বেগম রোকেয়া- বাংলার নারীদের এক আলোকবর্তিকা

শাহিদা ফেন্সী:

আজ ৯ ডিসেম্বর, বাংলার শ্যামল আকাশে সৌভাগ্যক্রমে হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অন্ধকার বাংলার সমগ্র জমিন জুড়ে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছিলেন এই তারা। জ্বি, আমি বেগম রোকেয়ার কথা বলছি। যিনি ১৮৮০ সালে ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যাকে আমরা সকলে “নারী জাগরণের অগ্রদূত” হিসেবে জানি। তবে এই “নারী জাগরণ” কথাটিতে আমার খানিক আপত্তি আছে। এখানে আমি বলবো নারীকে মানুষ রূপে জাগ্রত করার অগ্রদূত শুধু নয়, এই বাংলায় প্রথম ও প্রধান কার্যকর দূত এই বেগম রোকেয়া। “রোকেয়া” কেবল একটা নাম নয়, একটা আদর্শ একটা আলোকবর্তিকা। অথচ যার যথাযথ যোগ্য সম্মান, মর্যাদা, অনুসরণ, অনুকরণ কোনটাই আমরা আজও করতে পারিনি।

যুগ হতে শত সহস্র গুণ অগ্রসর এবং সকল সময়ে বর্তমান এই নারীরূপী মানুষকে শুধু নারীরা নয় সারা বাংলা আজও ধারণ করতে পারেনি। কেন পারেনি বা পারছে না তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আসলে অনেক গভীরে এবং অনেক অপ্রিয় সত্যকথনে যেতে হবে। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে এর প্রধান কারণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ধর্মান্ধ সমাজব্যবস্থা। অথচ এই পুরুষতন্ত্র এবং ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ছিলো তাঁর শক্ত অবস্থান, জোরালো লড়াই। তিনি তাঁর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বলেছেন-“আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশ পত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন”। এ প্রসঙ্গে রোকেয়া আরো বলেন-“ধর্মগ্রন্থ গুলি পুরুষ রচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে”।

তবে সান্ত্বনা এই যে, তখনকার সেই অন্ধকার সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি যেসব কথা ও সাহিত্য রচনা করে গেছেন, তা আজ এই বর্তমান সময়ে তিনি বলতে বা করতে পারতেন না। যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশার। যার মানে দাঁড়াচ্ছে আজ আমরা আধুনিক ও শিক্ষিত হলেও নারীকে মানুষরূপে মর্যাদা দিতে বা বাকস্বাধীনতা সকলেরই যে গণতান্ত্রিক অধিকার তা আজও নিশ্চিত করতে পারিনি।

সেই সময়ে নারীরা সমাজের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিলেন। যার মধ্যে আমরা প্রথমেই উল্লেখ করতে পারি শিক্ষার কথা। তিনি বুঝেছিলেন শিক্ষাই নারীর পশ্চাদপদতার প্রধান কারণ এবং এই শিক্ষাই দিতে পারে নারীকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সর্বোপরি আত্মমুক্তি। যার প্রমাণ আমরা পাই তাঁর প্রতিটা লেখায়, এবং নারী শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেই সময়কার ধর্মান্ধ অন্ধকার সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নিজেকে জাগ্রত করার মূলে রয়েছে শিক্ষা এবং সে শিক্ষা যে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়, সেই শিক্ষা যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিশ্ব সাহিত্যের শিক্ষা তা তিনি বলতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। কারণ জ্ঞানবিজ্ঞানের আলো ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করা সম্ভব নয়। আমি অবাক হয়ে যাই এই ব্যতিক্রমী ও সাহসী নারীর কথা, কর্ম, ধ্যানধারণা দেখে। সেই প্রতিকূল সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে কি করে তিনি এতোটা প্রগতিশীল ও আধুনিক চিন্তা করতে পেরেছিলেন।

এরপর আমরা আসতে পারি পর্দাপ্রথা প্রসঙ্গে। সেই সময়ে নারীকে অনেকটাই দেহমনে পঙ্গু ও অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো পর্দাপ্রথা। যে সমস্যা থেকে আমার মনে হয় আজও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি শুধু নয়, বরং আরো পর্দার গভীরে নিজেদের সঁপে দিচ্ছি। এই পর্দাপ্রথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“পর্দাপ্রথা দ্বারা নারীকে শুধু অবমাননা করা হয় তাই-ই না, এটা নারীকে অবরুদ্ধ করে রাখে শরীরে, মনে”। সেই সময়কার অন্ধকার সমাজে দাঁড়িয়ে এটা যে কত বড় সাহসিকতা, তা যারা আজও দেহ মনে পর্দায় আবদ্ধ তারা সহজে অনুমান করতে পারবেন না। আফসোস!

সমাজের এমন কোন অন্ধকার দিক নেই যেখানে বেগম রোকেয়া আঘাত করেননি। নারী পুরুষের সমমর্যাদা ও লিঙ্গ সমতার প্রসঙ্গে তিনিই প্রথম বলেছিলেন, “আমরা সমাজে অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য যাহা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তাহাই”। কতটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হলে একজন নারী এতো বছর আগে এভাবে ভাবতে পারেন!

তিনি নারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হোন। মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই, বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই, বল কন্যে আমরা জড় অলংকাররূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই। সকলে সমস্বরে বল আমরা মানুষ”। এ কথার ব্যাখ্যায় আমি তাই আগেই বলেছি নারী জাগরণের অগ্রদূত নন তিনি, নারীকে মানুষরূপে জাগ্রত করারও অগ্রদূত তিনি। তবে সস্তা নারীবাদীদের মতো তিনি একাট্টা হয়ে কেবল পুরুষ বিরোধিতা করেননি। তিনি যেমন “নারীস্থান” লিখেছেন, তেমনি “স্ত্রী জাতির অবনতি”ও লিখেছেন। তিনি একথা বলতেও এতোটুকু দ্বিধা করেননি যে-মেয়েদের অবনতির জন্য মেয়েরাও দায়ী। যা বর্তমানে অনেক নারীবাদীর পক্ষে চিন্তা করা সহজ নয়।

এই দুঃসাহসী নারী কোথায় হাত দেননি! তিনি বাল্যবিবাহ রোধ, বহুবিবাহ বাতিল সহ বিধবা নারীদের কর্মসংস্থান, দরিদ্র-অসহায় বালিকাদের শিক্ষা, কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ, নিরক্ষরদের অক্ষর জ্ঞান দান এবং বস্তিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম” এবং প্রথম মুসলিম মহিলা সমিতি। আরো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় মাতৃভাষার প্রতি তাঁর মমত্ববোধ। সেই সময় অভিজাত শ্রেণির মুসলমানদের ভাষা ছিল “উর্দু”। কিন্তু রোকেয়া বাংলা ভাষাকে ভালো করে আয়ত্ত করে এই ভাষাতে সাহিত্য রচনা করলেন যা আজও বাংলা সাহিত্যের পরম সম্পদ। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় এই মহান নারী মৃত্যুবরণ করেন।

১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামক একটি গল্প লিখে সাহিত্য জগতে এই মহান নারীর পথচলা শুরু হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু রচনা হল Sultana’s Dream, সুলতানার স্বপ্ন, পদ্মরাগ (১৯২৪), অবরোধবাসিনী (১৯৩১), মতিচুর (১৯০৪)। কিছু ব্যতিক্রমধর্মী রচনা হল “পরী-ঢিবি”, “তিনকুড়ে”, “বিয়ে পাগলা বুড়ো” ইত্যাদি। তাঁর প্রবন্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল “চাষার দুক্ষু”, “এন্ডি শিল্প”, “লুকানো রতন” ইত্যাদি। এছাড়া তিনি ছয়টি ছোট গল্প, রসরচনা এবং সাতটি কবিতা লিখেন। তাঁর এসব রচনা সে সময়ের নবনুর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হত।

২০০৪ সালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর জরিপে ষষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছিলেন বেগম রোকেয়া। আমার মনে হয় জরিপটা যদি শুধু নারীকে নিয়ে হতো, তবে তিনিই হতেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নারী। সবশেষে আমি বলবো, আমরা যারা লেখালেখির জগতে আছি এবং আমাদের ঘরে ঘরে যে সকল মা-বোন-কন্যা আছেন, সকলেরই বেগম রোকেয়াকে পড়া ও জানা উচিত। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আমার দাবি থাকবে প্রথম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বেগম রোকেয়ার সকল গ্রন্থ পর্যায়ক্রমে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

শেয়ার করুন:
  • 822
  •  
  •  
  •  
  •  
    822
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.