বিবাহ বিচ্ছেদে স্বত:স্ফূর্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নারী

সালমা লুনা:

দিনে প্রায় ৪০ টি ডিভোর্স। ডিভোর্সের হার ৩০% বেড়েছে। কিংবা সিলেটে ১০ গুণ বেড়েছে ডিভোর্স।
এই ভয়াবহ তথ্যগুলো চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে পুরুষ কী কারণে নারীকে ডিভোর্স দিচ্ছে সেই কারণের তালগোলে। মহামারীকালে ডিভোর্সের হার আশংকাজনক এবং শিক্ষিত চাকরিজীবী নারী-পুরুষের মধ্যে ডিভোর্স বেশি হচ্ছে এসব ভয়াবহ তথ্য।

দোষ কার, কেন হচ্ছে এসব তো খতিয়ে দেখবেনই সমাজবিজ্ঞানীরা।
কিন্তু এসব ছাপিয়ে একটা বিষয় কি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না? ২৫টি ডিভোর্স কেসের ১৯ টি ই ফাইল করেছে নারী। অর্থাৎ নারী এই সমাজের সাথে ফাইট করতে, পুরুষের বিরুদ্ধে, স্বামীর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করছে। বিয়ের মতো একটা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।

বাংলাদেশে কোন পরিবারে যখন একটি মেয়ে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাকে কার সাথে কতভাবে লড়াইটা করতে হয় এটা জানে সে আর তার পরিবার। কতভাবে তাকে জবাবদিহি করতে হয় প্রতি মুহূর্তে যে সে এতোবড় একটা সিদ্ধান্ত কেন নিচ্ছে। এবং এসব করতে করতেই পৃথিবীতেই তার একরকম নরকবাস হয়ে যায়।
তারপরও সে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সিদ্ধান্ত নিচ্ছে স্বামী গায়ে হাত তোলে, অর্থাৎ বদমেজাজী বলে, মাদকাসক্ত, শারীরিক সম্পর্কে অক্ষম বলে।
এসব সহজ নয় একবারেই।

পুরুষ তার স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছে সে বদমেজাজি বলে, কিংবা সংসারে উদাসীন বলে, বাচ্চা হয় না বলে। এসব কারণে তো নারীও তালাক দিতে পারে।
নারীর তালাকে এসব কেন কারণ হবে না?
নারীও তো এসব কারণে তালাক দিতেই পারে পুরুষকে!
দিতে পারাই উচিতকর্ম।
তখন যদি পুরুষরা বলে এসব কোন কারণ নয়, ধোপে টিকবে?
তখন বিপরীতে দাঁড়িয়ে নারীরা কি বলতে পারবে, তালাকের জন্য এসব কোন কারণ নয় কেন ?
পুরুষের সন্তানের আকাঙ্খা থাকলে নারীর সন্তানাকাঙ্ক্ষা থাকতে নেই?
পুরুষের শারীরিক ত্রুটির জন্য যদি সন্তানধারণে অক্ষম হয়, আর নারী সন্তান ধারণ করতেই না পারে, তবু সে বাধ্য ওই পুরুষের সাথে ঘর করতে? না হোক সন্তান, না হতে পারুক সে মা। তবু তাকে কেন স্যাক্রিফাইস করতেই হবে?

স্ত্রীর বিরুদ্ধে উদাসীনতার যে অভিযোগ পুরুষ করেছে, এই একই অভিযোগে বহু নারীও ডিভোর্স চায়, আমার জানামতে।
এমনকি গ্রামেও। স্বামীর ঘর থেকে বাপের বাড়ি চলে আসা নারীকে অবলীলায় বলতে শুনেছি, ‘ব্যাডায় বাদাইম্মা। সংসার করে না। হের লাইগ্যা আয়া পড়ছি।’
গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে আসা অনেক নারীই বলেছেন, ‘হেরে আমার পালন লাগে পালমু। কিন্তু হে বাইচ্চাডিরেও দেহে না! এর লাইগ্যা ছাড়ান দিছি। জামাইয়ের দরকার নাই।’

শহুরে শিক্ষিত কর্মজীবী নারীরা কেন এই অভিযোগে তালাক দেন না সেটি আমার বোধগম্য নয়। দিলে সেটিও কারণ হতো নিশ্চয়ই। এবং হলে নিশ্চয়ই নারীদের সাধুবাদই পেতো।

আর অবাধ্যতা!
পুরুষ তো চিরকালের অবাধ্য। তার সেই অবাধ্যতা নারী কেন মেনে নেয়?
আজ নারী যদি পুরুষের অবাধ্যতার প্রতিবাদটুকু করতে পারে তবে নারীর অবাধ্যতার প্রতিবাদটুকুও পুরুষকে করতে দিতে হবে। এটি সমতার প্রশ্ন।

তাই পুরুষ নারীর উদাসীনতাকে, অবাধ্যতাকে, সন্তান ধারণে অক্ষমতাকে তালাকের কার্যকারণ করলে নারীকেও তাই করতে হবে বৈকি। অভিযোগের গলা তুলতে হবে।

নারীর অভিযোগগুলো গুরুতর সন্দেহ নাই। কারণ গুরুতর কিছু না ঘটলে নারী তালাক চায় না।
বহু নারী বদমেজাজি পুরুষের ঘর করে হাসিমুখে। বহু নারী স্বামীর মাদকের পয়সা যুগিয়ে সন্তান নিয়ে মুখ বুজে সংসার করে। স্বামীর চাহিদামত যৌতুকের জন্য নিজের বাপভাইকে চাপ দিয়ে টাকা এনে দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখতে চায় বহু নারী। অবাধ্য, উদাসীন, পরনারী গমণকারী স্বামীর গুণপনা কে গুপ্ত রেখে সুখের পশরা সাজায়, টাকাপয়সা গয়নাগাটি দিয়ে নিজেকে যতটা ভোলায়, তারচেয়ে বেশি ভোলায় সমাজ সংসারকে। এসবই চোখে দেখা বাস্তবতা।
এর মধ্যেও যখন খবরে প্রকাশ পায় ২৫ টি ডিভোর্স কেসের ১৯ টিই দায়ের করেছে নারী, তখন সত্যি বলতে আমি আর কিছু দেখি না।
শুধু দেখি, নারী সিদ্ধান্ত নিতে শিখছে।

শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.