কালো মেয়ে এবং রং ফর্সাকারি ক্রিমের প্রয়োজনীয়তা

শাহরিয়া দিনা:

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের এ বছরটাতে অনলাইনের ব্যবহার বেড়েছে যথেচ্ছভাবে। অনলাইনে ব্যবসা, অনলাইনে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খোঁজ নেয়া, কেনাকাটা সবই চলছে। আজকাল ফেইসবুক লাইভে এসে পণ্যের বেচা-কেনা চলছে হরদম। খেয়াল করলে দেখা যাবে এর মধ্যে বিউটি প্রডাক্ট দখল করে আছে অনেকটা। সেটা স্বাভাবিক হয়তো। সুন্দর হতে কে না চায়? নিজেকে সুন্দর আকর্ষণীয় দেখতে সবারই ভালো লাগে। সমস্যা হচ্ছে, সুন্দর বলতে যখন আমরা গায়ের রংকেই বুঝি। ফর্সা রংয়ের প্রাধান্য দেই।

কালো মেয়ে নিয়ে কাব্য হয়েছে ঢের। কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ দেখেছিলেন কবি। নাম দিয়েছিলেন তার কৃষ্ণকলি। কৃষ্ণকে নিয়ে গাওয়া ‘কালো কালো করিস না লো ও গোয়ালের ঝি, আমায় বিধাতা করেছে কালো আমি করবো কী’ গানও পেয়েছে জনপ্রিয়তা। বাস্তবতায় এই ২০২০ সালে এসেও কালো মেয়ের বিয়ে ভেঙে যায় গায়ের রংয়ের অজুহাতে। কালো মেয়ে অবহেলিত তাই আত্মবিশ্বাস হারায় পছন্দের মানুষকে ‘ভালোবাসি’ বলতে।

আমরা অনেক নীতিকথা বলি, গায়ের রংয়ে কী যায়-আসে, তা-ও হরহামেশা বলি। অথচ সেই আমরাই আবার বিয়ের সময় পাত্রীর গায়ের কালো বলে নাকোচ করি। অস্বীকার করছি না সেই পুরনো প্রবাদ, প্রথমে দর্শনধারী. পরে গুণবিচারী। কিন্তু দর্শনটা কেমন, সেটা বিবেচনাযোগ্য। একজন মানুষের মেধা, ব্যক্তিত্ব, পড়ালেখা, যোগ্যতা, চরিত্র এসবই তো দেখার বিষয়। গায়ের রংয়ের ওপর তার হাত নেই, কিন্তু নিজেকে সে কীভাবে যোগ্য মানুষ করেছে, বা মানুষ করতে চাইছে, সেটাই বিবেচ্য। সুন্দর গায়ের রং তাতে অলংকারের মতো, এর চেয়ে বেশি নয়।

সমাজের প্রচলিত ‘ফর্সা মানে সুন্দর’ এই মাপকাঠির সুন্দরের সংজ্ঞাতে কতো কালো মেয়ের মনে অন্ধকার দীর্ঘশ্বাস জমা পড়ে, তার খবর কে রাখে! সকলের অজান্তেই সে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। পাঁচটা মেয়ে একসাথে থাকলে যখন স্পটলাইটের আলোতে ফর্সা-সুন্দর মেয়েটা থাকে তখন ভেতরের কোন এক অদৃশ্য ছায়া তাকে বলে দেয় তুমি সুন্দর নও। সুন্দর হবার তীব্র বাসনা তার মধ্যেও জাগ্রত হয়। যার ফলাফল বিভিন্ন বিউটি প্রডাক্টের এলোমেলো ব্যবহার। সুযোগে নিন্মমানের নকল পণ্য গছিয়ে দিয়ে ব্যবসা করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি। এসব পণ্য ব্যবহারে প্রতারিত হয়ে ত্বকে ক্ষতিকর প্রভাবে মানসিক অবসাদে ভোগা শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা কখনোই গায়ের রংকে সাদা করতে পারি না, তবে হ্যাঁ কিছুটা উজ্জ্বল করতে পারি। আমাদের ত্বকের স্বাভাবিক যে মেলানোসাইড সেলগুলো আছে, যা রঞ্জক তৈরি করে, সেটাই আমাদের গায়ের রংটা নির্ধারণ করে।

কমদামি এবং কম সময়ে রং ফর্সাকারি ক্রিমের জনপ্রিয় উপাদান হলো, পারদ (Mercury) এবং হাইড্রোকুইনন (Hydroquinone)। পারদের বিষে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যায় মৃত্যুর সময় তাদের গায়ের রঙ থাকে একদম সাদা। ফেয়ারনেস ক্রিমে এই কার্যকরি আর সহজলভ্য উপাদানের ব্যবহার লক্ষণীয়। পারদের নিয়মিত ব্যবহারে গায়ের রঙ একদম ফ্যাকাসে সাদা হয়ে যাবে। অনায়াসে আপনার লিভার আর কিডনি নষ্ট করে দিতে পারবে। হাউড্রোকুইনন খুবই কার্যকরি ব্লিচিং এজেন্ট। বিভিন্ন ফেয়ারনেস ক্রিমের প্রধান উপাদান। রেগুলার ব্যবহারে ত্বক আস্তে আস্তে পাতলা করে দেয় আর সেন্সিটিভিটি বাড়ায়।

এসব রং ফর্সাকারি ক্রিম ব্যবহারে ত্বকে এলার্জি সমস্যা, রোদে বের হতে না পারা, দগদগে ক্ষত হওয়া, দেহের লিগামেন্ট, টেনডন আর ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি করে। এমনকি ত্বকের ক্যান্সারও হতে পারে।

আমাদের আবহাওয়া এবং জলবায়ু অনুযায়ী আমাদের আকার-আকৃতি প্রকৃতিগতভাবে নির্ধারিত। আমরা চাইলেই জাপানিজদের মতো গ্লাসস্কীন বানিয়ে ফেলতে পারবো বা ইউরোপীয়দের মতো ধবধরে সাদা হয়ে যাবো, তাতো না! আমরা বরং সুস্থ এবং স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনে আগ্রহী হতে পারি। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপাদানে ত্বকের যত্ন নিতে পারি।

সৌন্দর্য গায়ের রংয়ে থাকে না, সৌন্দর্য থাকে মেধা আর মননে। একজন সুন্দর চেহারার মানুষ হতে পারে পিশাচের মতো জঘন্য, তেমনি বদখত দেখতে মানুষটাও হতে পারে কোমল হৃদয়ের অধিকারী। মানবিক গুণাবলীই বিবেচ্য মানুষ হবার জন্য।

প্রকৃতি সুন্দরতম আকৃতিতেই মানুষ বানিয়েছেন। প্রতিটি মানুষই সুন্দর। আলাদা করে রং ফর্সা করতে গিয়ে নিজের সময়-শ্রমের অপচয় ঘটিয়ে ডিপ্রেশনে ভোগার মানে নেই। যার মন সুন্দর সে অন্যের মধ্যেও সুন্দর দেখে, যার মন অসুন্দর তার চোখে অন্যের অসুন্দরই ধরা পরে। কারো মনের দৈন্যতার দায় আপনার না, কারো কালো রং পছন্দ করতে না পারার অক্ষমতার দায়ভারও অন্য কারো না।

সুন্দর কিংবা সৌন্দর্য উপভোগের বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। গোধূলির রং, জোছনার আলো, বৃষ্টির শব্দ, মাটির সোঁধা গন্ধের ঘ্রান সবাইকে তো আর আকুল করেনা! মানুষ সুন্দর হোক তার কর্মে। সুন্দর হোক তার জ্ঞানে-আচরণে।

শেয়ার করুন:
  • 112
  •  
  •  
  •  
  •  
    112
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.