রত্নগর্ভা

ফাহমিদা খানম:

“এতোটুকুন বাচ্চা কি এতো খাবার খেতে পারবে? দরকার হয় দু’বার নাও, কিন্তু খাবার নষ্ট করা একদম ঠিক নাহ”
“এটুকু খাবার আপনার কাছে বেশি মনে হয়?”
“প্রায়ই দেখি খাবার ফেলে দাও, নষ্ট না করে বাসায় থাকা কাজের মেয়েটাকে দিলেও পারো”
“নাহ তাতে করে ওর লোভ বেড়ে যাবে, তখন চুরি করে খাবে”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে ইচ্ছা হলো – খাবারের জন্যেই কিন্তু ওরা পরিবার ফেলে কাজে আসে, কিন্তু বললে আবার কী মনে করে বসে তাই বলি না। ছোট ছেলের বাসায় এসেছি আজ পাঁচ দিন হলো আসলে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে হাত মচকে গেছে বলেই আসা।
“আম্মা, ইশা বাচ্চার ব্যাপারে কিছু বললে খুব মাইন্ড করে”
“আমি তো খাবার অপচয় করতে না করেছি, অন্যকিছু বলিনি তো”
ছেলের মুখ দেখে বুঝি সে নিজেও পছন্দ করছে না, তাই মনে মনে বলি—
“তোদেরকে বড় করতে গিয়ে আমিই জানি খাবারের কষ্ট কী!”

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বড় ছেলে আর বউ এসে হাজির তাদের বাসায় নেবার জন্যে-
“আম্মা চলেন আমার বাসায় বেড়াতে”
“তোমরা দুজনেই অফিসে থাকো বলে এখানে উঠেছি, একা বাসায় ভালো লাগবে না বলে”
“আর আপনার বাড়িতে থাকার দরকার নাই, আছেটা কে সেখানে? একটা বিপদ-আপদ হলে দেখার পর্যন্ত কেউ নাই!”
“আমি সেখানেই ভালো থাকি, বড় জামাইয়ের কী খবর, জামিন হলো?
“আমরা খুব ভালো উকিল ধরেছি, আশা করছি হয়ে যাবে”
“আমি কল্পনাও করিনি জামাই ঘুষ খাবার মতো এতো নিচু কাজ করতে পারে? মান-সম্মান সব ধুলোয় মিটিয়ে দিলো”
“আম্মা, এসব নিয়ে এতো উত্তেজিত হওয়া ঠিক নাহ, আর আপনি নাকি আপাকেও কী কী বলেছেন! সে বিরাট অভিমান করে বসে আছে”
“স্বামীর অধঃপতন সে আগে থেকে বুঝেনি বলতে চাও? সে নিজেও লোভীই”

বড় ছেলের বাসায় গিয়ে শুনি তাদের বিবাহ বার্ষিকী, তাই জমকালো আয়োজনের ব্যবস্থা দেখে অবাকই হলাম
এই এলাকায় এতো বড় ফ্ল্যাট কেনার পয়সা পেলো কই?

“কতো গেলোরে এই বাড়ি কিনতে?”
খুব আস্তে করে ছোট ছেলেকে জিজ্ঞেস করি আমি —
“মা বাড়ি কিনতে যা গেছে, তার চাইতেও বেশি গেছে ফিটিংস কিনতে বুঝলে”
“ও এতো টাকা কই পেলো? যে চাকরি করে তাতে করে এই বয়সে এমন বাড়ি হবার কথা তো না”
“কী যে বলো না তুমি! ভাইয়ার চাকরি যে লোভনীয়! কতো করে বলেছিলাম আমার জন্য একটা চাকরি দেখতে!
এই ফ্ল্যাট লোন নিয়ে করেছে মা ”
অতিথিদের দেখে আরেকটা ধাক্কা খেলাম – তাদের গল্পের বিষয় শুনে বুঝলাম সবার বাচ্চারা অভিজাত স্কুলে পড়ে তবে স্ত্রীরা কিছু না করলেও তাদের পোশাক আর গহনা দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না চাকরির সাথে কতোটা অসঙ্গতিপূর্ণ!

আমি গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা পদে ছিলাম অনেক বছর তবে আমার হিসাব মিলাতে পারলাম না কিছুতেই। ওর বাবার মৃত্যুর পর কঠিন সংগ্রাম করে ওদের বড় করেছি—অনেক কিছুই দিতে পারিনি তবে সবসময়ই ভাবতাম আদর্শতা দিয়েছি।
সব অতিথি যাবার পরে খেয়াল করে দেখলাম খাবারের অপচয়! এটা আমি আজও নিতে পারি না খাবারের অপচয় করা, কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম মানুষ যতটা না খেতে পারে তার চাইতেও দ্বিগুণ পাতে তুলে নেয়–

পেটের খিদের চাইতেও মনের খিদেটাই হয়তো বড়
“আপনি নাকি আগামী সপ্তাহেই চলে যেতে চাইছেন মা?”
“হ্যাঁ, ডাক্তার দেখানো শেষ, আর ছোটুর বাড়িতেও যেতে হবে একবার”
“ভুলেই গিয়েছিলাম মা, ওর স্বামী এখন কেমন আছে? আসলে এতো ব্যস্ত থাকি যে খবর নেওয়া আর হয় না”
“ডায়ালাইসিস চলছে, আগামী মাসে চেন্নাই নিয়ে যাবার কথা”
“মাত্রই ফ্ল্যাট কিনলাম, মা না হলে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারতাম হয়তো”
“ওরা তো তোমাদের কাছে হেল্প চায়নি, শুনেছি জামাইয়ের অফিসের কলিগেরা মিলে টাকা তুলে পাঠাচ্ছে”

ওদের কাছে থাকার অনুরোধ সত্বেও চলে আসার জন্যে ট্রেনে উঠি, কারণ বাচ্চাদের আমার কাছে রেখেই জামাইকে নিয়ে মেয়ে যাবে। আমি শুধু ভাবি, আমি চার সন্তানকে কী দিয়েছি? সততা, মূল্যবোধ কতোটা ধারণ করেছে তারা মনেপ্রাণে? খুব আগ্রহ করেই ওরা আমাকে রত্নগর্ভা পুরষ্কার জুটিয়ে দিয়েছিল, আদৌ কি আমি সেটার উপযুক্তা? সবার আগে বাড়ি গিয়ে সেটা ফেরত দিতে হবে।
নৈতিকতা মূল্যবোধ ওরা হারিয়েছে — আমি তো এখনও হারাইনি!

শেয়ার করুন:
  • 126
  •  
  •  
  •  
  •  
    126
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.