সামনে ভয়াবহ দুঃসময়, আমরা কী করতে পারি!

আলী আদনান:

১৯৭১ সালে যেদিন দেশ স্বাধীন হলো সেদিন একটা বিষয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। ওরা আর আমরা একসাথে বসবাস সম্ভব নয়। ওরা বলতে শুধু পাকিস্তানীদের বুঝাচ্ছি তা না, ওরা বলতে এখানে বুঝাচ্ছি পাকিস্তানী হানাদারদের যেসব খালাতো ভাই এখানে ঘাপটি মেরে আছে তাদের।

সাপ মেরে সাপের বাচ্চাকে জীবিত রাখতে নেই। তেমনি একটা বড় ভুল হয়ে গেছে ১৯৭২ সালে। তখনই এই ভূখণ্ডে হানাদেরদের ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা দোসরদের ব্যাপারে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। চরম মানে চরম! সেই চরম মানে কী হতে পারে- ইতিহাস সচেতন মানুষ তা ভালো ভাবেই জানে।

সবসময় নিয়ম মেনে বিচার প্রক্রিয়ায় আসতে হবে কেন? নিয়মের বাইরে থেকেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আদর্শিক শত্রুদের সেদিন চিরতরে নিঃশেষ না করে আমরা যে আবেগ দেখিয়েছিলাম, আজ তার প্রায়শ্চিত্ত করছে বাংলাদেশ।

এখনও কিছুটা সময় অবশিষ্ট আছে। যুদ্ধ জয়ের সুযোগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এখনও সময় আছে সাপের বংশধরদের ব্যাপারে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার- যে সিদ্ধান্ত ইতিহাস মনে রাখবে।

আমাদের রাজনীতিবিদরা বেশি আবেগপ্রবণ। তারা আজকের দিন নিয়েই ব্যস্ত। আগামীকালের পরিণতি নিয়ে তারা ভাবেন না। বা বলা যায় ভাবার মতো দূরদর্শীতা তাদের নেই। বা থাকলেও ক্ষমতার ভোগবিলাশে চোখের পাতার নিচে এত চর্বি জমেছে আগামীকাল কোন অবস্থায় দেখতে পাচ্ছেন না।

ক্ষমতায়, প্রশাসনে শতভাগ আওয়ামী লীগ। দেশের সর্বোচ্চ মহল থেকে গ্রামের চৌকিদার পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। সে অবস্থায় কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য ভাঙ্গা হয়েছে, বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে, যে কুষ্টিয়া লালনের, যে কুষ্টিয়া বাউলের, সেই একই কুষ্টিয়া মৌলবাদীদের খড়গের নিচে অসহায়।

আসুন, এ ঘটনার কয়েকটি দিক নিয়ে আলাপ করি।

এক.
আওয়ামী লীগ এতো শক্তিশালীভাবে ক্ষমতায় থাকার পরও যদি বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য ভাঙ্গা হয় বা ভাস্কর্য ভেঙ্গে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া যায়, তাহলে দল যখন ক্ষমতায় থাকবে না তখন এই মৌলবাদিগোষ্ঠিটি কেমন মাথা চাড়া দেবে? এটা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?

অবশ্য কেউ যদি ভেবে থাকেন আওয়ামী লীগ শত বছর ক্ষমতায় থাকবে – তাহলে তিনি বিজ্ঞজন। তার সাথে তর্ক করার সাহস আমার নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও যারা বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য্য ভাঙ্গে ঠিক তারাই কখনো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে, বঙ্গবন্ধু’র নাম যারা মুখে নিবে তাদের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দিবে। যেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি ঝুলবে সেখানে রক্তের বন্যা বইয়ে দিবে। যেসকল বইতে বঙ্গবন্ধু’র অবদানের কথা থাকে, তার মহত্ত্ব উল্লেখ থাকবে সেসব বইতো বটেই বরং লাইব্রেরী সহ ওরা জ্বালিয়ে দিবে।

আমার এ লেখা যিনি পড়ছেন, হ্যাঁ আপনাকে বলছি, আপনি আওয়ামী লীগ করেন? লিখে রাখুন। দল ক্ষমতা থেকে গেলে কোথাও তার ভাষন প্রচারিত হবে না৷ কোথাও তার পোষ্টার থাকবে না। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এসব উদযাপনও বন্ধ হয়ে যাবে। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাগুনের সকল উৎসব নিষিদ্ধ হবে। রমনা থাকবে না, ছায়ানট থাকবে না, উদীচী থাকবে না, রবীন্দ্র সঙ্গীত থাকবে না, গ্রন্থাগার থাকবে না, থিয়েটার থাকবে না, মঞ্চ থাকবে না, চলচ্চিত্র থাকবে না, টিএসসি থাকবে না, বেইলী রোড থাকবে না, জাতীয় জাদুঘর থাকবে না।

আপনি/ আপনারা বুঝতে পারছেন বা পারছেন না, বিপদ আমাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে। ওরা যদি আবার আসে এখানে লালন থাকবে না, হাসন রাজা থাকবে না, বাউল থাকবে না, জীবনানন্দ থাকবে না, রুদ্র থাকবে না, জয় গোস্বামী আবৃতি হবে না, জহির রায়হান থাকবে না, মুনীর চৌধুরী থাকবে না, যাত্রাপালা থাকবে না, মরমী সাধক থাকবে না, সাহিত্য থাকবে না, সংস্কৃতি থাকবে না।

শহীদ মিনার থাকবে না, স্মৃতিসৌধ থাকবে না, ফুল থাকবে না, প্রভাতফেরী থাকবে না, খালি পা থাকবে না, মোটা ফ্রেমের আড়ালে তরুণের লম্বা চুল বা বাঁকানো মোচ থাকবে না, তরুণীর পায়ে আলতা থাকবে না, কপালে বড় টিপ থাকবে না, তাঁতের শাড়ী থাকবে না। অনেক কিছুই থাকবে না।

এমন অসময় আগেও এসেছিল। সেই অসময়ের চেয়ে সামনের অসময় আরো ভয়ানক হবে। লম্বা লম্বা জোব্বা ঢেকে দিবে মানচিত্র। এক থমথমে বাংলাদেশ হবে। টেলিভিশনে গানের অনুষ্ঠান হবে না। মেয়েরা ভয়ে নাচবে না বা নাচতে দেওয়া হবে না, কেউ ছবি আঁকবে না, দোয়েল শালিক ডাকবে না, শাহবাগে কেউ ফুল বিক্রি করবে না, তরুণীর হাতে রজনীগন্ধার মালা পেঁচানো দেখা যাবে না, রমনায় বা টিএসসিতে তরুণ-তরুণীরা আর আড্ডা দিবে না।

আপনি বুঝেন বা না বুঝেন, বুঝেও না বুঝার ভান করেন বা দেখেও না দেখার ভান করেন- যাই হোক না কেন এক ভয়াবহ অসময় আসছে৷ সেই অসময়ে আমি বা আমরা যেমন ছাড় পাবো না, তেমনি আপনিও ছাড় পাবেন না।

সবসময় সবকিছুতে কৌশলের রাজনীতি কাজ দেয় না। কখনও কখনও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ক্ষমা, উদারতা এগুলো সফল শাসকদের অভিধানে শোভা পায় না।

দুই.
যেদিকে তাকাই সেদিকেই বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। অনলাইনে অফলাইনে সৈনিকদের ছড়াছড়ি।
কিন্তু সবাই নেতার সাথে সেলফিতে ব্যস্ত। “অমুক ভাইয়ের ভয় নাই” “তমুক ভাই এগিয়ে চল” এমন স্লোগান সম্বলিত পোষ্টে ব্যস্ত। বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য্য নিয়ে দেশে এমন একটি ঘটনা ঘটে যাচ্ছে- কিন্তু এত এত বঙ্গবন্ধু সৈনিকদের কেমন যেন নির্লিপ্ত মনোভাব। তারা প্রোফাইলে works at facebook – এর জায়গায় মুজিব সৈনিক/ বঙ্গবন্ধু সৈনিক এসব লিখেই দায়িত্ব শেষ করে। কারো কারো কাভার ফটোতে বঙ্গবন্ধুর ছবি। এর বাইরে তাদের কোন হুঁশ আছে- এটা তাদের আচরণে মনে হয় না।

ছাত্রলীগ যুবলীগে অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী আছে যাদের কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই৷ এলাকার বড় ভাই ছাত্রলীগ করতে বলেছে তাই তারা ছাত্রলীগ করে। অমুক আঙ্কেল রাজনীতি করে বড়লোক হয়ে গেছে। তাই তারাও রাজনীতি করে৷ তমুক মামা রাজনীতি করে খুব পরিচিতি পেয়েছে। তাই তাদেরও রাজনীতি করতে হবে।

আমি কেন অন্য সংগঠন না করে ছাত্রলীগ করি বা যুবলীগ করি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ আমার মধ্যে ধারণ করতে হলে আমার চিন্তায় কী কী পরিবর্তন দরকার, বা কেন বঙ্গবন্ধু আমাদের আদর্শিক নেতা, অন্য কেউ কেন নয়- এমন প্রশ্নগুলো অসংখ্য নেতাকর্মীর কাছে স্পষ্ট নয়। তুমি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের লোক দাবি করবে আবার মামুনুল হককে সঠিক বলবে – এমন স্ববিরোধীতার কোন সুযোগ নেই। তুমি হয় ওদের পক্ষে, না হয় আমাদের পক্ষে। এর মাঝামাঝি কোন বক্তব্য নেই। এর মাঝামাঝি কোন পথ নেই।

আমাদের রাজনীতি, আমাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা দর্শনগতভাবে আমাদের সচেতন করতে পারেনি। এর প্রায়শ্চিত্ত দেশ আজ থেকে পাঁচ সাত দশবছর পর করবে এবং ভয়াবহ ভাবে করবে।

সংগঠন মানে শুধু সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হওয়া নয়, কমিটি করে পদ-পদবীর বাহার নয়, অমুক ভাই, তমুক ভাইয়ের পেছনে মিছিল স্লোগান নয়- সংগঠনের প্রথম শর্ত চিন্তার জায়গায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সংগঠনের আদর্শের সাথে নিজের আদর্শের যোগসূত্র স্থাপন করা। বঙ্গবন্ধু’র ভাঙ্গা ভাস্কর্য দেখেও যাদের রক্ত গরম হয়ে উঠে না- তারা কখনই সংগঠনের কল্যাণ বয়ে আনবে না। দলের দুঃসময়ে এটের টিকিটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এখনও সময় আছে আমাদের তরুণদের বোঝানোর। ওদের বোঝাতে হবে- মৌলবাদিদের সাথে আমাদের হয়নি, হবেও না। এই ভূখণ্ডে ওদের কোমর ভেঙ্গে দিতে না পারলে সামনে ভয়াবহ দুঃসময় অপেক্ষা করছে।

(লেখক: আলী আদনান, লেখক, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস্ট)

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.