আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে

আলাউদ্দিন খোকন:

আমি মানুষের ধর্ম বলতে মানবতাকেই বুঝি। যা আমাকে ধারণ করে তাই আমার ধর্ম।

আমার একমাত্র সন্তান মানুষ হচ্ছে সেই মানবতাকেই ধারণ করে। আমি আমার পূর্বপুরুষের ধর্ম কিংবা আমার পূর্বপুরুষদের চাপিয়ে দেয়া ধর্মকে আমার সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে চাই না। আমি চাই আমার সন্তান তার নিজের বোধিপ্রাপ্তির পর নিজ ধর্ম নিজেই যাপন করুক। আমার সন্তানকে আমি সেভাবেই গড়ে তুলেছি, তুলছি।

আমাদের সন্তানকে নিয়ে আমাদের এই নিজস্ব যাপনক্রিয়ায় আমাদের সামাজিক বলয়ের অনেক পরিচিত অপরিচিত আত্মীয়পরিজনদের মাঝেমধ্যেই গাত্রদাহ অনুভব করে থাকি। যা একেবারেই অযাচিত। আমার সন্তানকে আমি কি শিক্ষায় শিক্ষিত করবো তা একান্তই আমাদের, তবুও সেই যাপনক্রিয়ায় যখন কেউ অযাচিত নাক গলায় তখন কিছু কথা বলতেই হয়। আর সেসব কথা একটু কটু কিংবা কড়া হয়ে যায়। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থার প্রায়োগিক সমাধান এই লেখার মূলকথা।

আমাদের একমাত্র সন্তানের নাম তিতলি। ছোটবেলা থেকেই ওর সামনে আমরা খুলে দিয়েছি জ্ঞান আহরণের অবারিত দ্বার। ও নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে, গ্রন্থপাঠ থেকে, কর্মময় জীবনযাপন থেকে, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন আচার আচরণ থেকে, শিল্পসাহিত্য সঙ্গীতের বাতাবরণ থেকে বয়সোচিত সাম্যক জ্ঞান লাভে অনুবর্তী। এর সাথে সাথে আমাদের সমাজে সহজপ্রাপ্য প্রচলিত ধর্ম ইসলাম, সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এই চারটি ধর্মের জীবনাচার, অনুশাসন, পালন, উৎসব, আঙ্গিক সবমিলিয়ে এই সকল ধর্মের মূলকথাগুলো আমার সন্তানকে যৎকিঞ্চিত ধারণ করবার প্রেরণা আমরা মা বাবা দিয়ে যাচ্ছি।

আমার সন্তান যেমন ইসলাম ধর্ম এবং আরবি শিখছে, তেমনি ও আনন্দ নিয়ে মহাভারত, রামায়ণও পড়ছে, সাথে বাইবেল এবং ত্রিপিটক পাঠেও অনুৎসাহী নয়। আমার এবং আমাদের সন্তানের কাছে পহেলা বৈশাখ যেমন বাঙালির উৎসব তেমনি ঈদ, কোরবানি থেকে দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মীপূজা কিংবা বৌদ্ধ পূর্ণিমা থেকে বড়দিন সবই সমানভাবে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

আমাদের এই যাপনক্রিয়া একান্তই আমাদের নিজস্ব। আমাদের এই জীবনাচারে কাউকে উৎসাহিত বা অনুৎসাহিত কোনটাই আমরা করি না। আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ আমাদের বিবেক দ্বারা পরিচালিত। আমরা তথাকথিত ধর্মের ঝাণ্ডা দেখিয়ে নিজেদের বিশ্বাস বহির্ভূত সুবিধা নিতে নারাজ। অনেকেই নিজেদের মতো করে ধরে নেন আমরা নাস্তিক! আসলে নাস্তিক হওয়া অত সহজ নয় বলে আমি মনে করি। আস্তিক বা আস্থা কিংবা বিশ্বাস করাটা অনেক সহজ, কিন্তু নাস্তিক হওয়া অত সহজ নয়।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা কোনো একটা বিশ্বাসকে হঠাৎ করে অস্বীকার করাটাকেই অনেকে নাস্তিকতা মনে করে, আসলে তা কখনোই নয়। ড. আহমেদ শরীফের ভাষায় বলতে হয় “নাস্তিক হওয়া সহজ নয়। এ এক অনন্য শক্তিধর অভিব্যক্তি। কেননা বিশেষ জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও মনোবল না থাকলে নাস্তিক হওয়া যায় না। আশৈশব লালিত বিশ্বাস, সংস্কার, আচার-আচরণ, রীতিনীতি পরিহার করা সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয়, কেবল অসামান্য নৈতিক শক্তিধর যুক্তিবাদী মানুষের পক্ষেই তা সহজ ” অতএব এতোটা শক্তিধর এখনো হইনি যে নিজেদের নাস্তিক দাবি করবো। তবে নিজেদের যুক্তিবাদী এবং স্বচ্ছ চিন্তার মানুষ মনে করি। যা কিছু বোধ এবং যুক্তি দিয়ে বুঝতে এবং জানতে পারি, ততটুকুতে বিশ্বাস রাখবার চেষ্টা করি। এই বিশ্বাসটুকু একান্তই নিখাঁদ, খাঁটি।

আমাদের সন্তান সহ এই যাপন-ক্রিয়া যে কারো ভালো না ও লাগতে পারে। আবার কারো হয়তো ভালো লাগতেও পারে। কিন্তু এই ভালো না লাগায় যখন রক্তচক্ষু নিয়ে ধর্মের বর্শা দিয়ে কেউ খোঁচাতে আসেন তখন নিতান্তই কষ্ট হয়। তখন ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা রাগ প্রচণ্ডভাবে প্রবাহিত হয়ে সকল কিছু ভাসিয়ে দিতে চায়।

তবুও আবার এই কথাই বলছি, ‘মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনে নি মানুষ কোনো ‘

মানবিক মূল্যবোধাশ্রিত মানুষ হিসেবে মননের দৃঢ়তায় এটুকু বিশ্বাস জন্মেছে, একজন স্বচ্ছ এবং সৎ মানুষ হতে কোনো মনুষ্যসৃষ্ট ধর্মাবরণ বা আভরণ লাগে না। নিজের বিবেকাশ্রিত শাসনই নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে৷

আমাদের সন্তান এবং আমাদের নিয়ে যারা ভাবেন আমার বিশ্বাস সকলেই আমাদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। আমাদের সামাজিক বলয়ের এবং আমাদের আত্মীয়স্বজন যারা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে সঠিক ধর্মজ্ঞান দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করতে অনুগামী তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা। তারা আমাদের ভালোবাসেন বলেই তাদের নিজস্ব বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ থেকে আমাদের মুক্তির পথ দেখান। সেই ভালোবাসার প্রতি আমরা ঋণী। আগামীতেও আমরা চাইবো আপনাদের ভালোবাসায় আবদ্ধ থাকতে। তবে ধর্মীয় অনুশাসনের রক্তচক্ষু নিয়ে আমাদের নিজেদের বিশ্বাসকে মাড়িয়ে দিতে আসবেন না। আমরা অন্য কারো বিশ্বাসকে অশ্রদ্ধা বা অবমাননা করি না, বা করতে চাই না। আমাদের বিশ্বাস এতটা ঠুনকো নয় যে হঠাৎ সেটা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাবে৷ আপনাদের বিশ্বাস নিয়ে আমরা কোন মতামত না দিলেই তো হলো।

আমরা যেহেতু একটা পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে জন্মেছি। যেহেতু আমাদেরকে জন্মের, পরিবারের এবং পুরুষানুক্রমিক ধারায় নিজেদের পরিচয় বহন করতে হয়। যেহেতু এই দেশ সমাজ রাষ্ট্রের বাইরে আমরা নই এবং এই রাষ্ট্র সমাজ থেকে দূরে গিয়েও থাকতে চাই না, সেহেতু চাওয়া না চাওয়ার মধ্যেও আমাদের একটি ধর্মীয় পরিচয় বহন করতেই হয়। আমাদের সন্তানকেও একটি ধর্মীয় পরিচয়েই পরিচিত করতেই হয়। সেই পরিচয় ইসলাম। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম পরমতসহিষ্ণু এবং মানবতার মুক্তির ধর্ম হিসেবেই আমার আমাদের কাছে অগ্রগণ্য। আজ সেই ইসলাম ঝাণ্ডাধারী কতিপয় কূপমণ্ডুকতার আশ্রয়কারীদের বাগাড়ম্বরে ভূলুণ্ঠিত হওয়ার পথে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যাদানকারী ধর্ম-ব্যবসায়ীদের এখন জয়জয়কার। ধর্ম পালনকারীদের চেয়ে ধর্ম দেখানোর প্রতিযোগিতাই বেশি। আমরা নিজেদের ধর্ম পালন-প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রেখে নিজেদের জীবন যাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

যেহেতু আমাদের রাষ্ট্রেরও একটা ধর্ম আছে। যেহেতু রাষ্ট্রের প্রজা হিসেবে নিজেদের পরিচিতি দিতে হলে ধর্ম পরিচয় দেয়া আবশ্যক। যেহেতু সার্বিক জীবনাচারে ধর্মহীন পরিচয়ের অবকাশ নেই সেহেতু আমাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছের প্রাণস্পন্দনের গলাটিপে ধর্মের দাসখত লিখতে হয়।

আমি বিশ্বাস করি আমাদের আগামী প্রজন্ম এই ধর্মীয় দাসখত থেকে নিজেদের মুক্ত করবে। আমরা আমাদের সন্তানকে অন্ততঃ যুগযুগ ধরে চলে আসা আমাদের অন্ধবিশ্বাসটাকে চাপিয়ে না দেই। আমরা আমাদের সন্তানের জন্য একটি মুক্ত আকাশ দেয়ার চেষ্টা করি।

ভালো থাকুক আমার সন্তান। থাকুক দুধেভাতে।

শেয়ার করুন:
  • 531
  •  
  •  
  •  
  •  
    531
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.