মৌলবাদী ভোটব্যাংক বনাম প্রগতিশীল লেখক

আলী আদনান:

লেখকের কোন বন্ধু নেই। একজন লেখক শুধুমাত্রই লেখক। একজন নির্মোহ লেখক জনপ্রিয়তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কে তার পক্ষে কে তার বিপক্ষে এটা তার ভাবার সুযোগ নেই।
যে নির্বাচনে অংশ নেয়, ‘জনপ্রিয়তা’ তার পুঁজি।
লেখক যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিবেন না তাই জনপ্রিয়তা তার পুঁজি নয়।

লেখক তার চিন্তার জায়গায় স্বাধীন। কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব- এসবের অধীনে লেখকের চিন্তা সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন নির্মোহ লেখকের কলম সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। সেই মানুষ পৃথিবীর যে রাষ্ট্রেরই হোক না। লেখক সবসময় মানুষের পক্ষেই কথা বলবে। মার্কিন লেখক যখন দেখবে তার সরকার অন্য রাষ্ট্রে বোমা হামলা চালাচ্ছে, তখন লেখক নিজ রাষ্ট্রের পক্ষে নয়, বরং আক্রান্ত হওয়া রাষ্ট্রের মানুষের পক্ষে লিখবে। এতে যদি লেখক ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলার আসামী হয়, হোক। কিন্তু রাষ্ট্রকে বোঝানো সম্ভব নয় যে লেখকের মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মতো সীমিত নয়।

ঠিক তেমনিভাবে লেখক ব্যক্তিজীবনে ধর্ম পালন করলেও তার কলম নির্দিষ্ট কোন ধর্মের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করবে না৷ আমি মুসলমান পরিবারে জন্ম নিয়েছি। তাই বলে কোন মুসলমান অন্য ধর্মাবলম্বী বা সম্প্রদায়ের উপর অন্যায় আচরণ করবে, সেটা মেনে নেওয়াও আমার বিবেকবোধের সাথে যায় না। ঠিক এই কারণে আমাদের দেশে অনেক লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীর গায়ে ‘নাস্তিক’ ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এদেশে মুক্তচিন্তার লেখক যারা আছেন- তারা জীবনের কখনও না কখনও ‘নাস্তিক’ ‘কাফের’ ডাক শুনেছেন, শুনছেন এখনও। নানাভাবে কোথাও না কোথাও নাজেহাল হয়েছেন, হচ্ছেন।

একজন লেখকের সকল লেখা সকল পাঠকের পছন্দ নাও হতে পারে। পাঠককে কেউ ঐ লেখা পড়তে বাধ্য করে না। পাঠক যদি লেখকের লেখা না পড়ে তাহলে নিশ্চয় লেখক হাত পা ধরে পাঠককে ঐ লেখা পড়তে অনুরোধ করবে না। দ্বিতীয়ত, লেখকের লেখা যদি পাঠকের পছন্দ না হয়, তার উপর চড়াও হওয়ার অধিকার নিশ্চয় কাউকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু মুমিন পাঠক সম্প্রদায় যেভাবে অনলাইনে এবং সুযোগ পেলে অফলাইনে লেখকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন- তাতে কে কোন ধরনের ব্যাখ্যা দেয় জানি না। তবে আমি বুঝি, মৌলবাদীগুষ্ঠি এ ঝাঁপিয়ে পড়ার মাধ্যমে যুক্তির জায়গায় তার নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে মাত্র।

একজন লেখক যেহেতু তার চিন্তার জায়গায় স্বাধীন, তাই তার কাছে সকল আস্তিক- নাস্তিক, হিন্দু- মুসলমান, আলেম- পৌত্তলিক সবাই সমান।
লেখকের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস থাকতে পারে। কিন্তু সেটা বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। অন্য ধর্মের লোক নিপীড়িত হলে সত্যিকারের সাহসী লেখক কখনোই চুপ করে থাকবে না। কখনোই তার কলম নিজ ধর্মের দোহাই দিয়ে অত্যাচারীর পক্ষ নিবে না।

লেখক কখনোই নিরপেক্ষ নয়। লেখক সত্যের পক্ষে, লেখক সুন্দরের পক্ষে। লেখক সভ্যতার ক্রমবিকাশের পক্ষে। সর্বোপরি লেখক মানুষের পক্ষে। লেখক পদপদবী বা ক্ষমতার লোভে কাবু হয় না। তাই ইহকাল পরকাল, বেহেশতের আকাংখা বা দোযখের ভয়েও লেখক তার চিন্তা থেকে সরে আসবে না।

আজকে বাংলাদেশে মৌলবাদের যে বাম্পার ফলন ঘটছে তার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। অন্যতম কারণ হলো প্রগতিশীল লেখকদের কলমকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা। মুক্তচিন্তার মানুষদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা। এবং গত ত্রিশ বছরে মৌলবাদীরা এক্ষেত্রে বারবার প্রশ্রয় পেয়েছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সে সরকারই মৌলবাদিদের পরোক্ষ প্রশ্রয় দিয়েছে। রাষ্ট্রর প্রশাসনে মৌলবাদিরা শক্তিশালীভাবে ঘাপটি মেরে আছে এবং তাদের শিকড় অনেক শক্ত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া হাউজগুলোতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের অধিকাংশই হয় মনের দিক থেকে মৌলবাদী, না হয় দলগুলোর দালালি করতে গিয়ে মৌলবাদের পক্ষ নেয়। একটা রাষ্ট্রের সকল স্তরে যখন মৌলবাদীরা এভাবে অবস্থান নিয়ে নেয় সেখানে লড়াই করাটা আসলেই কঠিন হয়ে যায়। প্রতিকূল স্রোতে চলার সাহস যাদের নেই তারা এ লড়াইয়ে শামিল হতে আসে না।

মৌলবাদের খড়গ প্রথম নেমে এসেছিল লেখক তসলিমা নাসরিন- এর উপর। তাকে শেষ পর্যন্ত নির্বাসনে যেতে হয়েছে। সেটাও প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগের কথা। এর মধ্যে অনেকবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। এ জনপদে ঘটে গেছে অনেককিছু। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নানা ইস্যুতে একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু একটা ইস্যুতে সকল রাজনৈতিক দলগুলো এক ও ঐক্যবদ্ধ। সেটা হলো মৌলবাদ ইস্যু। কোন সরকারই তসলিমা নাসরিন’কে সম্মানের সাথে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়নি৷ প্রত্যেকটা সরকার ভয় পেয়েছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে নিজ নিজ স্বার্থে ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করার লোভে লেখক তসলিমা নাসরিন’কে নিয়ে কেউ ঝুঁকি নেয়নি। আওয়ামী লীগ ভেবেছে তারা এ উদ্যোগ নিলে বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে মানুষকে খেপিয়ে তুলবে। বিএনপি ভেবেছে আওয়ামী লীগ খেপিয়ে তুলবে। দিনশেষে প্রমাণ হয়েছে- উভয়েই মৌলবাদীদের উপর নির্ভর করে। মুখে তারা প্রগতিশীল সাজে, পোশাকে প্রগতিশীল সাজার চেষ্টা করে। কিন্তু চিন্তায়, মননে, মজ্জায় তারা মৌলবাদী।

প্রথাবিরোধী, বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ- এর রক্ত শুধুমাত্র বইমেলা বা বাংলা একাডেমীকে দগ্ধ করেনি, বরং সাহসী লেখকদের কলমকে চিরতরে ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আজও এর কোন সুরাহা হয়নি।

এরপর মৌলবাদীদের খড়গ দিনকে দিন শক্তিশালী হয়েছে। সে খড়গ বিভিন্ন সময় নেমে এসেছে বিভিন্ন জনের উপর। ব্লগার রাজীব হায়দার, ড. অভিজিৎ রায়, ফয়সাল আরেফিন দীপন, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চ্যাটার্জি, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নীলাদ্রি নীল, জুলহাজ মান্নানসহ অনেক তরুণ লেখকের রক্তে রক্তাক্ত হয়েছে আমার বাংলা মায়ের মাটি। প্রতিটা খুন একেকবার মনে করিয়ে দিয়েছে আমরা নিজ দেশে পরাধীন। পুরো মানচিত্রটা শকুনের থাবার তলে। ইচ্ছে হলেই যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে আঁচড় বসানো যায়।

লালন, আরজ আলী মাতুব্বর, ড. আহমদ শরীফ, কবি শামসুর রহমান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক যেমন জীবদ্দশায় মৌলবাদীদের নানা ধরনের আক্রমণ ও অপদস্থ থেকে রেহাই পাননি, তেমনি এখনও বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ড. জাফর ইকবাল, মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল, খুশী কবির, শাহরিয়ার কবীর, প্রবীর ঘোষ, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আসিফ মহিউদ্দিন- তাদেরকেও প্রতিনিয়ত মৌলবাদীদের তোপে থাকতে হয়। বছর দুয়েক আগে ড. জাফর ইকবাল মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

এ তালিকা থেকে বেগম রোকেয়াও বাদ যায়নি। এবছর বেগম রোকেয়া দিবসে বিভিন্ন পোর্টালে বেগম রোকেয়া সংক্রান্ত লেখাগুলোর কমেন্ট বক্স দেখে আমি ধাক্কা খেয়েছি। বেগম রোকেয়া তার সারা জীবনের শ্রমের বিনিময়ে এদেশে আজ অসংখ্য নারী ডাক্তার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আর সেই সুযোগের বদৌলতে যেসব পশুরা পৃথিবীতে এসেছে তারাই বেগম রোকেয়া দিবসে কমেন্ট বক্সে তাকে নিয়ে যা লিখেছে তার জন্য কখনোই আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না।

ইতোমধ্যে নানা সময়ে নানা আইন হয়েছে৷ নানা ধারা-উপধারা লেখক সাংবাদিকদের কলমকে সীমিত থেকে সীমিত পরিসরে আটকে দিচ্ছে। কিন্তু সবকিছুই গেছে মৌলবাদীদের অনুকূলে। কোন আইন লেখকদের পক্ষে যায়নি। আজকে দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গা দাবি যখন উঠছে তখন হয়তো সরকারের টনক নড়ছে বা নড়বে। কিন্তু সরকার কী ভুলে গেছে এই মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দিতে গিয়ে বা খুশি করতে গিয়ে সরকার নিজেদের একসময় ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে লাঞ্ছিত করে বিদায় করেছিল। আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কোন বক্তব্য যদি নিজ দলের বা সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে থাকে, সরকার ঘরোয়াভাবে তার সমাধান করতে পারতো। কিন্তু তা তারা করেনি। সরকার তখন যা করেছিল মৌলবাদীদের দাবির প্রেক্ষিতেই করেছিল। সেই ঘটনায়ও রাজপথে মোল্লাতন্ত্র জিতে গিয়েছিল।

প্রগতিশীল লেখক সাংবাদিকরা যদি অন্তত নিজের জায়গা থেকে ঠিকমতো লিখতে পারতো বা কাজ করতে পারত, আজ মৌলবাদীদের স্পর্ধা এরকম বাড়তো না, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
এই বাংলাদেশ সত্যিকারের লেখক সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ নয়। এখানে লিখতে হলে হয় দলবাজি করতে হবে, নয়তো বেহেশত দোযখের বর্ণনা লিখতে হবে। কাশেম বিন আবুবাকারদের এখানে প্রমোট করা হয়। আর অভিজিৎ বা দীপনদের হত্যা করা হয়। সভ্যতা এখানে এগোয় না, পিছিয়ে যায়।

এরপরও আমরা হাত গুটিয়ে থাকবো না। যুগে যুগে কালে কালে সত্যের পথের কোন পথিক হাত গুটিয়ে নেয়নি। আমরা লিখবো, লিখে যাবো। প্রগতিশীলরা আজ যা বলে, লিখে, কাল তাই বাস্তবে রূপ পায়। শুধু কণ্টকাকীর্ণ সময় পাড়ি দিতে হয়। তবু মুক্তি আসে। অতীতেও এসেছে, ভবিষ্যতেও আসবে। প্রয়োজন শুধু আমাদের ঐক্য ও একাগ্রতা।

(লেখক: আলী আদনান, কবি, লেখক, সাংবাদিক)

শেয়ার করুন:
  • 202
  •  
  •  
  •  
  •  
    202
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.