ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক দায়ী, এই বিতর্কের অবসান হওয়া জরুরি

সালমা তালুকদার:

যারা মনে করে বোরখা পরলেই মেয়েরা ছেলেদের হাত থেকে রেহাই পাবে, তাদের একটু দেখতে চাই। ফার্মগেট ফুট ওভারব্রিজ পার হচ্ছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠেছি কেবল… এমন সময় এক আগাগোড়া বোরখাতে ঢাকা একজন নারী দেখলাম খপ করে এক লোকের হাত ধরলো। আমি ঠিক পেছনে। ঐ নারী না ধরলে আমিই ধরতাম। কারণ পুরোটাই তো দেখেছি। এতো বড় জায়গা ব্রিজের উপর। তার উপর মাঝে একজন নারী ভিক্ষুক শুয়ে আছে। ঐ লোক একপাশ দিয়ে এসে বোরখা পরা ওই নারীর শরীরে হাত দিল। তাজ্জব! আমার বাবার বয়সী লোক। আর যায় কোথায়, চড়-থাপ্পড় বোধহয় এভাবে অনেকদিন আমিও কাউকে মারিনি, আর ঐ লোকও অনেকদিন খায়নি।

নিজেকে বাঁচানোর জন্য অনেক কথাই বলতে চেষ্টা করেছিল লোকটা। কিন্তু কোনোটাই আসলে যুক্তিসঙ্গত কথা নয়। আসলে বুঝতেই পারেনি এভাবে ধরা পড়ে যাবে। তাই কথাগুলো এলোমেলো ছিল। আর প্রতিটা কথায় আমার মতো একজন নারীর হাত ধমাধম পড়তে থাকলো তার হাতে, গালে, শরীরে। এতে হয়তো আরো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিল। কারণ নারী তো অবলা। নারী মানেই নীরব চোখের পানি। নারী মানেই ধৈর্যের প্রতীক। নারী শুধু মাইর খেয়ে যেতে শিখেছে। মাইর দিতে শেখেনি। যুগের পর যুগ এমন ধারণা পোষণকারীর তো নারীর হাতে মাইর খেতে ভালো লাগার কিছু নেই। তাই হয়তো কথার খেই হারিয়ে ফেলছিল।

দেশের নানারকম কাণ্ড-কারখানায় মনটা তো বিষিয়েই ছিল। তাই জমে যাওয়া একগাদা লোকের সামনে বলেই ফেললাম, তোরা না বলিস আমরা যেন বোরখা পরি। বোরখা পরলে নাকি তোরা আমাদের দিকে শ্রদ্ধার চোখে তাকাবি। বোরখা পরলে নাকি তোরা গায়ে হাত দিস না। বোরখা পরলে নাকি ধর্ষণ বন্ধ হবে। তাইলে এটা কী ছিল হারামজাদা? যা গালি স্টকে ছিল সব বের হয়ে এলো।

এক ২০/২২ বছরের ছেলে এসে থামাতে চাইলো। বললাম, কে হয় এটা? তোর বাপ? নাকি তোর সহযাত্রী? দাঁড়িয়ে থাকা সবগুলো পুরুষের দিকে আঙ্গুল তুলে বললাম, আজকে যারা বাধা দিতে আসছিস, সবগুলা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মেয়েদের গায়ে হাত দিস। নইলে বাধা দিতে আসলি কেন? যাই হোক, শেষমেশ ঐ নারী এক ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে ফেলে, চলে আসলো, সাথে আমিও। হাঁটছি বাস, রিক্সার খোঁজে। একটু পর দেখি ঐ ছেলে একবার এসে আমার সামনে দিয়ে ঘুরে আমাকে দেখে আবার পেছনে চলে গেল। কিছু বললাম না। ভাবলাম চলে গেছে হয়তো। ওমা! পাশের এক দোকানের বন্ধ গ্লাসে নজর পড়লো। দেখি সে পেছনে। দাঁড়িয়ে গেলাম। ওর কপাল ভালো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। নইলে আবার লোক জড়ো করতাম। একটু দাঁড়িয়ে থেকে পাশ দিয়ে যাওয়া বিআরটিসিতে উঠে পড়লাম।

ছেলেটার মনের কথা দিব্বি বলে দিতে পারি। আমার দেয়া অপমান সহ্য হয়নি। যেহেতু সময়টা সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্ত। তাই পেছন পেছন হাঁটছিল। হয়তো ভাবছিল সন্ধ্যা নামলেই পাকড়াও করবে। হয়তো মনে মনে ভাবছিল আমার সব তেজ মিটিয়ে দিবে রাতের অন্ধকারে। সুযোগটা পেল না। আল্লাহ সহায় ছিলেন বলে। মনে মনে হাসলাম। আজকে আমারও ঐসব নারীদের মতো অবস্থা হতে পারতো, ধর্ষণের শিকার হয়ে যাদের কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছে। কেউ ট্রমার মধ্যে দিন যাপন করছে। অথবা ধর্ষণের শিকার হওয়া যেসব নারীর পরিবার তার কাছ থেকে সরে গেছে। অথবা সেইসব নারীদের মতো হতে পারতো যারা এক ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে থানায়, আদালতে বিচারের কাঠগড়ায় বার বার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অথচ আমার শরীরের আগাগোড়া ঢাকা ছিল কয়েক পরত কাপড়ে। আমার মাথায় হিজাব ছিল। আমার শরীরের কোনো অংশ দেখা যাচ্ছিল না।

একটা কথা বলি? ধর্ষণ অথবা রাস্তাঘাটে মেয়েরা যে লাঞ্ছিত হয় তা যে কেবল পোশাকের জন্য হয় না, তা আবারও বুঝতে পারছেন তো? আর বাংলাদেশে আপনাদের ভাষায় ‘অশালীন’ পোশাক পরা মেয়েরা সব জায়গায় ঘুরেও বেড়ায় না। আরও কথা আছে, অশালীন পোশাক মানে কী সেটা বাংলাদেশীরা এখনও জানেই না। তারা ভাবে প্যান্ট শার্ট ফতুয়া অশালীন। অথচ তারা জানে না শাড়ি অথবা সালোয়ার কামিজ পরেও অশালীনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়। শাড়ি সালোয়ার কামিজেও যথেষ্ট স্বেচ্ছাচারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়।

তাই বলছি একটা বিতর্কের অবসান হওয়া খুব জরুরি। তা হচ্ছে রাস্তাঘাটে নারীদের লাঞ্ছিত হওয়ার পেছনে পোশাক না, নোংরা মানুষের নোংরা মানসিকতাই দায়ী। এবং জরুরি ভিত্তিতে আমাদের দেশে বেশি বেশি মানসিক ডাক্তার আর মানসিক হাসপাতাল হওয়া খুব প্রয়োজন। ইন্টারনেটের ভুল বা অপব্যবহারেও এক শ্রেণির মানুষ মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। মধ্য বয়স্কদের মধ্যেই এগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ এরা ইন্টারনেটের সাথে পরিচিত হয়েছে মাত্র সেদিন। এমন হঠাৎ করে বিশ্ব যখন হাতের মুঠোয় চলে আসে, তখন মানুষের কিছু অংশ এমন বিপথেই যায়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এরকম একটা অংশই এভাবে রাস্তাঘাটে নারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে।

বোরখা পরলে অথবা ঘরে থাকলে তোমরা নারীরা ধর্ষণের শিকার হবে না, এমন কথা অহরহ শোনা যায়। অথচ পুরুষের পর্দার কোনো কথা এভাবে ফলাও করে বলা হয় না। সভ্যতার পর সভ্যতা পরিবর্তন হলো, কিন্তু নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস মনোভাবের পরিবর্তন হলো না। এখনও পুরুষেরা নারীদের ঘরের কোণে আটকে রাখতে পছন্দ করে। আর তাই ধর্ষণ অথবা রাস্তাঘাটে লাঞ্ছনার দায়ভারও নারীদের ঘাড়েই চাপাতে চায়। নারীর হাঁটা, চলা ফেরায়, পোশাকে দোষ খোঁজার চেষ্টা করে। সেই জায়গা থেকে বলছি, কোথায় সেইসব পুরুষ, যারা বলে বোরখা পরলে নারীরা নিরাপদ থাকে! যে ঘটনাটার বর্ণনা আজ দিলাম সেখানে ঐ নারীর দোষ কোথায় ছিল? বলতে পারবেন আপনারা? নাকি এখানেও বলবেন এরকম একটা দুটো ঘটনা ঘটেই থাকে। এগুলো নাক না গলানোই ভালো।

তাহলে আমরাও বলতে চাই ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে একটা বিষয় আছে। যেসব নারী নিজের ইচ্ছেমতো পোশাক পরে সেটাও কিন্তু একটা দুটো ঘটনার মধ্যেই পড়ে। সেটাকে তাহলে এতো বড় ইস্যু বানান কেন আপনারা? সেই জায়গায় নিজেরা চোখের পর্দা করতে পারেন না? ইসলাম কি কেবল মেয়েদের জন্য? ছেলেদের জন্য না? ইসলামে ছেলেদের চোখের পর্দার কথা কিছু বলা হয়নি?

শেষ কথা বলতে চাই। ধর্মের দোহাই দিয়ে সব দোষ মেয়েদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করবেন না। এভাবে ধর্মকেও অপমান করা হয়। কোনো ধর্মেই জোর জবরদস্তির কথা বলা হয়নি। আর সব ধর্মাবলম্বীরাই কিন্তু মানুষ।

শেয়ার করুন:
  • 184
  •  
  •  
  •  
  •  
    184
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.