রাজনীতির হাতিয়ার নয়, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্যে কর্মমুখী শিক্ষা চাই

কাজী তামান্না কেয়া:

প্রিয় বন্ধুকে সাথে নিয়ে সেলফি অথবা মাথার টুপিটাকে আরও একটু ঠিকঠাক করে রাজু ভাস্কর্যের সাথে নিজের একখান ছবি — যেভাবেই বলেন না কেন, পাশের ছবি্র সামনের দিকে দাঁড়ানো এই ছেলেগুলোর চোখে আমি ভাস্কর্য ভাঙার আগুন নয়, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আগত যে কোনো আগন্তুককে দেখি। ছবি তোলার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বাড়ি ফিরে ছোট ভাই বা বোনকে ছবিটি দেখিয়ে বলবে ঢাবি ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়ানোর গল্প।

ডক্টর জাফর ইকবাল মৌলবাদ সম্পর্কিত তার লেখায় বার বার বলেছেন এইসব কম বয়সী ছেলেদেরকে তিনি দোষ দেন না বরং দোষ দেন যারা এই ছেলেদের মৌলবাদী আচরন করতে শেখায় তাদের। আমি অবশ্য সেই মাস্টারমাইন্ডদের বিচারের আওতায় আনার সাথে সাথে ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করার পক্ষে। রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করতে চাইলেই বাংলাদেশের মতো একটি দেশে রাতারাতি তা পৃথক হয়ে যাবে না। সেই চেষ্টাটি বর্তমানে ফ্রান্সে করা হচ্ছে, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে ফ্রান্সে বসবাসরত মুসলিমদের ফ্রান্সের মূল্যবোধের সাথে একাত্মতা বোধ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অর্থাৎ ফ্রান্সের মুসলিমদের ব্যবহার করে রাজনীতি করার চেষ্টা বন্ধ করতে চাচ্ছে। বিষয়টা ফ্রান্স বলেই হয়তো চেষ্টা করতে পারছে। আমাদের মত ধর্মান্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে অসচেতন ভোটারদের উপর সেই চেষ্টা করার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। ইতিমধ্যে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে দেশের মোট শিক্ষার্থীদের অন্তত এক তৃতীয়াংশ* কওমি বা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ছে।

কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কয়েকটি উদাহরণ দেই। অতি সম্প্রতি ফ্রান্সে নবী মোহাম্মদের কার্টুন আঁকাকে কেন্দ্র করে সমাবেশ, কিংবা ভাস্কর্য বিরোধী সমাবেশগুলোতে আপনি কমবয়সী মাদ্রাসা ছাত্রদের অহরহই দেখতে পাবেন। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে সংগঠিত হেফাজতের আন্দোলনে আমরা একই চিত্র দেখেছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাদ্রাসার শিক্ষকেরা বড় হুজুরের বয়ান শোনার কথা বলে ছাত্রদের নিয়ে এসেছিল ৫ মে। সেদিন রাতে পুলিশ যখন হেফাজতিদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়, ৬ই মে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় খালি পায়ে এবং শূন্য পকেটে ছাত্ররা ঘোরাফেরা করছিল কারন তারা অনেকেই জীবনের প্রথমবার ঢাকায় এসেছিল এবং নিজেদের মাদ্রাসায় ফেরার পথ জানতো না। ২০১৮ সালে ডক্টর মোহাম্মদ জাফর ইকবালের উপর ছুরিকাঘাত করেছিল যে ছেলেটি সেও কিন্তু মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র ছিল যে কিনা ডক্টর ইকবালের কোন লেখা কোনদিন পড়ে দেখেনি, বরং হুজুরদের মুখে মুখে শুনে চলে এসেছে ছুরি হাতে আক্রমণ করতে।

বাংলাদেশের সংবিধান এবং শিশু অধিকার আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশু খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং নিরাপত্তার মত মৌলিক ব্যাপারগুলোর ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করবে।
কিন্তু আমরা দেখছি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে কওমি শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারগুলো দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এখানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচার করা হয়, নিয়মিত ধর্ষণ-বলাৎকার করা হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরে ফেলাও হয়। এই শিশুরা পাশ করে বের হয়ে উপার্জনক্ষম কোন কাজ করতে পারে না। জীবন দক্ষতাহীন শিক্ষা গ্রহণের কারণে তারা সমাজের বোঝা হচ্ছে, পরিবারের বোঝা হচ্ছে। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে মাদ্রাসার শিক্ষক এবং ধর্মীয় রাজনীতিবিদদের হাতে।

বাংলাদেশ সরকার গৃহীত নানা পরিবর্তন সাধারণ শিক্ষা ব্যাবস্থায় দেখা গেলেও কওমি শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন খুব একটা দেখা যায় না। সম্প্রতি কওমি সার্টিফিকেট দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সার্টিফিকেটের এর সমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে কাজে লাগার মতো শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারলে এবং উপার্জন করে খাওয়ার মতো একটা সম্মানজনক জীবন দিতে না পারলে শুধু একটা সার্টিফিকেট এর মান বৃদ্ধি করে এই বিরাটসংখ্যক শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা বন্ধ করা যাবে না।

বাংলাদেশে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা বা ভোকেশনাল এডুকেশন পদ্ধতি চালু আছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা হোস্টেল এ থেকে লেখাপড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন ট্রেড বা কাজ শিখতে পারে। বেসরকারিভাবে ইউসেপ এবং আরো অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেইনিং দিয়ে শিক্ষার্থীদের চাকরির ব্যবস্থা করে থাকে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে কওমি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদেরও এইসব শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা যায়। তাদের লেখাপড়া এবং কাজ শিখিয়ে দেশের ভেতর যেমন কাজে লাগানো যায়, তেমনই স্কিলড ম্যানপাওয়ার হিসেবে বিভিন্ন দেশে পাঠানো যায়।

ডেমোগ্রাফিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় প্রতিটি দেশ বিরাট সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠির অধিকারী হওয়ার সুবিধাটা একবারই পায়, যেটা বাংলাদেশ এখন পাচ্ছে। এরপর বৃদ্ধদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে এবং উপার্জনক্ষম জনগোষ্ঠি হ্রাস পেতে থাকে। আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ যারা অধিকাংশ বয়সে বেশ তরুণ, তারা মধ্যেপ্রাচ্যে বা অন্যান্য দেশে আনস্কিলড ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করছে। আর তাদের পাঠানো রেমিটেন্সের হাত ধরে আমাদের জিডিপি গ্রোথ অব্যাহত আছে। এই মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারদের যদি আমরা স্কিলড ওয়ার্কারে রুপান্তর করতে পারতাম, রেমিটেন্সের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত। যারা অলরেডি চলে গেছে, তাদেরকে স্কিলড করা সম্ভব নয়। কিন্তু মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিরাট সংখ্যাটিকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। ইয়াং পপুলেশনকে স্কিলড ম্যানপাওয়ার হিসেবে গড়ে তুলে চীন, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। আমাদেরকেও হাঁটতে হবে সেই পথে এবং এই শিক্ষার্থীদের দেশের সম্পদে পরিণত করতে হলে তাদেরকে লক্ষ্য করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

আগামী বছর আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পালন করবো। জাতীয় জীবনের এই মাহেন্দ্রক্ষণ পালন করার জন্যে সরকার নানান প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেইসব প্রকল্পের আওতায় মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কাজটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আজকে রেলের জমি, কালকে নগদ টাকা কিংবা জেইল-জরিমানা দিয়ে মাদ্রসা শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে ব্যবহার করা বন্ধ করা বা শিক্ষার্থীদের জীবন মানের পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। রাজনীতির হাতিয়ার নয়, মাদ্রাসার ছেলেমেয়েদের জন্যে কর্মমূখী শিক্ষার প্রচলন করা হোক এবং তাদেরকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার সূচনা করা হোক এখনই।

*(কওমি বা আলিয়া মাদ্রাসার মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা আলাদা আলাদা সংখ্যার কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য আমার কাছে নেই, বিভিন্ন লেখা থেকে সংখ্যাটা মোট শিক্ষার্থীর এক তৃতীয়াংশ বলে ধারণা পেয়েছি)

শেয়ার করুন:
  • 420
  •  
  •  
  •  
  •  
    420
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.