নিষিদ্ধ সুগন্ধী

কাজী দিলরুবা রহমান:

পাঁচতারা হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করছে শাওন। একজনের সাথে ইন্টারভিউ আছে। কিছুটা নার্ভাসও লাগছে। পরিচয়টা ঘটেছিল আজগরের মাধ্যমে।আজগর শাওনের ইউনিভার্সিটির বন্ধু। ঠিক বন্ধু বলা যাবে না। ইকনমিক্স ডিপার্মেন্টের ছাত্র ছিল। ছাত্রসংগঠন করতে গিয়ে পরিচয়। হোস্টেলে থাকতে গেলে এরকম এক আধটু রাজনীতিতে জড়াতেই হয়, তার উপর আবার জার্নালিজমের ছাত্র। তবে খুব বেশি যে কথাবার্তা কিম্বা অন্তরঙ্গতা ছিল তা নয়। রাজনীতিতে একই আদর্শের ছিল তাই টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, যে কোন ছাত্র আন্দোলন, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দেখা হতো, কথা হতো এই আর কী। কর্মজীবনে এসে সেটা কিছুটা হলেও ঘন হয়েছে বলা যায়। যদিও দুইজন দুই মেরুর মানুষ এখন। কিন্তু শাওনের কাজটা এমনই যে যত ভিন্ন প্রান্তের হয় তার কাছে শাওনের কাজ ততই গুরুত্বের মনে হয়।

কিরে কতক্ষণ?
এই তো এক ঘন্টা হবে!
মাইন্ড করিস না দোস্ত। বুঝতেই তো পারিস ফ্যাক্টরি, অফিস, বন্ধু- বান্ধব, রাজনীতি এসব নিয়ে কত ব্যস্ত থাকি।
না না মাইন্ড করবো কেন? আমাদের কাজটাই এরকম।
অপেক্ষা আর অপেক্ষা।

তারপর…, তোর সেই মাল কোথায়।
কথা সাবধানে, ওটা এখন আমার প্রপার্টি। আমি ওকে বউ বলে ডাকি।
বিয়ে না করেই?
আবার বিয়ে? এটাই ওর জন্য অনেক।
কেন? দেখে তো সেদিন বেশ ভদ্র আর স্মার্ট বলেই মনে হলো।
সেজন্যই তো ও এখন কেবল আমার প্রপার্টি।
ওর কথা কাগজে ছাপা হবে কিন্তু!
তাতে কি, আমার কথা গোপন রাখবি। অথবা ছদ্ম নাম ব্যবহার করবি।
তুই রাজি হলি কেন? তুই তো শুতে চাসনি, নিউজ কভার করতে চেয়েছিস শুধু।
তাতে কিছু যায় আসে না?
আজগরের ঠোঁটের কোণে এক ধরনের হাসি দেখতে পায় শাওন। সেটা বিদ্রুপের, করুণার নাকি অনুশোচনার কিছুই বোঝা যায় না। নিহারিকা সুলতানের কতো নাম্বার
বাদি সেটাও জানা নেই শাওনের। এটা নিহারিকার কত নাম্বার নাম কে জানে।

হ্যালো!
হাই!
হার্ট বিট বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় শাওনের।
বসুন, আড় চোখে পুরো শরীরটাকে একবার দেখে নেয় যেন মস্তিস্কের সিটি স্ক্যান হচ্ছে। সবই তো ঠিক আছে। তারপরও কোথাও কিছু অন্যরকম মনে হয়। খুব
একটা পাতলাও নয় আবার মোটাও না। এটুকুন আজগর নিজের প্রয়োজনে করে নিয়েছে। হ্যাঁ চোখের সানগ্লাস, লিপিষ্টিকের চড়া রং আর চোখে অতিরিক্ত
কাজলের বাড়াবাড়ি কিছু বলছে। তবে সেটা সবার বোঝার কথা নয়। একবার দুবার শাওনের জীবনেও এ রকমের মেয়ে এসেছিল। তারুণ্যের চরম উম্মাদনার মূহুর্ত
ছিল তখন। হোস্টেলে থাকার সময়ের কথা, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আর কী। তারপর থেকে শুধরে নিয়েছে নিজেকে।

বসুন।

পাশের চেয়ারে মেয়েটিকে বসতে বলে।
খুব সাবলীল আচরণ নিহারিকার। ঠিক যেন নিহারিকা।
নামটি কার দেয়া?
আপনার বন্ধুর।
সে লোক কেমন?
অনেক ভালো।
কীভাবে বুঝলেন?
সে আমাকে অনেকটাই স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে।
লেখাপড়া কত দূর।
এইট পর্যন্ত। এখন অবশ্য বিএ পাশও আমার সাথে পারবে না।
কীভাবে?

সবই আপনার বন্ধুর চেষ্টায়, তার সাথে দেশে-বিদেশে ঘোরাঘুরি করতে হয়। অনেক সময় আমার ফ্ল্যাটে বন্ধু- বান্ধন নিয়ে আসে আড্ডা দেয়, তাদের বান্ধবী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার তো একটা সম্মান আছে? সেইজন্য আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছে।
আপনার এ জীবন ভালো লাগে?
ঠিক বুঝতে পারি না। কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ।
আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা হোটেল রুমে গিয়ে কথা বলতে পারি।
হ্যাঁ, যাওয়া যাক।
নিহারিকার সাদা ধবধবে হাতে গৃহিনী বধুর মতো কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দের সাথে বোতল থেকে গ্লাসে ভদকা ঢালার শব্দ মিশে একাকার। আমার দিকে এগোতেই
আমি ইশারায় ‘না’ বললাম। কিছুক্ষণ নিরবতা। অপেক্ষায় ছিলাম নিজ থেকে বলুক।

ব্যবসা ছিল বাবার। চালের আড়ত, খাওয়া-পড়া, কোনটারই কোন অভাব ছিল না।
তাহলে? ছোটবেলায় খুব নাদুস -নুদুস ছিলাম। গায়ের রং দুধে -আলতা। তিন -চার বছর বয়স হবে তখন। সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে মেতে থাকতাম খেলাধুলায়, বনে – বাদারে ঘুরে ঘুরে তেতুল, বড়ই, ডাউয়া ফল, গাব গাছে চরে পাকা গাফ ফল পেরে খাওয়া, টাকিটুকি ফল, বেদানা, আতা, ডুমুর সন্ধান করে বেড়াতাম একদল ছেলেমেয়ে মিলে। আমিই সবার থেকে ছোট ছিলাম। এসব কর্মযজ্ঞের ভেতর কেটে যেতো সারাদিন।মা ব্যস্ত রান্না-বান্না, মেহমানদারী এসব নিয়ে। সেদিন ভর দুপুরে দলে যারা বড় ছিল কেন ঠিক জানি না নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বলাবলি করছিল। কিছু পরেই হই হই করে ছুটলো জঙ্গলের ভেতর গাবগাছের দিকে, আমি পিছে পিছে ছুটলাম। লাফাতে লাফাতে যে যার মতো করে উঠে পড়লো গাছে, একা আমিই নিচে পড়ে রইলাম। ওরা উপর থেকে ভূতের ভয় দেখাতে থাকে।

ভীষণ ভয় পেয়ে যাই, কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াতে থাকি। মাঝে পথ হারিয়ে ফেলে আরও জোরে জোরে কাঁদি। হঠাৎ পাশের বাড়ির বাচ্চু চাচারে দেখি গরুরে ঘাস খাওয়াচ্ছে, এতোক্ষণে প্রাণে পানি আসে। চাচা আমারে কোলে নিয়া জঙ্গলের আরও ভেতরে নিয়া যায়। চোখের পানি তার লুঙ্গি দিয়ে মুছে দেয়, আস্তে আস্তে আমার প্যান্টির ভেতরে হাত দেয় তারপর যা হয়েছিল আমি কিছুই বুঝতে পারিনি, কিন্তু আমার রক্তক্ষরণ হয়েছিল, আর ভীষণ ব্যথা পেয়েছিলাম। মা গোসল করাতে গিয়ে প্যান্টে রক্ত দেখে প্রশ্ন করে জানতে চায় কী হয়েছিল। আমি সব কিছু বলি তাকে। মা বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকায়। আমার তখন মনে হয়েছিল এসবের জন্য আমিই দায়ী। এরপর ঐ চাচাকে দেখলেই লুকাতাম।

তখন ক্লাশ সিক্সে পড়ি, পাশের বাড়িতে একটি ছেলে ছিল যাকে সবাই ভয় পেতো। তার কাছ থেকে বাড়ির মেয়ে-বউদের আড়াল করে রাখতে হতো। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে নির্জন রাস্তায় একা পেয়ে আমার পথরোধ করে। আমি চিৎকার করার ভয় দেখালে আমাকেই ভয় দেখায় এটা বলে ছোটবেলায় বাচ্চু চাচার সাথে তোর যা কিছু হয়েছে, সব সবাইকে বলে দিবো। বাচ্চু চাচা আরও কয়েকবার একই ভয় দেখিয়ে আমাকে ব্যবহার করেছিল। এবার লোকলজ্জার ভয় আরও বেশি করে জাপটে ধরে। তাছাড়া মাও বলেছিল, এ ব্যাপারে কেউ যেন কিছু জানতে না পারে, এমনকি বাবাও না। পরে বুঝতে পারি বাবাকে কেন জানাতে চায়নি মা। বাবা হয় তো মাকেই বকা- ঝকা করে বলতো, ‘ তুমি কেন দেখে রাখতে পারোনি?’ সব দোষ তোমার। ঐ বাজে লোকটাকে হয়তো কিছুই বলতো না।

একইভাবে সুরুজ যতবার যেখানে যেতে বলতো, আমি যেতাম। ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। একদিন আর সহ্য করতে না পেরে মাকে সব খুলে বলি। মা বাবার সাথে আলাপ করে। সেই থেকে আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি বাবাও কথা বলা বন্ধ করে দেয়। মা আমাকে ঘরের কাজ- বাজে লাগিয়ে দেন।

বাসায় ছোট ভাইবোনদের পড়াতে আসতো একজন শিক্ষক, মাঝে মাঝে তাকে চা-নাস্তা দিতে পাঠাতেন মা। চারপাশের বিরূপ ব্যবহার, তাছাড়া স্কুলে যেতে না পারার নিদারুণ সব যন্ত্রণা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল তখন। ছোট ভাইবোনদের পড়তে দেখে আমারও পড়তে ইচ্ছে করতো। কিন্তু আমি জানি মা আমাকে পড়তে দিবেন না। মা হয়তো চায়, কিন্তু বাবা চায় না। মাঝে মাঝে মা যখন ঘরের বাইরে নানা কাজে ব্যস্ত থাকতো আমি তখন একটি বই নিয়ে ঐ শিক্ষকের কাছে পড়তে চাইতাম। তাকে বেশ ভালো বলেই মনে হতো। আমার দিকে কখনো চোখ তুলে তাকায়নি। কয়েক মাস এভাবেই কাটে।
মনে হলো কোথাও একটু নিঃশ্বাস নেয়ার মতো জায়গা পেলাম। স্যারের আমাকে মনোযোগ দিয়ে পড়াতে দেখে বুঝতে পারি যে উনি আমার মঙ্গল চান। তিনি কখনও আমার কোন ক্ষতি করতে পারেন না। নিজের অজান্তেই সব আপন জায়গাগুলো হারিয়ে স্যারকে একমাত্র আপন বলে মনে হতে লাগলো। হাত ধরে একদিন স্যার তার মনের কথাটি আমাকে জানান, আমিও আমার মনের কথাটি তাকে বলি। এভাবেই দেখা হয়, কথা হয়। খুব দ্রুত সময় কেটে যায়। স্যার চাকরি নিয়ে শহরে চলে যায়। কিছুদিন পর আর যোগাযোগ হয় না। আমি খুঁজতে খুঁজতে শহরে আসি।
খুঁজেও পাই, কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দেন, কারণ ততদিনে সুরুজ পৌঁছে যায় তার কাছে। আর চাচার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বলে দেয় স্যারকে।

বিতাড়িত আমি কী করবো ভেবে পাই না, কোথায় যাবো কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। বাড়িতে ফেরাও সম্ভব না। একটি সস্তা মানের হোটেলে কক্ষ ভাড়া নেই এক রাতের জন্য, ভেবেছিলাম গার্মেন্টেস এ চাকরি নেবো। সেদিনই ঘটেছিল আমার জীবনের চরম বিপর্যয়, রাতেই আমার কক্ষে হোটেলের লোকজনের যোগসাজশে একজন পুরুষ ঢুকে। আস্তে আস্তে বুঝতে পারি আমি অন্য এক জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। ওরা আমাকে নজরে নজরে রাখতো। কয়েকবার পালাবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওদের লোকজন ধরে এনেছে। তাছাড়া আমাকে যে মেয়েদের দলে রাখা হয়েছিল সে দলের দলনেত্রী বুঝিয়ে ছিল এই বলে যে ‘তুই এখান থেকে পালিয়ে গিয়েও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবি না, কারণ আমাদের লোক তোকে সবসময় অনুসরণ করবে।
বিয়ে কিম্বা চাকরি যেখনেই যাস না কেন ওরা তোর আসল কাহিনী বলে দিবে সবাইকে। তার চেয়ে মেনেনে এটাই তোর জীবন, সেই থেকে এভাবেই কেটে যাচ্ছে।

– আর কী অভিজ্ঞতা আছে আপনার জীবনের?
এই যে যার কথা বললাম খুব ভালো, সেটা মিথ্যে, কারণ সেটা বলতে হয়। তা নাহলে আপনিও হয়তো আমাকে ব্যবহার করতে চাইবেন। উনি একা নন, উনার বন্ধুদের কাছে মাঝে মাঝে আমাকে রাত যাপন করতে হয়। তাইতো বউ থাকার পরও আমাদের মতো নকল বউয়ের প্রয়োজন হয়। জানেন তো অনেকেই ইন্টারভিউ নিতে আসে তাদেরকে অল্প কথায় সেরে দেই। কিন্তু আপনাকে কেন যেন সব কথা খুলে বলতে ইচ্ছে হলো, তাই বললাম।
এই পুরুষ সমাজই আমাদের এই পথে আনে, আবার এরাই ঘৃণা করে। তাই কাউকেই শুভাকাঙ্খী ভাবতে পারি না। ওরা মেয়েদের মানুষ ভাবে না। কেউ কেউ হয়তো একটু ভালো ব্যবহার করে, কিন্তু পরক্ষণেই তাদের চোখেও ঘৃণাই ফুটে উঠে। অথচ তাদেরই শরীরের সাথে আমাদের শরীর মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। অথচ এসব পুরুষদের কেউ ঘৃণা করে না, ঘৃণা সব আমাদের জন্য।

আপনি স্বাভাবিক জীবন পেলে ফিরে যাবেন?
-না।
কেন?
-যাদের কাছে যাবো তাদের আমি চিনে ফেলবো। তখন তাদেরকেও ঘৃণা করবো।
-তবু তো স্ত্রীর মর্যাদা পাবেন।
-ওদের স্ত্রীরা ওদেরকে নিয়ে যতটা গর্বিত বোধ করে, ওরা সেটা উপভোগ করে। কারণ একটি বাইরের মেয়ে আর একজন স্ত্রীর প্রতি পুরুষের অনুভূতির খুব বেশি
ভিন্নতা নেই। স্ত্রীর কাছে কিছু প্রয়োজন থাকে যেমন সামাজিক দবায়বদ্ধতা, ছেলেমেয়ের প্রতিপালনের নির্ভরতা, আর এক ধরনের অভ্যাস, যেটা আপনার বাসার পোষা কুকুরের প্রতিও থাকে। এছাড়া স্ত্রীর আলাদা কোন সম্মান কিংবা অনুভূতি কোনটাই নেই। তারপরও মেয়েরা সংসারকেই ভালোবাসে, ভালোবাসে স্বামীকে। এই জীবন না দেখলে হয়তো সংসার আগলে বেঁচে থাকতাম আমিও। বলুন তো সত্যি করে এ জীবনে নিষিদ্ধ কোন নারীকে ভোগ করেননি? পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও স্বেচ্ছায় সেক্স করার অনুমতি নেই, তার জন্য রেজিস্ট্রারভুক্ত হতে হয়। এসব নারীকে যাদের প্রয়োজন তাদেরকেও রেজিস্ট্রারভুক্ত করার ব্যবস্থা করুন না। দেখি কতো বড় সাংবাদিক আপনি।

সত্যি কি আমরা সাংবাদিকরা নিজের ইমেজ তৈরি করা ছাড়া সমাজের এ ধরনের সংকটে কোন কিছু করতে পারি?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.