সংগঠন বা এর আওতা বাড়ছে না। ফলে তারাও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।

এখন প্রতিপক্ষ মনে হয় আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালি। হয় তাদের পরিবার প্রভাবশালী, মামা-কাকা-ভাইরা ক্ষমতার কাছাকাছি আছে, কাজেই তারা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে শিশু সন্তান আর নারীর জীবন নিয়ে দিব্যি ছিনিমিনি খেলতে পারে। অস্বীকার করবো না, অনেক পুরুষও নারীর এমন ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হচ্ছে। তাদের জীবনও তছনছ হয়ে যাচ্ছে কেবলমাত্র ওই ক্ষমতার মোকাবিলা করতে গিয়েই। আমি চিনি এমন কিছু পুরুষকেও, যারা সন্তানের সাথে দেখা করতে পারছে না, দেয়া হচ্ছে না তাদের এই সুযোগ। কিন্তু এই সংখ্যাটা হাতেগোণা। ব্যতিক্রম নিয়ম নয়।

আমার চেনা এক মা, যে তার ছেলে সন্তান নিয়ে হাঁসফাঁস করছে একাকি জীবনে, হিন্দু বলে ডিভোর্সও পাচ্ছে না, স্বামীর বাড়িতে তো জায়গা হয়ইনি, উপরন্তু স্বামী তার প্রেমিকাদের নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজে। কেউ একটিবারও ওই পুরুষটিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে না তার অপরাধটি। এভাবেই সবাই মেনে নেয় বলেই ওই পুরুষগুলোর বাড় বাড়ে। তারা আরও বড় অপরাধ করতেও তখন পিছপা হয় না। ডিভোর্সও পেল না মেয়েটি, সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে পড়ে আছে, স্বামী অন্যের বাহুলগ্না হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কতটা অসহনীয় এই পরিস্থিতি, ভাবা যায়? কিন্তু মেয়েটি তা করছে, একমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েই। আমি জানি না ওর এই আত্মোৎসর্গের প্রতিদান কী হবে? আদৌ হবে কিনা!

আর ওই যে মেয়েটি, যাকে শাশুড়ি, চাচা শ্বশুর মিলে মারধর করে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল, স্বামীও টুঁ শব্দটি করলো না, দুর্ভাগ্যক্রমে এই মেয়েটিও হিন্দু পরিবারের। দরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তান এমনিতেই। তার ওপর কপালে লেখা হয়ে গেছে ‘স্বামী বিতাড়িত’ শব্দ। মেয়েটি আমাকে বলে, আমি কি কোন সাহায্য পাবো না?

কী বলবো মেয়েটিকে? আমরা তো বলি, মেয়ে, তুমি ঘুরে দাঁড়াও, বেরিয়ে আসো। কিন্তু কোথায় বেরিয়ে আসবে? কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? সেটা কি বলি? নাকি পথ দেখাই?

যে মেয়েটিকে একজন নামকরা নারীবাদী পুরুষ গোপনে বিয়ে করলো স্ত্রী-সন্তান বর্তমান থাকতেই, কিছুদিন পর আবার জেন্ডার স্পেশালিস্ট স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে দেনমোহর শোধ করে ডিভোর্সও দিয়ে দিল, সেই মেয়েটির তো ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেল মানসিক ও সামাজিকভাবে। পুরুষটির কিছুই হয়নি। গোপনে বিয়ে করেছিল, গোপনেই ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। কাহিনী শেষ, ঝামেলা বের করে দিয়েছে। মাঝে থেকে দু’দুজন নারীর সাথে প্রতারণা করেও বেশ দিব্যি আছে সমাজে। আমরা তাকে কিছুই বলছি না। সে আমাদের বন্ধু তালিকাতেও শোভা পাচ্ছে। বরং মেয়েটিকে বলছি ঘুরে দাঁড়াতে। কী হিপোক্র্যাট আমরা!

এই আমাদের অনেকেই ‘মিটু’ আন্দোলনের অভিযুক্তদের কোলঘেঁষা হয়ে চলছি, তাদের সাথে কারও কারও দহরম-মহরম দেখে তো মনেই হয় না যে এ কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি! বেশ আছে তারা তারা মিলে। মেয়েগুলোর শুধু কষ্ট হয়। ওরা মুখ খুলেছিল, আমরা তাদের চুপ করিয়ে দিয়েছি আমাদের ভয়াবহ সেক্সিস্ট আচরণ দিয়ে। ভুলে গেছি, আমাদের ঘরেও মেয়েরা বড় হচ্ছে। কেউ জানি না তাদের জীবনে কী ঘটবে ভবিষ্যতে!

কী অসম্ভব একটা ক্ষরণ চলছে সমাজে। প্রতিটা সিস্টেম যখন এমন ঘূণপোকায় খেয়ে ফেলে, তখন রাষ্ট্রের নাগরিকের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা সেই মহাপতনের মুখে বসে আছি। নারী মনের এই আর্তনাদ কখনও যদি অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় সত্যি সত্যি, সেদিন কে কার আগে মুখ থুবড়ে পড়বে, জানি না। শুধুমাত্র ধারণাটুকু করতে পারি।

শেয়ার করুন:
  • 333
  •  
  •  
  •  
  •  
    333
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.